মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতা বালুমহালের ইজারাদারের ম্যানেজার মিরাজ হোসেনকে (৪০) প্রকাশ্যে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় প্রভাবশালী একটি চক্রের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে একটি সিন্ডিকেটের সম্পৃক্ততা আছে বলে জানিয়েছে পুলিশের গোয়েন্দা ইউনিট। এতে সিরাজগঞ্জের একটি বালুমহালের ইজারাদার সাবেক এক কমিশনারের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, সিরাজগঞ্জের একটি বালুমহালের ইজারাদার ও সাবেক কমিশনার আওয়ামী লীগ নেতা মো. আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে তেওতা বালুমহালের ইজারাদার কাওছার আলম খানের দ্বন্দ্ব রয়েছে। এই দ্বন্দ্বের জের ধরে ইজারাদার কাওসারের ম্যানেজার মিরাজ হোসেনকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়। নিহত মিরাজ হোসেন পাবনা সদর উপজেলার দাপুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা এবং তেওতা বালুমহালের ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
এ ঘটনায় শনিবার নিহতের ছেলে জিহাদ হোসেন বাদী হয়ে শিবালয় থানায় অজ্ঞাতনামা ১০-১২ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন। এর আগে শুক্রবার বিকালে যমুনা নদীর দুর্গম চরাঞ্চল আলোকদিয়া এলাকায় হত্যাকাণ্ড ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, শুক্রবার বিকাল ৫টার দিকে নদীর পাড়ে একটি ড্রেজারে বসে মিরাজ ও তার সহযোগীরা বালু বিক্রির হিসাব-নিকাশ করছিলেন। এ সময় একটি স্পিডবোটে করে একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত এসে হামলা চালায়। তারা প্রথমে মিরাজকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে এবং পরে রামদা দিয়ে কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। স্থানীয়রা মিরাজকে উদ্ধার করে মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। হামলা শেষে তারা পুনরায় স্পিডবোটে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। এ সময় জাহাঙ্গীর হোসেন (৪২) নামে স্থানীয় এক ব্যক্তিও গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ জাহাঙ্গীরকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়েছে।
তেওতা বালুমহালের ইজারাদার কাওছার আলম জানান, গত বুধবার বিকালে মোবাইলে অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তি বিদেশি নম্বর থেকে তাকে (কাওছার) হুমকি দেন। হুমকিদাতা বলেন, বাল্কহেডে বালু বিক্রি করলে তাকে খুন করা হবে। এ বিষয়ে গত বৃহস্পতিবার তিনি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, তেওতা বালুমহালটি ইফতি এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছিল। সম্প্রতি নতুন দরপত্রে আরেক প্রতিষ্ঠান ইজারা পায়। এই বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দুটি পক্ষের বিরোধ চলছে।হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা আছে। বিশেষ করে সিরাজগঞ্জের বালুমহালের ইজারাদার ও সাবেক কমিশনার আওয়ামী লীগ নেতা মো. আব্দুস সাত্তারের নাম উঠে এসেছে গোয়েন্দা সূত্রে। আব্দুস সাত্তার সাবেক কমিশনার এবং ১০ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মানিকগঞ্জ জেলা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পুরো ঘটনাটি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। আব্দুস সাত্তার ও তার সহযোগীদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি রাখা হয়েছে।
পুলিশের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বালুমহালকেন্দ্রিক এই হত্যাকাণ্ড বিচ্ছিন্ন নয়, এর পেছনে প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত। আমরা সব দিক খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেবো।’
মানিকগঞ্জে নদীকেন্দ্রিক বালু ব্যবসা ঘিরে অতীতে সহিংসতার নজির থাকলেও প্রকাশ্যে গুলি ও কুপিয়ে হত্যার এই ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় লোকজন বলছেন, প্রশাসনের পূর্ব সতর্কতা থাকা সত্ত্বেও এমন নৃশংস হামলা প্রতিরোধ করা না যাওয়ায় প্রশ্ন উঠছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও।
শিবালয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনির হোসেন বলেন, ‘হত্যার ঘটনায় নিহতের ছেলে জিহাদ হোসেন বাদী হয়ে শনিবার সন্ধ্যায় ১০-১২ জন অজ্ঞাতনামা আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তে তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে অভিযানে নেমেছে পুলিশ। বালুমহাল কিংবা ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের জের ধরে পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটেছে। যারাই ঘটনায় জড়িত গ্রেফতার করা হবে।’









