নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার লাঙ্গলবন্দে ব্রহ্মপুত্র নদে সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মহাঅষ্টমী পুণ্যস্নানে লাখো পুণ্যার্থীর ঢল নামে প্রতি বছর। এই পুণ্যস্নান ঘিরে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে প্রতি বছর জমে লাঙ্গলবন্দের মেলা। এতে লাখ লাখ দেশি-বিদেশি ভক্তরা জমায়েত হন। পবিত্র তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত এই লাঙ্গলবন্দ স্থান ও মেলার রয়েছে ধর্মীয় ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতা। দেবতার আশীর্বাদের পর থেকে পাপমোচনের লক্ষ্যে লাঙ্গলবন্দের ব্রহ্মপুত্র নদে লাখ লাখ পুণ্যার্থী স্নানোৎসবে আসতে শুরু করেন। পুণ্যার্থীদের প্রয়োজনের তাগিদে ও ভক্তদের মিলনমেলা হিসেবে শত শত বছর আগে থেকে এই মেলার যাত্রা শুরু হয়।
তবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ভাষ্যমতে, লাঙ্গলবন্দে মেলা স্নানোৎসবের অনেক পরে শুরু হয়েছে। এ ছাড়া দেবতা পরশুরামের এক আধ্যাত্মিক ঘটনার মধ্য দিয়ে লাঙ্গলবন্দ এলাকার নামকরণ করা হয় এবং স্নানোৎসব শুরু হয়েছিল। যে কারণে স্নানোৎসবের সঙ্গে ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়।
হিন্দু পুরাণ অনুসারে পরশুরামের মাতৃহত্যা ও লাঙ্গলবন্দ স্নানের ইতিহাস
ত্রেতা যুগের সূচনাকালে পরশুরাম ছিলেন ভগবান বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার এবং ঋষি জমদগ্নি ও মাতা রেণুকার কনিষ্ঠ পুত্র। একদিন মা রেণুকা জল আনতে গঙ্গায় গেলে সেখানে গন্ধর্বরাজ চিত্ররথের জলবিহার দেখে ক্ষণিকের জন্য বিমোহিত (মুগ্ধ) হন। এর ফলে তার মনের পবিত্রতা ক্ষুণ্ন হয়। এদিকে ঋষি জমদগ্নি তার দিব্যদৃষ্টিতে সব জানতে পেরে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন। তিনি তার ছেলেদের আদেশ দেন মাকে হত্যা করতে। প্রথম চার ছেলে এই নিষ্ঠুর আদেশ পালন করতে অস্বীকার করলে ঋষি তাদের অভিশাপ দেন।
অবশেষে কনিষ্ঠ পুত্র পরশুরাম পিতার আদেশ পালনে রাজি হন এবং কুঠারের আঘাতে মায়ের শিরশ্ছেদ করেন। পরশুরামের পিতৃভক্তিতে খুশি হয়ে জমদগ্নি তাকে আশীর্বাদ দিতে চাইলে তিনি তার মা ও ভাইদের জীবন ফিরে চান এবং চান তারা যেন এই হত্যার স্মৃতি ভুলে যায়। ঋষি সেই আশীর্বাদ করলে তারা পুনরুজ্জীবিত হন।
লাঙ্গলবন্দ স্নান ও পাপমুক্তি
মাকে হত্যা করার পর পরশুরামের হাতে সেই রক্তমাখা কুঠারটি আটকে যায়। অনেক চেষ্টা করেও তা হাত থেকে আলাদা করতে পারছিলেন না। এই মাতৃহত্যার পাপ থেকে মুক্তির জন্য তীর্থে তীর্থে ঘুরে বেড়ান। পরিশেষে জানতে পারেন হিমালয়ের মানস সরোবরে স্নান করলে এই পাপমোচন হবে। সেখানে স্নান করার সঙ্গে সঙ্গে তার হাতের কুঠারটি খসে পড়ে। পরশুরাম চাইলেন সাধারণ মানুষের পাপমুক্তির জন্য এই পুণ্য জলধারাকে সমতলে নিয়ে আসতে। তিনি তার কুঠারটি লাঙ্গলের সঙ্গে বেঁধে হিমালয় থেকে পথ কেটে জলধারা বয়ে নিয়ে চলেন। নারায়ণগঞ্জের কাছে এসে তার লাঙ্গলটি আটকে যায়। তাই এই স্থানের নাম হয় লাঙ্গলবন্দ। প্রতি বছর চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা ব্রহ্মপুত্র নদের এই স্থানে পুণ্যস্নান করেন। ভক্তদের বিশ্বাস, এই তিথিতে এখানে স্নান করলে পরশুরামের মতোই সব পাপ থেকে মুক্তি লাভ করা সম্ভব।
