গত কয়েকদিন ধরে তীব্র গ্যাস সংকটে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ার তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে উৎপাদনের শেষ ধাপের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় বয়লার সচল রাখা যাচ্ছে না, ফলে ফিনিশিং, আয়রন, ডাইং ও প্যাকেজিং কার্যক্রমে অচল অবস্থা তৈরি হয়েছে। এতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পাঠানো নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা।
আশুলিয়ার জামগড়া, কাঠগড়া, জিরাবো, নরসিংহপুর, বেরুন, শিমুলতলা, পলাশবাড়ী, নিশ্চিন্তপুর, বাইপাইল ও জিরানী এলাকার বিভিন্ন কারখানা ঘুরে দেখা যায়, উৎপাদনের গ্যাসনির্ভর অংশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও শ্রমিকরা কাজ শুরুর অপেক্ষায় বসে আছেন, আবার কোথাও সীমিত পরিসরে বিকল্প ব্যবস্থায় উৎপাদন চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
কারখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে বয়লারে প্রয়োজনীয় তাপ তৈরি করা যাচ্ছে না। ফলে কাপড় ধোয়া, শুকানো, প্রেসিং ও ফিনিশিংয়ের মতো ধাপগুলো আটকে যাচ্ছে। উৎপাদনের শেষ পর্যায় বন্ধ থাকায় পুরো উৎপাদন চক্রের গতি কমে এসেছে।
প্রজন সোয়েটারের পরিচালক আহমেদ মোর্তুজা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, উৎপাদনের বেশির ভাগ কাজ শেষ হলেও বয়লার চালানো না গেলে ফিনিশিং ও আয়রন করা সম্ভব হয় না। এতে পণ্য প্যাকিং করে বন্দরে পাঠানো যাচ্ছে না এবং শিপমেন্ট নির্ধারিত সময়ের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করে আরেক কারখানা কর্মকর্তা রিপন সরকার বলেন, নির্ধারিত সময়ের পর পণ্য সরবরাহ করলে অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি ক্রেতাদের জরিমানা গুনতে হয়। এতে ভবিষ্যতের ক্রয়াদেশও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
কারখানাগুলোতে এর প্রভাব পড়ছে শ্রমিকদের কাজেও। নির্ধারিত সময়ে কাজে যোগ দিলেও গ্যাস না থাকায় অনেককে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা।
সোহরাব হোসেন নামে এক শ্রমিক বলেন, সকালে কারখানায় এলেও গ্যাসের অভাবে কাজ শুরু করা যায় না। রাজন নামে আরেক শ্রমিক বলেন, প্রায় প্রতিদিনই একই পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, কখন গ্যাস আসবে তা নিয়ে কোনও নিশ্চয়তা নেই।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আশুলিয়ার শত শত কারখানায় প্রতিদিন উৎপাদিত পোশাক ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়। তাই উৎপাদনের গতি কমে গেলে শুধু একটি কারখানা নয়, পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাই চাপের মুখে পড়ে। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ সীমিত, আর তা ব্যবহার করলেও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়।
তাদের অভিযোগ, শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের স্বল্পচাপের সমস্যা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সংকট আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় তীব্র হওয়ায় উৎপাদন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছে। শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
আব্দুল মান্নান কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক আমজাদ হোসেন বুলবুল বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার এই সময়ে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতারা বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকতে পারেন। একবার কোনো ক্রেতা হারালে তাকে আবার ফিরিয়ে আনা সহজ নয়।
গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা কমে যাওয়া বা কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন সীমিত করার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন শ্রমিকরা। যদিও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা করছে, তবু সংকট দীর্ঘ হলে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তিতাস গ্যাসের আশুলিয়া জোনাল বিপণন অফিসের ম্যানেজার প্রকৌশলী আবু ছালেহ মুহাম্মদ খাদেমুদ্দীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সংকটের কারণ চিহ্নিত করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।
শিল্পমালিক, শ্রমিক ও রপ্তানিকারকদের প্রত্যাশা, দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা হবে। তাদের মতে, প্রতিটি বিলম্বিত দিন উৎপাদন, শিপমেন্ট এবং দেশের রফতানি আয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।







