‘কুমারবাড়ির মেলা’ কীভাবে হলো ‘জামাই মেলা’

এনায়েত করিম বিজয়, টাঙ্গাইল
১৩ এপ্রিল ২০২৬, ১৮:০১আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ১৮:০১

টাঙ্গাইলের রসুলপুরে ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে চলছে ঐতিহ্যবাহী জামাই মেলা। এটিকে কেন্দ্র করে অন্তত ৩০ গ্রামের জামাই-বউয়ের ঢল নামে মেলায়। ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে দিনটির জন্য অপেক্ষা করেন এই অঞ্চলের জামাই-বউরা। এই দিনে প্রায় প্রতি বাড়িতে জামাইদের উপস্থিতিতে আনন্দ উদযাপন করা হয়। বিশেষ করে জামাই-বউদের উপস্থিতিতে মিলনমেলায় পরিণত হয় মেলাটি।  

মেলায় হরেক পদের মিষ্টান্ন, খেলনা, কাঠের আসবাব, প্রসাধনীর দোকান ছাড়াও চরকি, নাগরদোলা, মৃত্যুকূপে মোটরসাইকেল খেলা, সার্কাসসহ নানা আনন্দের আয়োজন করা হয়ে থাকে। আগতদের আকৃষ্ট করতে দোকানিরা বিভিন্ন রকমের খাবার, প্রসাধনীর পসরা ও বিভিন্ন জিনিসপত্রের দোকান সাজিয়ে বসেন। জামাই-বউ ছাড়াও মেলায় বিভিন্ন বয়সী মানুষের ঢল নামে।

মেলার আয়োজকরা জানান, ২০০ বছরের বেশি সময় আগে বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে বৈশাখ মাসের ১১ তারিখে ‘কুমারবাড়ির মেলা’ নামে রসুলপুরে মেলাটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। পরে বৈশাখী মেলা নামে পরিচিতি পেয়েছিল। এরপর কালের পরিক্রমায় ধীরে ধীরে ‘জামাই মেলা’ নামে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে ‘জামাই মেলা’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বর্তমানে বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে ১১, ১২ ও ১৩ তারিখে তিন দিনব্যাপী মেলার আয়োজন করে রসুলপুর গ্রামবাসী। আশপাশের অন্তত ৩০ গ্রামের মেয়ের জামাই বেড়াতে আসেন শ্বশুরবাড়ি। সস্প্রতি সময়ে জামাই-বউরাই মেলার মূল আকর্ষণে পরিণত হয়েছেন। মেলার দিন শাশুড়িরা মেয়ের জামাইয়ের হাতে উপহার হিসেবে টাকা দিয়ে থাকেন। মেলায় আগত বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি, আকড়ি, চিনিসাজ এনে শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে খাওয়ান জামাইরা। এটি এখন বড় উৎসবে পরিণত হয়েছে। এই এলাকার মানুষের কাছে ঈদ কিংবা পূজা-পার্বণের মতোই উৎসব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অন্তত ৩০ গ্রামের জামাই-বউয়ের ঢল নামে মেলায়

মেলার আয়োজক কমিটির সদস্যরা জানিয়েছেন, মেলা ঘিরে রসুলপুর ও আশপাশের মেয়েরা তাদের স্বামীকে নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে আসেন। এই দিনে জামাইকে বরণ করে নেওয়ার জন্য শ্বশুর-শাশুড়িরা আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে থাকেন। জামাইরাও এই দিনের অপেক্ষায় থাকেন। একে-অপরের সঙ্গে দেখা হয়। তারাও আনন্দ-বিনোদনে মেতে উঠেন। বছরের এই দিনে পুরো এলাকায় উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে ঈদের সময় শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে না এসে মেলার অপেক্ষায় থাকেন। 

মেলার আয়োজক কমিটি সূত্রে জানা যায়, মেয়ের জামাই ও ছেলের বউসহ আত্মীয়-স্বজনদের খাওয়ানোর জন্য রসুলপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ২০টি গরু জবাই হয়ে থাকে। কক্সবাজার, রাজশাহী, খুলনা ও সিরাজগঞ্জসহ আশপাশের তিন শতাধিক ব্যবসায়ী বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্র নিয়ে আসেন বিক্রির জন্য। মেলাটি ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কের পাশে হওয়ায় ব্যবসায়ী ও আগত লোকজনদের যাতায়াতে সুবিধা হয়। এজন্য ঐতিহ্যবাহী এই মেলায় ব্যাপক মানুষের উপস্থিতি ঘটে প্রতি বছর।

দোকানিরা বিভিন্ন রকমের খাবার, প্রসাধনীর পসরা ও বিভিন্ন জিনিসপত্রের দোকান সাজিয়ে বসেন

