X
শনিবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২২, ১৫ মাঘ ১৪২৮
সেকশনস

গাজীপুরে মন্দির ভাঙচুর, কী ঘটেছিল সেদিন?

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২১, ১২:৩৯

১৪ অক্টোবর ভোর ৪টা। পূজা-অর্চনা শেষে ঘুমাতে যান সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। সকাল ৭টায় হঠাৎ চিৎকার শুনে ঘুম ভাঙে। প্রতিবেশীদের কাছে শুনি মন্দিরে হামলার খবর। দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আমরা হামলাকারীদের প্রতিহতের চেষ্টা করি। এ সময় হামলাকারীদের একজনকে আটক করা হয়। হামলার আগ পর্যন্ত বিষয়টি আমরা বুঝতে পারিনি। 

কথাগুলো বলেছেন কাশিমপুর নামাবাজার এলাকার রাধা গোবিন্দ মন্দির পরিচালনা কমিটির ও কাশিমপুর থানা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাবুল রুদ্র।

ওই দিন একসঙ্গে কাশিমপুর বাজার এলাকায় তিন মন্দিরে হামলা চালিয়ে প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়। পুলিশের ভাষ্য ও ঘটনায় সম্পৃক্তদের আদালতে দেওয়া জবানবন্দি অনুযায়ী, হামলাকারীরা জামায়াতের নেতাকর্মী।

শারদীয় দুর্গাপূজার মহা অষ্টমীর দিন কুমিল্লার নানুয়াদিঘির পাড়ে অস্থায়ী পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন পাওয়ার অভিযোগে মণ্ডপে হামলা চালানো হয়। গাজীপুরের তিনটি মন্দিরে হামলা চালানো হয় ওই ঘটনার পরদিন।

গাজীপুরে প্রতিমা ভাঙচুরে জামায়াত-শিবিরের সম্পৃক্ততা পেলো পুলিশ

কাশিমপুর থানার ওসি মাহবুবে খোদা বলেন, হামলার ঘটনায় জামায়াত নেতাকর্মীর সম্পৃক্ততা পেয়েছি আমরা। তবে গাজীপুর মহানগর জামায়াতের আমির অধ্যক্ষ এসএম সানাউল্লাহ বলেছেন, ওসব ঘটনায় জামায়াতের নেতাকর্মী জড়িত নয়।  

বাবুল রুদ্র বলেন, ১৪ অক্টোবর সকাল ৭টার দিকে কয়েকশ’ লোক লাঠিসোঁটা নিয়ে রাধা গোবিন্দ মন্দিরে হামলা চালায়। তারা লক্ষ্মী ও অসুরের প্রতিমা ভাঙচুর করে। এতে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। যারা হামলা করেছে তাদের মধ্যে গ্রেফতারকৃত কেউই এলাকার নয়। সবাই বাইরের।

একই দিন সকাল সাড়ে ৬টার দিকে দেড় থেকে দুইশ’ লোক কাশিমপুর পশ্চিমপাড়া এলাকার ব্যবসায়ী সুবল দাসের পারিবারিক মন্দিরে এবং স্থানীয় পালপাড়া নামাবাজার সার্বজনীন মন্দিরে হামলা চালায়। এ সময় হামলাকারীরা মন্দিরের সব প্রতিমা ভাঙচুর করে। হামলার সময় ২০ জনকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করে স্থানীয়রা।

পারিবারিক মন্দির পরিচালনাকারী সুবল চন্দ্র দাস ও পালপাড়া নামাবাজার এলাকার সার্বজনীন পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি পরিমল পাল জানান, সেদিন বাইরের লোকজন মন্দিরে হামলা চালিয়েছিল। এলাকার লোকজন নিয়ে আমরা প্রতিরোধ করেছি।

প্রতিমা ভাঙচুরের প্রতিবাদে ওই দিনই হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে হামলাকারীদের গ্রেফতারের দাবিতে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছেন। এ ঘটনায় তিনটি মামলা হয়েছে। এ পর্যন্ত ৪৪ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

তবে মন্দিরে হামলার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার (৪ নভেম্বর) আনুষ্ঠানিকভাবে স্থানীয় শশ্মানঘাটে প্রতিমা ছাড়াই কালীপূজা উদযাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।

বাবুল চন্দ্র রুদ্র বলেন, এবার প্রতিমা ছাড়াই কালীপূজার আয়োজন হবে। বিশেষ কোনও আনুষ্ঠানিকতা থাকবে না। স্থানীয় শশ্মানে কালীপূজার দিন সন্ধ্যা ৬টায় মুখে কালো কাপড় বেঁধে প্রদীপ প্রজ্বালন করে ১৫ মিনিট নীরবতা পালন করা হবে। ঐতিহাসিকভাবে এই পূজা বছরে তিন দিন উদযাপিত হয়ে আসছিল। কিন্তু এবার প্রতিবাদ জানানোর জন্য কয়েক ঘণ্টাব্যাপী হবে।

তিনি বলেন, আমাদের দুঃসময়ে সিটি মেয়র জাহাঙ্গীর আলম ও জেলা প্রশাসক এস এম তরিকুল ইসলামসহ অনেকে পাশে দাঁড়িয়েছেন। এ জন্য তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। জেলা প্রশাসক ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি মন্দিরের জন্য ৫০ হাজার টাকা দিয়েছেন।

