স্পেকট্রাম পোশাক কারখানার ভবন ধসের ঘটনার ১৩ বছর পেরিয়ে গেছে। সেদিন ভবনের ধ্বংসস্তুপের নিচে চাপা পড়ে ৬৩ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছিল। ওই শ্রমিকের সমাধির ওপর ভবন মালিক শাহরিয়া কবির নতুন করে গড়ে তুলেছেন বহুতল ভবন। ধ্বংসস্তুপের ওপর গড়ে তোলা নতুন ভবনে নতুন শ্রমিকদের নিয়ে চালু করেছেন গিল্ডেন পোশাক কারখানা। ওই দিনের দুর্ঘটনায় অনেকে শ্রমিক আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। এ দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকরা নাম মাত্র ক্ষতি পূরণ পেয়েছিলেন।
আশুলিয়ার পলাশবাড়ি এলাকায় স্পেকট্রাম বর্তমানে গিল্ডেন কারখানার সামনে গিয়ে সরেজমিন দেখা যায়, স্পেকট্রাম কারখানার ধ্বংসস্তুপের জায়গায় চার তলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ২০০৫ সালে ভবন ধসের কয়েক মাস পরই সেখানে কারখানাটি পুনঃস্থাপনের কাজ শুরু করা হয়। বর্তমানে সেখানে গিল্ডেন নামের একটি পোশাক কারখানা চালু রয়েছে।
গিল্ডেন কারখানার অ্যাডমিন অফিসার মাহবুব আলম বলেন, ‘ভবন ধসের কয়েক মাস পরই কারখানার মালিক শাহরিয়া কবির সেখানে নতুন ভবন নির্মাণ করেন। ২০১০ সাল পর্যন্ত তিনি এই কারখানাটি নিজে পরিচালনা করেছেন। এর পর আট বছর ধরে কারখানাটির মালিকানা পরিবর্তন হয়েছে।’
কিভাসে এ ধ্বংসস্তুপের উপর নতুন করে কারখানা নির্মাণ করা হয়েছে সে বিষয়ে জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা জানান, যেহেতু স্পেকট্রাম কারখানার মালিক শাহরিয়া কবির ছিলেন। তিনি ওই কারখানা পুনরায় স্থাপনের সময় হয়তো প্রয়োজনীয় অনুমতি নিয়েছিলেন। তবে কিভাবে কি করেছেন সে ব্যাপারে তার কিছু জানা নেই।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ রাসেল হাসান বলেন, ধ্বংসস্তুপের উপর নতুন ভবন তৈরি ও পোশাক কারখানা চালুর বিষয়টি আমার জানা। তা ছাড়া ধ্বংসস্তুপের উপর নতুন করে কারখানা নির্মাণের বিষয়টি কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের আওতায়। তবে স্পেকট্রাম ধসে পড়ার পর সেখানে কিভাবে নতুন করে কারখানা স্থাপন করা হয়েছে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে।’
অন্যদিকে কল কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতর ঢাকা জেলার উপ-মহা পরিদর্শক মো.জাকির হোসেন বলেন, ‘স্পেকট্রাম কারখানা ধসের পর কারখানাটির ধ্বংসস্তুপের জায়গা সরকারিভাবে পরিত্যাক্ত ঘোষণা করা হয়নি। এ কারণে কল কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের এবং কারখানার ভবন নির্মাণ সংশ্লিষ্ট দফতরের নিয়ম মেনে সেখানে নতুন করে স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ ছিল। সেখানে এ প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ম মেনে নতুন করে কারখানা স্থাপনা করা যেতে পারে। তবে স্পেকট্রাম কারখানা কর্তৃপক্ষ ওইসব নিয়ম মেনে ভবন তৈরি করেছে কিনা সে বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে হবে।’
গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাংগঠনিক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু বলেন, ‘স্পেকট্রাম কারখানার মালিক ভবন ধসের ঘটনায় নাম মাত্র ক্ষতিপূরণ দিয়েছে। ওই ঘটনায় বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের পূনর্বাস তো দূরের কথা কর্মসংস্থানেরও কোনও ব্যবস্থা করেননি। বর্তমানে সেখানে গিল্ডেন নামে একটি পোশাক কারখানা চালু রয়েছে। যেখানে পূর্বেই খাল দখল করে স্পেকট্রাম গার্মেণ্টস নির্মাণ করা হয়েছিল। ভবন ধসের পর এত শ্রমিকের সমাধিস্থলে কিভাবে গিল্ডেন নামে আরেক প্রতিষ্ঠান ও বহুতল ভবন নির্মাণ করে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে।
অন্যদিকে এ ঘটনায় ওই সময় আইন ও শালিস কেন্দ্রের পক্ষ থেকে মালিক শাহরিয়ার কবিরকে আসামি করে আদালতে একটি মামলা দায়ের করা হয়। তবে ওই মামলার ব্যাপারে কেউই কিছু জানে না । অন্যদিকে দুর্ঘটনার পর যারা পঙ্গুত্বের অভিশাপ নিয়ে বেঁচে আছেন তাদেরও এ ব্যাপারে কোনও ধারণা নেই। এমনকি যে সব শ্রমিক সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের ন্যায্যতা বুঝিয়ে দিতে সোচ্চার ছিল তারাও এ ব্যাপারে কিছু জানে না।
