গাজীপুরের শ্রীপুরে চাঁদা না দেওয়ায় এক ব্যবসায়ীকে দোকান থেকে তুলে নিয়ে গরম রড দিয়ে ছ্যাঁকা এবং পিটিয়ে গুরুতর আহত করার অভিযোগ উঠেছে জেলা শ্রমিক দল নেতার বিরুদ্ধে। আহত অবস্থায় ওই ব্যবসায়ীকে উদ্ধার করে প্রথমে শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
নির্যাতের শিকার ব্যবসায়ীর নাম সজীব মিয়া (৩০)। তিনি ফার্নিচার ও ইলেকট্রনিকস পণ্যের ব্যবসায়ী। এ ঘটনায় তার মা খালেদা আক্তার শুক্রবার (২৪ জুলাই) শ্রীপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযুক্তরা হলেন- উপজেলার মাওনা উত্তরপাড়া এলাকার মৃত আবুল হোসেন সরকারের ছেলে শরীফ সরকার (৪৩), মুন্না (৩০), আনোয়ার হোসেন (৩৫), কামরুল ইসলামের ছেলে সুজন মিয়া (৩৮) এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১২ জন। এর মধ্যে প্রধান অভিযুক্ত শরীফ সরকার মাওনা উত্তরপাড়া এলাকার মৃত আবুল হোসেন সরকারের ছেলে। তিনি জেলা শ্রমিক দলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য।
ভুক্তভোগী সজীব মিয়া উপজেলার টেপিরবাড়ী গ্রামের কফিল উদ্দিনের ছেলে। তিনি শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে পুলিশ পাহারায় চিকিৎসাধীন আছেন।
থানায় দেওয়া অভিযোগে মা খালেদা আক্তার উল্লেখ করেন, গত মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে শরীফ ও তার সহযোগীরা সজীব মিয়ার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যান। সেখানে সজীবের কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন শরীফ। চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় সজীবকে রড, বাঁশের লাঠি দিয়ে মারপিট করেন শরীফ ও তার সহযোগীরা। এরপর জোরপূর্বক প্রাইভেটকারে করে তাকে তুলে নিয়ে যান তারা।
অভিযোগে আরও বলা হয়, পরে তাকে শরীফ সরকারের বাড়ির নিচতলার একটি কক্ষে আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। একপর্যায়ে গ্যাসের চুলায় লোহার রড গরম করে দুই পা ও বাম হাতে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়। এ ছাড়া গরম রড ও লাঠি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয়। এতে তার শরীরের বিভিন্ন অংশ পুড়ে যায় এবং গুরুতর জখম হন। একপর্যায়ে ব্যবসায়ী সজীব অচেতন হয়ে পড়েন।
স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ রাত দেড়টার দিকে ঘটনাস্থল থেকে সজীবকে উদ্ধার করে শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। পরে শারীরিক অবস্থা গুরুতর হওয়ায় শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এ ঘটনায় শরীফ সরকার, তার গাড়িচালক মুন্না, আনোয়ার হোসেন ও সুজন মিয়াসহ চার জনের নাম উলেখ করে এবং আরও ১০ থেকে ১২ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে শ্রীপুর মডেল থানায় অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে জেলা শ্রমিক দল নেতা শরীফের নেতৃত্বে হামলার কথা উলেখ করা হয়।
সজীব মিয়ার বাবা কফিল উদ্দিন বলেন, ‘গত মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে শ্রমিক দল নেতা শরীফ তার লোকজন এমসি বাজারে অবস্থিত আমার ছেলের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। আমার ছেলে চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তারা ওখানেই লোহার রড লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করেন। একপর্যায়ে শ্রমিক দল নেতার প্রাইভেটকারে তুলে নিয়ে যান স্বপ্নপুরী হোটেল সংলগ্ন শ্রমিক দল নেতার বাড়ির নিচে টর্চারসেলে। সেখানে রাতভর তার ওপর চালায় নির্যাতন। রাত ১২টার দিকে খবর পেয়ে ছেলেকে খুঁজতে বের হলে লোকজনের মারফতে জানতে পারি শরীফ ও তার লোকজন ধরে নিয়ে গেছে। পরে নির্যাতনকারীর অফিসসহ কয়েকটি স্থানে খোঁজ না পেয়ে সর্বশেষ স্বপ্নপুরী হোটেলের পেছনে ছেলেকে তাদের হাতে নির্যাতন করা অবস্থায় দেখতে পাই। তাকে রক্ষা করতে আমার ভাইয়ের ছেলে আনিস এগিয়ে গেলে তাকেও মারধর করে আহত করা হয়।’
কফিল উদ্দিন আরও বলেন, ‘তারা আমার ছেলেকে না ছেড়ে দিয়ে রাতভর নির্যাতন চালায়। শেষে পুলিশকে খবর দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা বলে এবং তাকে হত্যা মামলার আসামির পরিচয় দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। কিন্তু আমার ছেলে কোনও রাজনীতি করে না। তবে সে এক আওয়ামী লীগ নেতার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেখভাল করে। পুলিশ পাহারায় ছেলেকে শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তার অবস্থা আশঙ্কা দেখে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।’
এ বিষয়ে অভিযুক্ত শরীফ সরকার বলেন, ‘ফেসবুকের মাধ্যমে আমি বিষয়টি জানতে পেরেছি। পরে খবর নিয়ে জেনেছি সজীব বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘটনায় করা হত্যা মামলার আসামি। স্থানীয় লোকজন তাকে আটক করে পুলিশে দিয়েছেন। তাকে আটক বা মারধরের বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।’
শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহীনুর আলম বলেন, ‘সজীব বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘটনায় করা একটি মামলার আসামি। স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশ থেকে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেছে। মারধরের ঘটনায় সজীবের মা বাদী হয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। সেখানে চাঁদা দাবির কথা উল্লেখ করেছেন। চাঁদা দাবি ও মারধরের বিষয়টি খতিয়ে দেখে আইনি ব্যবস্থা নেবে পুলিশ।’