তিথির সময় অনুসারে প্রতি বছর ‘হে মহাভাগ ব্রহ্মপুত্র, হে লৌহিত্য, আমার পাপ হরণ করো’ মন্ত্র উচ্চারণ করে লাঙ্গলবন্দে স্নান শুরু করেন ভক্তরা। এ বছর ব্রহ্মপুত্র নদের ২৪টি ঘাটে স্নান উৎসব পালিত হয়। স্নান উৎসবে ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভুটান, মালদ্বীপসহ দেশ-বিদেশের লাখ লাখ ভক্ত এসে সমবেত হন।
স্নান উৎসব উপলক্ষে লাখ লাখ তীর্থযাত্রী সমবেত হওয়ায় এই স্থানটি প্রাচীনকাল থেকেই বিশাল মেলায় পরিণত হয়। যেখানে লোকজ ও কারুশিল্পসহ বিভিন্ন আসবাবপত্রের দোকান বসে।
স্নান উপলক্ষে মেলা
স্নানোৎসব ঘিরে লাঙ্গলবন্দ এলাকার মিনার বাড়ি স্ট্যান্ড থেকে জহোরপুর এলাকার মাদ্রাসা পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদের তীরে মেলা বসে। ঐতিহ্যবাহী শীতল পাটি, মাটির তৈরি বিভিন্ন তৈজসপত্র, খেলনা বিক্রি হয়। এ ছাড়া মেলায় আসবাবপত্র, দা, বঁটি থেকে শুরু করে বহু ধরনের দোকান বসে। সড়কের দুই পাশে ঢোল, খেলনা ও পিটি-নিমকির দোকান বসে। সাত দিনব্যাপী চলে মেলা।
পাশাপাশি লাঙ্গলবন্দের বিভিন্ন মন্দিরে চলে ভক্তিমূলক গান। সেবাশ্রমগুলো থেকে বিতরণ করা হয় খিচুড়ি, দুধ, পানিসহ বিভিন্ন খাবার। অষ্টমীর স্নান উপলক্ষে লাঙ্গলবন্দ এলাকাজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়।
লাঙ্গলবন্দ মিনারবাড়ি এলাকার ৬৫ বছর বয়সী হরিপাল চক্রবর্তী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে লাঙ্গলবন্দের স্নান ও মেলা দেখে আসছি। বাবা-দাদার কাছেও এই মেলার গল্প অনেক শুনেছি। স্নান উৎসবে আগে অনেক ভক্ত আসতো। তারা আশপাশের বিভিন্ন লোকজনের বাড়িতে অবস্থান করতো। সেসময় তারা নিজেরা রান্না করে খাবার খেতো। এমন প্রয়োজনে ধীরে ধীরে মেলা বসতে শুরু করে। তা ছাড়া স্নান উৎসবে আসা ভক্তদের আনন্দের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয় মেলার শোরগোল।’
একই কথা বলেছেন লাঙ্গলবন্দ এলাকার স্বামী দিগ্বিজয় ব্রহ্মচারী আশ্রমের সেবায়েত বিষ্ণু ভট্টাচার্য। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মা হত্যার দায়ে দেবতা পরশুরামের হাতে যে কুঠার লেগে থাকে, পরে সেই কুঠার থেকে মুক্তি পাওয়ার মধ্য দিয়ে এই লাঙ্গলবন্দ স্নানের সূচনা হয়। তা ছাড়া লাঙ্গলবন্দ এলাকায় দেবতা পরশুরামের লাঙ্গল এসে বন্ধ হয়েছিল, এ কারণে এটাকে লাঙ্গলবন্দের স্নান বলা হয়। যে কারণে স্থানটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য মহা তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত। তবে স্নানোৎসব ঠিক কত বছর আগে থেকে শুরু হয়েছে, তা কারও জানা নেই। শত শত বছর আগে ত্রেতা যুগে শুরু হয়েছে হয়তো। সেই থেকে পাপমোচনের জন্য ভক্তরা এই তীর্থস্থানে এসে স্নান করে ও মেলা ঘুরে পছন্দের জিনিসপত্র কেনেন।’