এ ব্যাপারে গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাংগঠনিক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু বলেন, আইন ও শালিস কেন্দ্রের পক্ষ থেকে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছিল। পরে তিনি জামিনে বের হয়ে বহাল তবিয়তেই আছেন।
জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আমিরুল হক আমিন জানান, স্পেকট্রাম দুর্ঘটনায় দায়ের করা মামলাটি আদৌ চলমান কি না সে ব্যাপারে তার কোনও ধারণা নেই। ধ্বংসস্তুপের উপর নতুন করে ভবন নির্মাণ করে কারখানা পরিচালনা করা হলেও আজও ওই দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের পুনর্বাসন করা হয়নি। এতো বড় দুর্ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের দীর্ঘ মেয়াদি কোনও সহযোগিতা দেওয়া উচিত ছিল।
সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহসিনুল কাদিরও মামলার বিষয়টি নিয়ে নিশ্চিত করে কিছুই বলেতে পারেনি।
অন্যদিকে সেদিনের সেই ভয়াবহ স্মৃতির কথা স্মরণ করে আহত শ্রমিক মোজাফ্ফর বলেন, ‘আমি স্পেকট্রাম কারখানায় কাজ করতাম। ২০০৫ সালের এই দিনে আমার অন্য সহকর্মীদের সঙ্গে আমিও ধ্বংসস্তুপের নিচে চাপা পড়েছিলাম। প্রায় ১৫ ঘণ্টা ধ্বংসস্তুপের নিচে আটকে ছিলাম এ সময় অনেক সহকর্মীর নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখেছি। ১৫ ঘণ্টা পর (পরের দিন বিকেলে) ফায়ার সার্ভিস ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের সহযোগীতায় আমাকে উদ্ধার হয়। আমি বেঁচে গেলাম ঠিকই কিন্তু একটি পা কেটে ফেলতে হয়েছে। ওই সময় চোখের সামনে কয়েক জন সহকর্মীকে আমি পৃথিবী থেকে চলে যেতে দেখেছি। ওই দুঃসহ স্মৃতি আজও আমাকে তাড়া করে বেড়ায়।’
মোজাফ্ফর আক্ষেপ করে বলেন, ভবন ধসের পর কারখানার মালিক আমাদের নাম মাত্র ৬০ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিয়েছেন। এতোগুলো মানুষের সমাধীর উপর নতুন করে বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন। স্পেকট্রাম নাম পরিবর্তন করে গিল্ডেন নামে পোশাক কারখানা গড়ে তুলেছেন। অথচ আমাদের জন্য কেউ কিছু করেনি। আমাদের পূনর্বাসণ করা তো দূরের কথা সরকারিভাবেও কোনও অনুদান দেওয়া হয়নি। আমাদের কর্মসংস্থানের জন্যও কোনও ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। আমি মালিকের সঙ্গে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করেছিলাম নতুন কারখানায় আমাকে একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু কারখানা কর্তৃপক্ষ আমার জন্য কিছুই করেনি।’
দুর্ঘটনায় এক হাত হারানো অপর শ্রমিক নূর আলম বলেন, ‘সে দিনের সেই দুঃসহ স্মৃতি আজও আমাকে তাড়া করে বেড়ায়। এখনো সেই রাতের কথা মনে হলে ভয়ে চিৎকার করে উঠি। দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে যায়। চোখের সামনে অনেক সহকর্মীকে বেঁচে থাকার জন্য আকুতি জানাতে জানাতে মরে যেতে দেখেছি। ধ্বংসস্তুপের নিচে ১৬ ঘণ্টা আটকে ছিলাম। দুর্ঘটনার পরদিন দুপুর ২টার দিকে আমাকে উদ্ধার করা হয়।ওই দিন মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেলেও কেটে ফেলতে হয়েছে আমার বাম হাত। হাত হারানোর পর আমার আর কোথাও চাকরি হয়নি। স্পেকট্রামের জায়গায় নতুন কারখানা চালু হওয়ার পর সেখানে চাকরি পাবো বলে আশা করেছিলাম। মনে হয়েছিল অন্যের বোঝা হয়ে বেঁচে থাকার কষ্টটা কিছুটা হলেও লাঘব হবে। তবে টানা কয়েক মাস ওই মালিকের কারখানার নিরাপত্তাকর্মী থেকে শুরু করে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনও চাকরির ব্যবস্থা করতে পারিনি।
উল্লেখ্য, ২০০৫ সালের ১০ এপ্রিল দিবাগত রাত ১টার দিকে সাভারে আশুলিয়ার পলাশবাড়ী এলাকায় সাত তলা বিশিষ্ট ভবনটি ধসে পড়ে। এতে প্রাণ হারায় ৬৩ জন শ্রমিক। আহত হয় আরও ৮৪ জন। ওই ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুই শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছে।
আরও পড়ুন: স্পেকট্রাম কারখানা ধসের ১৩ বছর: পঙ্গুত্বের যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন শ্রমিকরা







