অবশেষে খোঁজ মিলেছে মাদারীপুর পৌরসভা নির্বাচনে ‘স্বতন্ত্র’ প্রার্থী হিসেবে অংশ নেওয়া সেই সরকারদলীয় বিদ্রোহী প্রার্থী মশিউর রহমান সবুজের। পুলিশের দাবি অনুযায়ী ঠিকই তিনি ঢাকায় এসেছেন এবং সেখান থেকেই তার সমর্থকদের সঙ্গে রাতে যোগাযোগ করেছেন। তার সেসব সমর্থক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের প্রার্থী ‘নিখোঁজ’ বলে স্ট্যাটাস দিচ্ছিলেন, সবুজের ফেসবুকে দেওয়া ভিডিও বক্তব্য তারাই নিজেদের ওয়ালে শেয়ার করে অন্য সমর্থকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানাচ্ছেন।
সবুজের সমর্থকদের অভিযোগ ছিল, দুপুরের পর গণ সংযোগে বের হন নারিকেল মার্কার সরকারদলীয় বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী মশিউর রহমান সবুজ। এসময় কালকিনি থানার ওসি নাসির উদ্দিন মৃধা তাকে ডেকে নিয়ে পুলিশের সরকারি গাড়িতে তোলেন। সেখান থেকে মাদারীপুর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়ার পর থেকেই সবুজ ‘নিখোঁজ’।
সবুজের চাচাতো ভাই রমিজ হাওলাদার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমার ভাই নির্বাচন রেখে ঢাকায় কেন যাবে? গেলে কি আমরা জানতাম না? আর সেটা পুলিশের গাড়িতে চড়ে কেন? এখানে পুলিশ সুপার অর্থের বিনিময়ে নৌকার পক্ষ নিয়ে ষড়যন্ত্র করতেই আমার ভাইকে গুম করার চেষ্টা করছেন।’
এ সময়ে সবুজের ফোন বন্ধ পাওয়া গেলেও বাংলাবাজার-শিমুলিয়া ফেরিঘাটে যে ফেরিতে পুলিশ সুপারের গাড়ি ওঠে, সেই গাড়িতে মশিউর রহমান সবুজেরও ফেরিতে ওঠার একটি ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। পরে সাংবাদিকরা মোবাইল ফোনে মশিউর রহমান সবুজের সঙ্গে আবারও চেষ্টা করে তার ফোন সংযোগ পান। এসময় তিনি পুলিশ সুপারের গাড়িতেই আছেন বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। তবে পুলিশ সুপার এ ঘটনায় সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘এটি ব্যক্তিগত ব্যাপার। তিনি (মশিউর রহমান সবুজ) উইলিংলি (নিজের ইচ্ছাতেই) ঢাকায় যাচ্ছেন।’
এ তথ্য পুলিশের মাধ্যমে গণমাধ্যমকে বলা হলেও সবুজের সমর্থকরা তা বিশ্বাস করতে চাননি। বরং তারা মাত্রাতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখানোয় নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর সমর্থকদের সঙ্গে সন্ধ্যায় তাদর সংঘর্ষ ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ ছররা রাবার বুলেট দিয়ে ফাঁকা গুলি বর্ষণ করলে অন্তত ৩০ জন আহত হন। তারা এখন স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
আগের সংবাদ: সরকারদলীয় বিদ্রোহী প্রার্থীকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ, আহত অর্ধশতাধিক
এদিকে মশিউর রহমান সবুজের নিখোঁজের খবর যারা ফেসবুকে ছড়িয়েছেন এবং বিক্ষোভ করেছেন, তারাই রাত সাড়ে ১০টার দিকে তিনি ঢাকায় আছেন এমন একটি ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়ে নেতা-কর্মীদের শান্ত হওয়ার অনুরোধ জানান।
সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুব হাসানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি মোবাইলে কল ধরেননি।
