ভারতবর্ষে তখন সম্রাট আকবরের স্বর্ণযুগ। ওদিকে ইউরোপজুড়ে রানি প্রথম এলিজাবেথের বিকাশপর্ব। মনোহর আবহাওয়া ও নান্দনিক প্রকৃতির জন্য মুঘল সাম্রাজ্যের ‘জান্নাতাবাদ’ খ্যাত এই বঙ্গভূমির সুনাম তখন আটলান্টিকের ওপারেও বিস্তৃত। অন্তত চারশ’ বছর আগের কথা। তখন এ অঞ্চলের পাটালি গুড়ের স্বাদে মন মজেছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধিপতি রানি এলিজাবেথের। শত বছরের জনশ্রুতি মতে, মানিকগঞ্জ অঞ্চলের গুড়ের ঘ্রাণ ও স্বাদে মুগ্ধ হয়েছিলেন রানি। গুণমুগ্ধতা প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি নিজেই ছড়িয়ে দিয়েছিলেন এ গুড়ের নাম।
হরিরামপুর উপজেলার বাল্লা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শামীম হাজারীর বাবা মোহাম্মদ আলী হাজারী মাস্টার জানান, ‘হাজারি গুড়ের নাম ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন খোদ রানি এলিজাবেথ। সেসময় বেশ কয়েকটি হাজারি পরিবার যুক্ত ছিল এই গুড় তৈরির কাজে। সে কারণেই এর নাম হয় হাজারি গুড়।’
তিনি আরও জানান, মানিকগঞ্জে গুড়ের বাজারে খেজুর গুড়ের বিশাল পসরা বসলেও হাজারি গুড় সেখানে অনন্য। তাই এর দাম প্রচলিত পাটালির তুলনায় পাঁচ থেকে দশগুণ। কম করে হলেও দেড়শ’ বছরের বেশি সময় ধরে দেশজুড়ে সমানভাবে এর সুনাম রয়েছে। এমনকি সরকারিভাবে এই গুড়ের সুনামকে স্বীকৃতি দিতে ‘ঝিটকার হাজারি গুড়’ নাম দিয়েই এ জেলার ব্রান্ডিং করা হয়েছে। এ অঞ্চলের প্রায় শ’খানেক পরিবার হাজারি গুড়ের ওপর নির্ভর করে তাদের জীবিকা চালিয়ে আসছে। তবে এবার কুয়াশার কারণে গুড়ের উৎপাদন কম বলে সেখানকার গাছিরা জানিয়েছেন।
স্থানীয়রা জানান, এ গুড়ের উৎস খেজুরের রস। গাছির রস নামানো থেকে শুরু করে গুড় তৈরির মধ্যে রয়েছে আদি এক প্রক্রিয়া। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুর পরিবর্তন হলেও হাজারি গুড় তৈরির এই প্রক্রিয়ার কোনও পরিবর্তন নেই জানালেন গাছিরা।
বাল্লা ইউনিয়নের মমিন গাছি ও শিবালয় উপজলার আরুয়া এলাকার সূর্য গাছি বলেন, ‘বেশি শীত অর্থাৎ ১৫ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এই গুড় উৎপাদনের উপযুক্ত সময়। আগের দিন বিকালে গাছ কেটে হাঁড়ি বেঁধে দেওয়া হয়। পরদিন ভোরে গাছ থেকে রস নামিয়ে ছেঁকে ময়লা পরিষ্কার করে মাটির তৈরি জালা অথবা টিনের তৈরি তাফালে (পাত্র) বাইন (চুলা) জ্বালিয়ে গুড় তৈরি করতে হয়। জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয় কাশের নাড়া। এ গুড় দেখতে যেমন সুন্দর,খেতেও তেমনি সুস্বাদু। মিষ্টি ও টলটলে রস ছাড়া এ গুড় হয় না।’
হরিরামপুর উপজলার ঝিটকা ও শিবালয় উপজলার আরুয়াসহ তার আশপাশের গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, শীত শুরু হওয়ার পর থেকেই ব্যস্ত সময় পার করছেন সেখানকার গাছিরা। খেজুর রসের তৈরি হাজারি গুড়ের জন্য বিখ্যাত এই অঞ্চলের বাড়ি আঙিনা এবং বিভিন্ন কাঁচা-পাকা রাস্তার পথ-প্রান্তে শোভা পাচ্ছে সারি সারি খেজুর গাছ। ভোরের আজানের ধ্বনি কানে ভেসে আসার আগেই ঘুম ভেঙে যায় সেখানকার গাছি এবং তাদের গৃহিণীদের। গাছিরা চলে যায় খেজুর গাছ থেকে হাড়ি ভর্তি রস আনতে। আর গৃহিণীরা রস জাল করার জন্য প্রস্ততি নিতে চুলার পাড়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। জনশ্রুতি রয়েছে, গাছি ও গৃহিণীদের এই গুড় তৈরি ও বিক্রির ব্যস্ততা অন্তত দেড়শ’ বছরের।