একই পরিষদের ভান্ডার রক্ষক পঞ্চরত্ন শীল বলেন, হামলার পর থেকে এলাকার সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ভীত হয়ে পড়েছেন। পুলিশ প্রশাসন ও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই সহযোগিতা করছেন আমাদের।

একই পরিষদের উপদেষ্টা প্রভাষ কুমার দে বলেন, কাশিমপুর এলাকায় অসাম্প্রদায়িক সহাবস্থান ছিল এবং আছে। আমরা বিশ্বাস করি, ভবিষ্যতেও এটা বিদ্যমান থাকবে। সেদিন বহিরাগতরা মন্দিরে হামলা চালিয়েছিল। কার ইশারায় বহিরাগতরা এলাকার অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ অশান্ত করে তুলেছিল তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।

মহানগর জামায়াতের আমির সানাউল্লাহ বলেন, মহানগর জামায়াতের অ্যাসিসট্যান্ট সেক্রেটারি হোসেন আলীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ঘটনার চার দিন পর সাংগঠনিক বৈঠক থেকে কোনাবাড়ি থানা জামায়াতের সভাপতি কবির হোসেনসহ আরও ১০-১২ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জানমালের ক্ষতি ও মন্দিরে হামলার বিষয়টি জামায়াতের রাজনীতির সংস্কৃতিতে নেই। প্রকৃত অপারাধীদের চিহ্নিত করে গ্রেফতারের দাবি জানাই। গ্রেফতার জামায়াতের নেতাকর্মীরা মন্দিরে হামলা ও ভাঙচুরে জড়িত নয়। তাদের মুক্তি চাই।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (অপরাধ) জাকির হাসান বলেন, মামলার পরদিন ১৫ অক্টোবর ২৮ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। স্থানীয় এক জামায়াত নেতা ও দুই কর্মীসহ স্থানীয় পোশাক কারখানার কয়েকজন কর্মী মন্দির ভাঙচুরে নেতৃত্ব দিয়েছিল। গ্রেফতারকৃতরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। প্রতিমা ভাঙচুরের নেতৃত্বে ছিলেন মহানগরের কোনাবাড়ি ইউনিটের জামায়াতের সভাপতি রবিউলসহ শিবিরের দুই কর্মী। রবিউল ইতোপূর্বে শিবিরের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

ওসি মাহবুবে খোদা বলেন, ১৪ সেপ্টেম্বর রাতে বাবুল রুদ্র, সুবল চন্দ্র দাস ও পরিমল পাল বাদী হয়ে তিনটি মামলা করেছেন। প্রতিটি মামলায় অজ্ঞাত ১৫০-২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। প্রথম মামলায় ২০ জনকে গ্রেফতারের পর আদালতের নির্দেশে দুই দিন করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পরে আরও আট জনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের মধ্যে সাত জনকে ১৮ অক্টোবর তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে কারাগারে পাঠানো হয়। এর মধ্যে একজন স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। ২৯ অক্টোবর রাতে আরও ২৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ নিয়ে তিন মামলায় ৫২ জনকে গ্রেফতার করা হলো। তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

/এএম/
সম্পর্কিত
ফরিদপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় ইউনিয়ন সমাজসেবা কর্মকর্তাসহ নিহত ২
ফরিদপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় ইউনিয়ন সমাজসেবা কর্মকর্তাসহ নিহত ২
৬ ঘণ্টা পর নিয়ন্ত্রণে নারায়ণগঞ্জের কারখানার আগুন
৬ ঘণ্টা পর নিয়ন্ত্রণে নারায়ণগঞ্জের কারখানার আগুন
টমেটোর বাম্পার ফলনেও কপালে চিন্তার ভাঁজ চাষির
টমেটোর বাম্পার ফলনেও কপালে চিন্তার ভাঁজ চাষির
দেনা করে অবৈধ পথে ইতালির উদ্দেশে রওনা, ভূমধ্যসাগরে মৃত্যু
দেনা করে অবৈধ পথে ইতালির উদ্দেশে রওনা, ভূমধ্যসাগরে মৃত্যু
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
ফরিদপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় ইউনিয়ন সমাজসেবা কর্মকর্তাসহ নিহত ২
ফরিদপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় ইউনিয়ন সমাজসেবা কর্মকর্তাসহ নিহত ২
৬ ঘণ্টা পর নিয়ন্ত্রণে নারায়ণগঞ্জের কারখানার আগুন
৬ ঘণ্টা পর নিয়ন্ত্রণে নারায়ণগঞ্জের কারখানার আগুন
টমেটোর বাম্পার ফলনেও কপালে চিন্তার ভাঁজ চাষির
টমেটোর বাম্পার ফলনেও কপালে চিন্তার ভাঁজ চাষির
দেনা করে অবৈধ পথে ইতালির উদ্দেশে রওনা, ভূমধ্যসাগরে মৃত্যু
দেনা করে অবৈধ পথে ইতালির উদ্দেশে রওনা, ভূমধ্যসাগরে মৃত্যু
বন্ধক রাখা গহনা ফেরত চাওয়ায় মার্জিয়াকে হত্যা করে মাসুদ
বন্ধক রাখা গহনা ফেরত চাওয়ায় মার্জিয়াকে হত্যা করে মাসুদ
© 2022 Bangla Tribune