সবুজের ঢাকায় যাওয়ার প্রকৃত কারণ জানা সম্ভব না হলেও স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, মশিউর রহমান সবুজের কর্মী-সমর্থকরা শুক্রবার আওয়ামী লীগের প্রার্থীর এক সমর্থকের ওপর হামলা চালিয়ে তার পা ভেঙে দেয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছিল। সবুজকে বিকেলে ওসি ডেকে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তিনি নিখোঁজ-এই তথ্য ছড়াতে থাকে তার সমর্থকরা। তাদের উদ্দেশ্য ছিল দুটি: এক. সবুজকে ফিরিয়ে আনা; দুই. ভোটের মাঠে তাদের প্রার্থীর প্রতি ভোটারদের সহানুভূতি আদায়। এ কারণেই সমর্থকদের মাঝে পরিকল্পিতভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয় সবুজকে ফোনেও পাওয়া যাচ্ছে না। বাস্তবেও তার ফোন বন্ধ রাখা হয় অনেকক্ষণ। বেশিরভাগ গণমাধ্যমকর্মীও তাকে ফোনে পাননি। আর এ কারণেই তার শত শত কর্মী-সমর্থকরা জড়ো হয়ে থানা ঘেরাও করে। এছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সমর্থকদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।
তবে প্রার্থী মশিউর রহমান সবুজ নিজে তার সমর্থকদের উদ্দেশে এই সময়ে কোনও বার্তা দেননি। তার ঢাকায় যাওয়ার কারণও জানাননি। তিনি যে ঢাকায় রওনা হয়েছেন সেটাও জানাননি। ধারণা করা হচ্ছে, তার ফোন পুলিশের কাছে ছিল এবং দলীয় উর্ধ্বতন কোনও নেতার নির্দেশে তিনি ঢাকার পথে রওনা হন। তবে নির্বাচনের সুবিধা পেতে তিনি তার সমর্থকদের বিষয়টা জানাননি। অথবা তাকে ঢাকায় আসতে বাধ্য করা হয়।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ তদন্ত) আব্দুল হান্নান বলেন, মশিউর রহমান সবুজ নিজে ঢাকায় গিয়েছেন বলে জানতে পেরেছে পুলিশ এবং মশিউর রহমান সবুজের আত্মীয়-স্বজনরা পুলিশকে জানিয়েছেন যে, মশিউর রহমান সবুজ রাতেই ঢাকা থেকে মাদারীপুরে ফিরে আসছেন। তবে বিষয়টি পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে মশিউর রহমান সবুজের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে কল দিলে মোবাইলটি বন্ধ পাওয়া যায়। কিন্তু তারই কর্মী-সমর্থক যারা মশিউর রহমান সবুজের নিখোঁজের খবর ফেসবুকে ছড়িয়েছে, তারাই রাত সাড়ে ১০টার দিকে তিনি ঢাকায় আছেন এমন একটি ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়ে নেতা-কর্মীদের শান্ত হওয়ার অনুরোধ জানান। এতে আরও জানা যায়, তার সমর্থকরাও তার খোঁজে ঢাকায় চলে এসেছেন।
সবুজের এক সমর্থকের ফেসবুক পেজে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ভিডিও বার্তা দিয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মশিউর রহমান সবুজ।
ওই ভিডিও বার্তায় দেখা যায় সমর্থকবেষ্টিত অবস্থায় কথা বলছেন সবুজ। তিনি বলেন, রাতেই ঢাকা থেকে মাদারীপুরে কালকিনি ফিরবেন। আরও বলেছেন, নেতা-কর্মীরা যদি চান তাহলে তিনি অবশ্যই নির্বাচন করবেন। কোনও কিছুই তাকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দিতে পারবে না।
কালকিনিতে নির্বাচনকে ঘিরে এই রাজনৈতিক হামলা, পাল্টা-হামলা সংঘর্ষ এবং পুরো পরিস্থিতির তদন্ত দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বিশিষ্টজনরা।
সমর্থকদের উদ্দেশে ফেসবুকে ‘স্বতন্ত্র’ প্রার্থী সবুজের দেওয়া ভিডিও বার্তা








