স্পেকট্রাম কারখানা ধসের ১৩ বছর: পঙ্গুত্বের যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন শ্রমিকরা

নাদিম হোসেন, সাভার
১১ এপ্রিল ২০১৮, ১০:৫০আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০১৮, ১০:৫৫

স্পেকট্রাম ধসের ঘটনায় আহত শ্রমিক মোজাফফর হোসেন আজ সেই ১১ এপ্রিল। ২০০৫ সালের এই দিনে দেশের গার্মেন্ট খাতের ইতিহাসে প্রথম বড় ধরনের ভবন ধসের ঘটনা ঘটে। আশুলিয়ার পলাশবাড়ী এলাকার স্পেকট্রাম পোশাক কারখানার সাত তলা ভবন ধসে পড়ে। ওই ভবনের নিচে চাপা পড়েন রাতে শিফটে কাজ করা প্রায় দুইশ’ শ্রমিক। এর মধ্যে যারা প্রাণে বেঁচে গেছেন তাদের বয়ে বেড়াতে হচ্ছে পঙ্গুত্বের যন্ত্রণা। ১৩ বছর পার হয়ে গেলেও এখনও  জীবনযুদ্ধে ঘুড়ে দাঁড়াতে পারেননি তাদের অনেকে। অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে মানবেতর জীবনযাপন  করছেন। ভবন ধসের পর বেসরকারিভাবে কিছু সহযোগিতা পেলেও সরকারের পক্ষ থেকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ বা আর্থিক অনুদান কিছুই মেলেনি।

স্পেকট্রাম গার্মেন্টসের সপ্তম তলায় নিটিং সেকশনে কাজ করতেন কুড়িগ্রামের মোজাফফর হোসেন। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আশুলিয়া এলাকায় একটি ভাড়া বাড়িতে থাকতেন তিনি। বাংলা ট্রিবিউনকে মোজাফফর বলেন, ‘প্রতিদিনের মতো ১১ এপ্রিল ওই কারখানার রাতের শিফটে কাজ করছিলাম। রাত আনুমানিক ১টার দিকে হঠাৎ করেই আমাদের ফ্লোরের চারদিকের গ্লাস ভেঙে পড়তে থাকে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মুহূর্তের মধ্যে ভবনটি ধসে পড়ে। কিছুক্ষণ পরে ধসে পড়া ভবনের একাংশের নিচে ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পাই। চারপাশ থেকে কানে আসতে থাকে সহকর্মীদের বাঁচার আকুতি। পাশেই আমার দুঃসম্পর্কের মামা মিলনের নিথর দেহ দেয়ালের নিচে চাপা পড়ে থাকতে দেখি। এসময় আমার ডান পা ধসে পড়া ভবনের একটি অংশের নিচে আটকে ছিল। এর পরের দিন বিকালে আমাকে উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস ও সেনাবাহিনী। পরে হাসপাতালের চিকিৎসকের পরামর্শে আমার ডান পা কেটে ফেলা হয়। এরপর রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে তিন মাস ও ট্রমা সেন্টারে দুই মাস চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরি।’

তিনি আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, ‘ওই সময় কারখানার মালিক শাহরিয়ার কবির ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের নাম মাত্র ৬০ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেন। তবে পরবর্তীতে ইনডেক্স জারা নামের স্পেনের বায়ার কোম্পানি ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক ও তাদের পরিবারকে বিভিন্ন মেয়াদে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা সহায়তা দিয়েছে। আমিও তাদের কাছ থেকে ৬ লাখ টাকা অনুদান পেয়েছি। এসব টাকার বেশিরভাগ অংশই আমার চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হয়ে গেছে। এতো বড়ো দুর্ঘটনার পরও সরকারের পক্ষ থেকে কোনও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি।’

মোজাফফর কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ওই দুর্ঘটনার পর ২০০৮ সালে ইনডেক্স জারা বায়ার কোম্পানির সহায়তায় আশুলিয়ার জিরানী এলাকায় মাছিহাতা নামে একটি পোশাক কারখানায় চাকরি পাই আমি। তবে বাড়ি থেকে কারখানার দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার হওয়ায় এক পা নিয়ে গণপরিবহনে চলাচল করতে খুব কষ্ট হয়। এছাড়া বর্তমানে শারিরীক অসুস্থতার কারণে প্রতি মাসেই প্রায় ৫-৬ দিন অফিসে যেতে পারছি না। যে কোনও সময় এই চাকরিটা হারাতে পারি। নিজের চিকিৎসা খরচ  ও পরিবারের খরচ বহন করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছি। সরকারিভাবে সহযোগিতা ও পুর্নবাসনের দাবি জানাই।’ স্পেকট্রাম ধসের ঘটনায় হাত হারানো শ্রমিক নূর আলম

অভাবের সংসারে নিজের ভাগ্য ফেরাতে ও পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতার জন্য বরিশাল থেকে ঢাকার সাভারে চলে আসেন নুর আলম। অপারেটর পদে চাকরি নেন পলাশবাড়ী এলাকার স্পেকট্রাম কারখানায়। ২০০৫ সালের ১১ এপ্রিল দিনগত রাত ১টার দিকে হঠাৎ করেই ভবনটি ধসে পড়ে। কারখানায় তিনি যে মেশিনটিতে কাজ করতেন সেই মেশিনটির নিচেই তিনি চাপা পড়েন। বাম হাত আটকা পড়ে ধ্বংসস্তুপের নিচে। অনেক চেষ্টা করেও নড়াচড়া করতে পারছিলেন না তিনি। এসময় তার সামনে থাকা মেশিনের অপারেটর সৈকত ও পেছনের টেবিলের ইলিয়াসকে চাপা পড়া অবস্থায় দেখতে পান। অনেক ডাকাডাকি করলেও তারা সাড়া দেননি। ১৬ ঘণ্টা আটকে থাকার পর দুপুর ২ টার দিকে তাকে উদ্ধার করা হয়। পরে হাসপাতালে কেটে ফেলা হয় নুর আলমের বাম হাত। বেঁচে থাকার জন্য চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করে নিতে হয় তাকে।

