গাজীপুর সদর উপজেলার বাড়ীয়া ইউনিয়নের কেশোরিতা এলাকার লাক্সারি স্মার্ট এনার্জি সেভিং ফ্যান লিমিটেডে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মারা যাওয়াদের মধ্যে পাঁচ জনই গাজীপুরের এবং প্রত্যেকেই ছিল বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে সন্তান। অন্য পাঁচ জনের বাড়ি দেশের বিভিন্ন এলাকায়। সোমবার (১৬ ডিসেম্বর) সকালে কারখানা এলাকায় গেলে স্থানীয়রা ফ্যাক্টরি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করেন।
স্থানীয়রা বলেন, আবাসিক এলাকায় একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে ফ্যান ও লাইট তৈরির কারখানা গড়ে তোলায় আগে থেকেই তাদের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া এমন একটি কারখানা কীভাবে এতদিন চলছিল তা নিয়েই প্রশ্ন তাদের। কারখানাটিতে প্রায় তিন বছর ধরে উৎপাদন কাজ চলছিল।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডে সন্তান হারানো স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় তাদের কষ্টের কথা। মারা যাওয়া অনেকেই ছিলেন সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য। এখন তাদের হারিয়ে চরম বিপাকে পড়েছে পরিবার।
তিন কন্যার পর এক ছেলে, আল্লাহ তাও নিয়ে গেল
তিন কন্যার পর আল্লাহ একটি ছেলে দিয়েছিল, ১৯ বছর বয়সে তাকেও নিয়ে গেল। ছেলের উপার্জন দিয়ে আমাদের চার জনের জীবন চলতো। এখন মাস শেষে কারও হাতের দিকে চেয়ে থাকবো এমন কেউ নেই। এমনভাবেই আক্ষেপ করে ছেলে হারানোর কথা বলছিলেন গাজীপুরের ফ্যান কারখানার অগ্নিকাণ্ডে মারা যাওয়া পারভেজের (১৯) মা রাবেয়া বেগম।
পারভেজের বাবা গাজীপুর সদর উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামের মো. লাল মিয়া। ভিটেমাটিহীন লাল মিয়া পরিবার নিয়ে ওই গ্রামের আইয়ুব খানের বাড়িতে ১৫ বছর ধরে ভাড়া থাকেন। লাল মিয়া আগে ভ্যান চালাতেন। বছর তিনেক ধরে শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়ায় ছেলে পারভেজের রোজগারের ওপরই পরিবারের সদস্যরা নির্ভরশীল ছিলেন। কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার পর তাদের জীবিকা নির্বাহের আশা থেমে গেছে বলে বিলাপ করছেন লাল মিয়া।
পারভেজের মা রাবেয়া বেগম আক্ষেপ করে বলেন, বছর দুয়েক আগে ফ্যান কারখানার কাছে একটি মেসে থেকে চাকরি শুরু করে পারভেজ। বৃহস্পতিবার তার বেতন হওয়ার কথা ছিল। সেই আশায় দিন গুনছিলাম। আর মাত্র তিনদিন পরই বেতন পেয়ে ছেলে বাড়ি ফেরার কথা ছিল। তার আর ফেরা হলো না। স্বপ্ন ছিল ছেলেকে দুবাই পাঠাবো। সেখানে তার মামারা ছিল। পারভেজ বলতো ছোট বোনকে বিয়ে দেওয়ার পর নিজে বিয়ে করবে। তবে এখন সব অতীত।
বিজয় দিবসের সাইকেল রেসে অংশ নেওয়া হলো না ফয়সালের
প্রতি বিজয় দিবসে সাইকেল রেসে অংশ নিতো ফয়সাল (২০)। গাজীপুর সদর উপজেলার কালনী গ্রামের সাইফুল খানের ছেলে ফয়সাল (২০) এ বছর এইচএসসি পাস করে গাজীপুর শহরের আজিম উদ্দিন কলেজে পাসকোর্সে ভর্তি হন। নিজের খরচ জোগানোর পাশাপাশি সংসারে সহযোগিতার জন্য গত নভেম্বরে ফ্যান কোম্পানিতে পাঁচ হাজার টাকা বেতনে যোগ দেন।
ফয়সালের মা ফাতেমা বেগম বলেন, আগুন লাগতে দেখে সে তার বন্ধু প্রতিবেশী তানভীর ও মামুনকে ফোনে তাকে বাঁচানোর আকুতি জানায়। এরপর আমি তাকে ফোন করলেও আর রিসিভ হয়নি।
ফয়সালের একমাত্র বোন কনিকা ও ফুপাতো বোন মিতা বলেন, ফয়সাল নভেম্বর মাসের বেতন আনতে রবিবার কারখানায় গিয়েছিল। কিন্তু কারখানা কর্তৃপক্ষ রাত আটটা পর্যন্ত কাজ করিয়ে বেতন দেওয়ার শর্ত জুড়ে দেয়। সেই কাজ শেষ করতেই আমরা ভাইটি চলে গেল না পেরার দেশে। কারখানা কর্তৃপক্ষ তাদের মালামাল রক্ষার জন্য প্রতি তলায় তালা দিয়ে রাখতো। এ কারণে দগ্ধ অনেকেই বের হতে পারেনি।
