মাদারীপুরের শিবচরের বন্দরখোলা ইউনিয়নের নুরুদ্দিন মাদবরের কান্দি গ্রামের ভ্যানচালক আব্দুল কুদ্দুস। তিন বেলা ঠিকমতো খাবার জোটাতেই যেখানে কষ্ট, সেখানে ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচ চালানো তার জন্য কষ্টসাধ্য। তবে অদম্য মনোবল থাকলে যে দারিদ্র্য জয় করা যায়, তা দেখালেন তার মেয়ে শারমিন আক্তার।
গত সোমবার প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফলে স্থানীয় নুরুদ্দিন মাদবরের কান্দি এসইএসডিপি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে শারমিন। তিন ভাইবোনের মধ্যে মেজো সে। তিন বছর আগে পদ্মা নদীর ভাঙনে ভিটেমাটি ও ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে গেছে তাদের। নদীভাঙনে সব বিলীন হলেও মনোবল ভাঙেনি তার। অনেক কষ্টে লেখাপড়া চালিয়ে গেছে। এখন স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়ার। তবে স্বপ্নপূরণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আর্থিক অসচ্ছলতা। তার লেখাপড়া চালানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে পরিবার।
আব্দুল কুদ্দুস জানিয়েছেন, নুরুদ্দিন মাদবরের কান্দি এলাকায় বাড়ি ছিল তার। ২০২০ সালে পদ্মা নদীর ভাঙনে ঘড়বাড়ি সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যান। পরে অন্যের জমিতে ঘর করে বসবাস শুরু করেন। ওই সময়ে নদীগর্ভে হারিয়ে যায় শারমিনের বিদ্যাপীঠ নুরুদ্দিন মাদবরের কান্দি এসইএসডিপি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ভবন। এতে অনিশ্চয়তায় পড়ে পড়ালেখা। কয়েক মাস পর বাড়ি থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে টিনশেড ঘর তৈরি করে শুরু হয় বিদ্যালয়ের কার্যক্রম। ঝরে পরে অনেক শিক্ষার্থী। তবে দূরের পথ হলেও শারমিন লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। কিন্তু লেখাপড়ার খরচ চালিয়ে যেতে বাবা হিমশিম খাওয়ায় সকালে মক্তবে ও বিকালে বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়িয়ে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যায়।
রবিবার বিকালে শারমিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, ভাঙাচোরা টিনের ঘর। এক ছেলে, দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে এই ঘরে বসবাস করেন কুদ্দুস। ভ্যান চালিয়ে যা আয় হয়, তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলে।
আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘মেয়ে লেখাপড়ার বাইরে কখনও কোনও আবদার করেনি। আবদার করলেও অভাবের সংসারে পূরণ করতে পারতাম না। তবে মেয়ের এমন ফলে আমি খুশি। কিন্তু এখন কলেজে পড়ানোর সামর্থ্য নেই। সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে তার লেখাপড়া চালাতে পারবো, না হয় কী হবে জানি না।’
শারমিন আক্তার জানায়, ‘বাবা বয়স্ক মানুষ। সংসার চালাতে ভ্যান চালান। তবে নিয়মিত ভ্যান চালাতে পারেন না। তাই সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকে। অনেক কষ্ট করে মানুষের কাছ থেকে সহায়তা নিয়ে আমাদের তিন ভাইবোনকে লেখাপড়া করাচ্ছেন। পাশাপাশি স্কুলের শিক্ষকেরা আমার পাশে ছিলেন। টাকার অভাবে প্রাইভেট পড়তে না পারলেও শিক্ষকেরা নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন।’
শারমিন আরও জানায়, ‘বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ের দূরত্ব পাঁচ কিলোমিটার। অনেক সময় গাড়ি ভাড়া দিতে পারতেন না বাবা। তাই হেঁটেই স্কুলে যেতাম। কখনও ক্লাসে অনুপস্থিত থাকিনি। দিনে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা বাড়িতে মনোযোগ সহকারে পড়াশোনা করায় এমন ফল এসেছে। কিন্তু এখন কলেজে ভর্তি নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। পড়াশোনা করে আমি চিকিৎসক হয়ে এলাকার দরিদ্র মানুষের সেবা করতে চাই।’
নুরুদ্দিন মাদবরের কান্দি এসইএসডিপি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আফজাল হোসেন বলেন, ‘শারমিনের এমন ফলে আমরা আনন্দিত। সে স্কুলের মনোযোগী ছাত্রী। পিছিয়ে পড়া এলাকায় থেকে পড়াশোনা করে জিপিএ-৫ পাওয়া মোটেই সহজ নয়। আমরা তার ভবিষ্যৎ জীবনের সফলতা কামনা করি।’