স্থানীয় বাসিন্দা কবি ও কথাসাহিত্যিক রাশেদ রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই মেলার উৎপত্তি কবে সেটা সঠিকভাবে কেউ জানে না। যুগ যুগ ধরে এটি অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এলাকার মানুষের কাছে ঈদ বা পূজা-পার্বণের মতোই এটি একটি উৎসব। বৈশাখী মেলা হিসেবে শুরু হলেও এখন এটি ‘জামাই মেলা’ হিসেবে পরিচিত। মেলা উপলক্ষে রসুলপুর ও এর আশপাশের প্রায় ৩০টি গ্রামের মেয়েরা তাদের বরকে নিয়ে বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসেন। মেয়ের জামাইয়ের জন্য শ্বশুরবাড়িতে থাকে নানা আয়োজন। জামাইয়ের হাতে কিছু টাকা তুলে দেন শাশুড়িরা। প্রথা অনুযায়ী, সেই টাকার সঙ্গে আরও কিছু টাকা যোগ করে জামাইরা মেলা থেকে চিড়া, মুড়ি, আকড়ি, মিষ্টি, জিলাপিসহ বিভিন্ন জিনিস কিনে শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে যান।’

টাঙ্গাইল সদর উপজেলার গালা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেলা আয়োজক কমিটির সাবেক আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই মেলাটি দেখে আসছি। ধারণা করা হচ্ছে- ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে এর আয়োজন হয়ে আসছে। এখানে একসময় কুমারবাড়ির মেলা হতো। কালের পরিক্রমায় ধীরে ধীরে জামাই মেলা নামে পরিচিতি পায়। আগে একদিন হলেও বর্তমানে বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে ১১, ১২ ও ১৩ তারিখে মেলার আয়োজন করা হয়। এটি বৃহৎ মেলা। জামাই-বউদের উপস্থিতিতে মেলায় পা ফেলার জায়গা থাকে না। জামাই-বউসহ বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষের ঢল নামে মেলায়।’

জামাই-বউ ছাড়াও মেলায় বিভিন্ন বয়সী মানুষের ঢল নামে

মেলা শুরুর দুই-একদিন আগেই দেশের বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন জিনিসপত্রের দোকান বসাতে আসেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে শতাধিক স্বেচ্ছাসেবক দায়িত্ব পালন করেন। তিন দিনের মেলায় প্রায় পাঁচ কোটি টাকার মালামাল বিক্রি হয়ে থাকে। এবারও মেলাটি আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।’ 

/এএম/ 
সম্পর্কিত
রাজধানীতে বাহারি পাহাড়ি ফলের মেলা
বেইলি রোডে বসছে ৩ দিনব্যাপী ‘পাহাড়ি ফল মেলা ২০২৬’
দেশি ফলের রঙে-গন্ধে মাতোয়ারা খামারবাড়ি
সর্বশেষ খবর
অটোরিকশা ও কাভার্ডভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ২
অটোরিকশা ও কাভার্ডভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ২
সুড়ঙ্গে আর কোনও জীবিত ব্যক্তির সন্ধান মেলেনি
সুড়ঙ্গে আর কোনও জীবিত ব্যক্তির সন্ধান মেলেনি
ফেব্রিক্স আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে নতুন উদ্বেগ পোশাক খাতে
ফেব্রিক্স আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে নতুন উদ্বেগ পোশাক খাতে
রাজস্থানের পর্যটনে নতুন চমক, ৬ মাসেই ১০.৯২ কোটি পর্যটকের ভিড়
রাজস্থানের পর্যটনে নতুন চমক, ৬ মাসেই ১০.৯২ কোটি পর্যটকের ভিড়
সর্বাধিক পঠিত
দেড় ঘণ্টা পর শাহবাগ ছাড়লেন ‘ঢাকাস্থ নোয়াখালীবাসীরা’
দেড় ঘণ্টা পর শাহবাগ ছাড়লেন ‘ঢাকাস্থ নোয়াখালীবাসীরা’
নতুন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল
নতুন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল
বন্ধ হয়ে গেলো ১৮ বছর ধরে চলা দূরপাল্লার বাস সার্ভিস
বন্ধ হয়ে গেলো ১৮ বছর ধরে চলা দূরপাল্লার বাস সার্ভিস
পেডিকিউর থেকে কেনাকাটা, পাতায়ায় মার্কিন নাবিকদের ছুটির আমেজ
পেডিকিউর থেকে কেনাকাটা, পাতায়ায় মার্কিন নাবিকদের ছুটির আমেজ
বৃন্দাবনের যে অংশে সন্ধ্যার পর প্রবেশ নিষেধ
বৃন্দাবনের যে অংশে সন্ধ্যার পর প্রবেশ নিষেধ