ফোনে দরজায় তালা লাগানোর কথা জানিয়েছিল উত্তম
গাজীপুর সদর উপজেলার কেশোরিতা গ্রামের বীরবল দাসের ছেলে উত্তম কুমার দাস (২৬)। বাবা বীরবল দীর্ঘদিন প্যারালাইজড হয়ে ঘরে পড়ে আছেন। বড় বোনের বিয়ে হয়েছে। উত্তম ফ্যান কোম্পানিতে চাকরি করে সংসার চালাতো।
মা মীনা রানি দাস বলেন, দুপুরে বাড়ি থেকে ভাত খেয়ে যাওয়ার সময় উত্তম বলেছিল, রাতে যেন তার জন্য রান্না না করি। কারখানা থেকে ফিরে এলাকার কীর্তনে গিয়ে সেখান থেকে প্রসাদ খেয়ে বাড়ি ফিরবে। আগুন লাগার পর উত্তম ফোনে বলেছিল, দরজা বন্ধ, আমরা নামতে পারছি না। আমাদের বাঁচাও। এরপর আর তার সঙ্গে কথা হয়নি।
বাবা-মা ও সন্তানদের রেখে চলে গেলেন রাসেদ
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মারতা গ্রামের কামাল হোসেনের ছেলে রাসেদ (২৭)। কামাল হোসেন বলেন, আমি কিডনি, ডায়াবেটিসসহ নানা রোগে অসুস্থ। আমার মারা যাওয়ার কথা, অথচ আমার ছেলে চলে গেল। তার দুই ছেলে রাকিবুল (৬) ও মাইদুল (৩) এতিম হলো, তার স্ত্রী মাহফুজা অল্প বয়সেই বিধবা হলো, আর আমরা হলাম সন্তানহারা।
একই ভাগ্য বরণ করেছেন মারতা দক্ষিণপাড়া এলাকার নজরুল ইসলাম নবীর ছেলে শামীম (২২)। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তিনিও মারা যান। দুই বোন, এক ভাইয়ের মধ্যে শামীম সবার বড়। দুই বছর আগে বিয়ে করেন। সিনহা নামে তার ১০ মাসের একটি কন্যা আছে। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম শামীম চলে গেল। তার চলে যাওয়ায় সংসারের সবাই আজ থেকে অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাবে।
এদিকে গাজীপুর সদর উপজেলার বাড়িয়া ইউনিয়নের কেশোরিতা এলাকার লাক্সারি ফ্যান তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে মারা যাওয়া ১০ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। এরা সবাই ওই কারখানার তৃতীয় তলায় কর্মরত ছিলেন। মৃতরা হলেন- বাড়িয়া ইউনিয়নের নোয়াগাঁও এলাকার লাল মিয়ার ছেলে পারভেজ, ময়মনসিংহের রাঘবপুর এলাকার সেলিম মিয়ার ছেলে তারিকুল ইসলাম, দিনাজপুরের বারবটিকা এলাকার আবদুল হামিদের ছেলে মোহাম্মদ লিমন, গাজীপুর সদর উপজেলার কালনী গ্রামের সাইফুল ইসলামের ছেলে ফয়সাল খান, শ্রীপুরের মার্তা গ্রামের নজরুল ইসলাম নবীর ছেলে শামীম, একই এলাকার কামাল হোসেনের ছেলে রাসেদ, রংপুরের আরাগাছ এলাকার তাজুল ইসলামের ছেলে ফরিদুল ইসলাম, নরসিংদীর বেলাব থানার চরকাশিনগর এলাকার সজল মিয়া ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর থানার মোর্শেদ মিয়ার ছেলে ইউসুফ মিয়া।
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) এসএম তরিকুল ইসলাম জানান, মৃতদের স্বজনের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে। ঢাকা থেকে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটের সদস্যরা শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এসে স্বজনদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে মরদেহ শনাক্তের কাজে সহযোগিতা করেন। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহিনুর ইসলামকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, রবিবার (১৫ ডিসেম্বর) সন্ধ্যা ৫টা ৫২ মিনিটে গাজীপুর সদর উপজেলার কেশোরিতা এলাকার লাক্সারি ফ্যান কোম্পানি লিমিটেডে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে ১০ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। দগ্ধ হয় দুই জন।