এ ব্যাপারে বাল্লা এলাকার স্কুল মাস্টার জহির উদ্দিন জানান, ‘এই হাজারি গুড়ের সুনাম দেশ থেকে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। মুরুব্বিদের কাছে শুনেছি, ইংল্যান্ডের রানি এলিজাবেথকে এই গুড় উপহার দেওয়া হয়েছিল। তিনি এই গুড় খেয়ে অভিভূত হয়েছিলেন।’
ঝিটকা এলাকার সোহরাব গাছি বলেন, ‘এ বছর অতিমাত্রায় কুয়াশা এবং শীতের কারণে হাজারি গুড় তৈরি ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া কুয়াশার কারণে রস কম মিষ্টি হওয়ায় গুড়ের স্বাদ গত বছরের চাইতে কম। এখন ভালো মানের এক কেজি হাজারি গুড় এক হাজার থেকে বারোশ’ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়।’
তিনি আরও জানান, হাজারি গুড়ের চাহিদা এতোই বেশি যে, এ গুড় তৈরি করার কয়েক মাস আগেই অর্ডার থাকে। দূর-দূরান্ত থেকে অনেক মানুষ গাড়ি নিয়ে আসেন গুড় নিতে। তবে আগের মতো এখন আর গুড় তৈরি করা যায় না। তার কারণ খেজুর গাছের সংখ্যা আগের তুলনায় কমে গেছে। পাশাপাশি রস জ্বাল করার বিশেষ জ্বালানির অভাবও একটা কারণ।
একই এলাকার শতাধিক পরিবার এই হাজারি গুড় তৈরি করেন। তবে এক যুগ আগেও এই গুড় তৈরিতে এলাকাবাসীর উৎসাহ আরও বেশি ছিল। ক্রমেই সে আগ্রহ হারিয়ে যাচ্ছে। এর কারণ গুড় তৈরিতে জ্বালানি খরচ বেশি ও সঠিক দাম না পাওয়া।
এছাড়া বর্তমান নকল গুড়ে সায়লাব হয়ে পড়েছে ঝিটকা এলাকা। নকল গুড়ে আসল হাজারি গুড়ের সিল লাগিয়ে বাজারে বিক্রি করছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। এরকম অভিযোগের কারণে হাজারি গুড়ের ঐতিহ্য দিন দিন ম্লান হয়ে যাচ্ছে।
হাজারি গুড় নিয়ে প্রচলিত উপকথা
মিষ্টি গন্ধ ও মনোহর স্বাদের এ হাজারি গুড় নিয়ে এলাকায় প্রচলিত আছে অনেক রকমের উপকথা। অনেকের মতে, হাজারি কোনও বংশের নাম নয়। এটা একজন ব্যক্তির নাম। কয়েকশ’ বছর আগে ঝিটকা অঞ্চলে হাজারি প্রামানিক নামে একজন গাছি ছিলেন। যিনি খেজুরের রস দিয়ে গুড় তৈরি করতেন। হঠাৎ একদিন বিকালে খেজুর গাছে হাঁড়ি বসিয়ে গাছ থেকে নামামাত্রই একজন দরবেশ তার কাছ রস খেতে চান। তখন ওই গাছি দরবেশকে বলেছিলেন,‘সবে মাত্র গাছ হাঁড়ি বসানো হয়েছে। এতো অল্প সময়ে বড় জোর ১০-১৫ ফোঁটা রস হাঁড়িতে পড়েছে।’
তবুও দরবেশ তাকে গাছে উঠে হাঁড়ি থেকে রস খাওয়ানোর অনুরোধ জানান। দরবেশের রস খাওয়ার অনুরোধে গাছি খেজুর গাছে ওঠেন। এরপর বিস্মিত হয়ে দেখতে পান, সারারাত ধরে যতো রস পড়তো সে পরিমাণ রসে হাঁড়ি ভরে গেছে। গাছি হাঁড়ি ভরপুর রস নিয়ে নিচে নেমে ওই দরবেশকে রস খাওয়ান এবং পা জড়িয়ে ধরেন।
গাছিকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে দরবেশ বলেন, এই গাছি যতো গুড় তৈরি করবেন তার সুনাম দেশ বিদেশে ছড়িয়ে পরবে। এরপর থেকেই হাজারি প্রামানিকের নামেই এই গুড়ের নাম হাজারি গুড় করা হয়।