স্নান উপলক্ষে ভক্তরা এখানে এসে প্রতি বছর জমায়েত হতো উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ফলে খাওয়া-দাওয়াসহ নানা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের প্রয়োজন দেখা দিলে দোকানপাট বসতে শুরু করে। ভক্তদের জমায়েত ও মিলনমেলার ফলে মূলত মেলার দোকান বসতো। প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ বছর আছে এই মেলা শুরু হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট করে সেই সময় বলা সম্ভব নয়। এখন আগের তুলনায় মেলা আরও জমজমাট হয়েছে। এই মেলায় নেপাল, ভারত, ভুটানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ভক্তরা আসেন।’
শত শত বছর ধরে লাঙ্গলবন্দ স্নান ও মেলা হচ্ছে
লাঙ্গলবন্দের আদি হাতিখোলা শ্মশান মন্দিরের সেবায়েত দিলীপ চক্রবর্তী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শত শত বছর আগে লাঙ্গলবন্দের স্নান উপলক্ষে মেলা শুরু হয়। একসময় স্নান উপলক্ষে হাজার হাজার ভক্ত এখানে এসে অগণিত মাটির চুলা বসিয়ে রান্না করে খাবারের আয়োজন করতেন। সেসময় ভক্তরা অন্য কারও দেওয়া খাবার খেতেন না। এসব প্রয়োজনে পরবর্তীতে দোকান বসতে শুরু করে। যা বর্তমানে মেলায় পরিণত হয়।’
লাঙ্গলবন্দের প্রেমতলা মন্দিরের পরিচালক ও নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি ভবানী শংকর রায় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শত শত বছর ধরে লাঙ্গলবন্দ স্নান ও মেলা হচ্ছে। তবে ঠিক কত শত বছর আগে এই মেলা শুরু হয়েছে, তা বলা মুশকিল। আর ধর্মীয় উৎসবগুলোর সঙ্গে মেলার যেমন সম্পর্ক থাকে ঠিক তেমনি লাঙ্গলবন্দ স্নান উৎসবের সঙ্গে মেলার একটা সম্পর্ক রয়েছে। মেলার মাধ্যমে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী মাটির, কাঠের, তামার, কাসার ও বেতের নানা খেলনা ও তৈজসপত্র বিক্রি হয়। যা আগে মেলার দোকানগুলোতে বিক্রি হতো। এখন অবশ্য যুগের আধুনিকায়নের ছোঁয়ায় বিভিন্ন দোকানে এসব বিক্রি হয়। তবে আগে একটা সময় এসব জিনিসপত্র বেশিরভাগ বিক্রি হতো মেলার দোকানে। তা ছাড়া মেলা হচ্ছে গ্রামীণ সংস্কৃতির অংশ। এখন জায়গা সংকটসহ নানা কারণে আগের মতো মেলা জমজমাট হয় না।’
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শিপন সরকার শিখন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পাপমোচনের উদ্দেশ্যে শত বছর ধরে স্নান উৎসব চলে আসছে। যুগ যুগ ধরে আমরা এই উৎসব পালন করে যাচ্ছি। প্রতি বছর দেশ ও বিদেশের লাখ লাখ পুণ্যার্থী লাঙ্গলবন্দ স্নানে আসেন।’
মেলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শত শত বছর আগে থেকে এই মেলা শুরু হয়েছে। স্নান উৎসবকে কেন্দ্র করে মেলায় দোকানপাট বসে। মূলত ভক্তদের জমায়েত হওয়ার কারণে মেলার সূচনা হয়েছিল। স্নান উৎসবে আসা ভক্তদের খাবারসহ নানা চাহিদা পূরণ করার লক্ষ্যে মেলা বসে।’