নূর আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভবন ধসের পর সরকারিভাবে কোনও ক্ষতিপূরণ না পেলেও স্প্যানিস বায়ারের মাধ্যমে সাড়ে ৬ লাখ টাকা অনুদান পেয়েছি। সেই টাকার অধিকাংশ চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হয়ে গেছে। বর্তমানে নিজের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মানবেতর জীবন পালন করছি।’

গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাংগঠনিক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু বলেন, ‘রানা প্লাজা ও তাজরিন ফ্যাশন ট্র্যাজেডিতে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকরা যে ধরণের সহযোগিতা পেয়েছেন স্পেকট্রামের শ্রমিকরা তা পাননি। মালিক শাহরিয়ার কবির নামমাত্র ৬০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়েছেন শ্রমিকদের। তবে দেরিতে হলেও এখন এসব ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের খুঁজে বের করে তাদের পুনর্বাসন করা উচিত।’

তিনি আরও বলেন, ‘পলাশবাড়ী এলাকায় একটি খালের জমি ভড়া করে স্পেকট্রাম কারখানার সাত তলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল। ভবন ধসের পড় ধ্বংসস্তূপ সড়িয়ে সেখানে আগের মালিকই নাম পরিবর্তন করে গিল্ডেন নামে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন। অথচ যে মালিকের জন্য এতো শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন, আবার অনেকেই অসহায় পঙ্গুত্বের জীবন বয়ে বেড়াচ্ছেন, তার কোনও বিচার হয়নি। কারখানার মালিক শাহরিয়ার কবির জামিন নিয়ে সেই ধ্বংসস্তূপের ওপরই কারখানা বানিয়ে ব্যবসা করে আসছেন।’ তিনি অবিলম্বে ওই কারখানার আহত শ্রমিক ও নিহতদের পরিবারের সদস্যদের খুঁজে বের করে ক্ষতিপূরণ এবং তাদের পূনর্বাসনের দাবি জানান। এখানেই ছিল স্পেকট্রাম কারখানা

শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে যারা কাজ করেতেন তাদের মধ্যে অন্যতম জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আমিরুল হক আমিন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, স্পেকট্রাম ভবন ধসের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলাটি আদৌ চলমান কিনা সে ব্যাপারে তার কোনও ধারণা নেই। তবে তিনি বলেন, ‘ওই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের আজও পুনর্বাসন করা হয়নি। এছাড়া এত বড় দুর্ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের জন্য দীর্ঘ মেয়াদী সহযোগিতা প্রদান করা উচিত ছিল। অবিলম্বে এসব অসহায় শ্রমিকদের আর্থিক সহযোগিতা ও পুনর্বাবাসনের দাবি জানাই।’

উল্লেখ্য, ২০০৫ সালের ১০ এপ্রিল রাত ১টার দিকে আশুলিয়ার পলাশবাড়ী এলাকায় স্পেকট্রাম কারখানার সাত তলা ভবন ধসে পড়ে। প্রায় ৮০ জন শ্রমিক রাতের পালায় গার্মেন্টের সপ্তম তলায় নিটিং সেকশনে কাজ করছিলেন। এছাড়াও ডায়িং, স্যোয়েটার ও অন্যান্য ফ্লোরে ছিলেন আরও প্রায় দুইশত শ্রমিক। তাদের মধ্যে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারান ৬৩ জন শ্রমিক। আহত হন আরও ৮৪ জন। ওই ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুই শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্ঘটনার পর আইন ও শালিস কেন্দ্রের পক্ষ থেকে কারখানার মালিক শাহরিয়ার কবিরকে আসামি করে আদালতে একটি মামলা দায়ের করা হয়। তবে সেই মামলার ব্যাপারে জানে না কেউই। যে সব অসহায় শ্রমিকরা দুর্ঘটনার পর পঙ্গুত্বের অভিশাপ নিয়ে বেঁচে আছেন তাদেরও মামলার ব্যপারে কোনও ধারণা নেই। আর ওই সময় যে শ্রমিক সংগঠনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের দাবিতে সোচ্চার ছিল তাদেরও এখন জানা নেই ব্যাপারটি। এদিকে এত শ্রমিকের ওই সমাধিস্থলে বহুতল ভবন নির্মাণ করে দীর্ঘ দিন ধরে শিল্পকারখানা পরিচালনা করে আসছে গিল্ডেন নামের একটি প্রতিষ্ঠান।

 

/এফএস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
৩০০ ফিটে প্রাইভেটকারের ধাক্কায় চীনা নাগরিকের মৃত্যু
৩০০ ফিটে প্রাইভেটকারের ধাক্কায় চীনা নাগরিকের মৃত্যু
নৌবাহিনী পরিচালিত ডকইয়ার্ডে নির্মিত ফ্লোটিং ক্রেন যুক্ত হলো নৌবহরে
নৌবাহিনী পরিচালিত ডকইয়ার্ডে নির্মিত ফ্লোটিং ক্রেন যুক্ত হলো নৌবহরে
জিয়াউর রহমানের আদর্শ গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথ দেখায়: আইনমন্ত্রী
জিয়াউর রহমানের আদর্শ গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথ দেখায়: আইনমন্ত্রী
রেললাইনে আটকে গেলো মাইক্রোবাস, ট্রেনের ধাক্কায় পুকুরে
রেললাইনে আটকে গেলো মাইক্রোবাস, ট্রেনের ধাক্কায় পুকুরে
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের