যানজটে আটকা পড়ে রাস্তায় সন্তান প্রসব করলেন নারী, ঝুঁকিতে নবজাতক

আরিফুল ইসলাম সাব্বির, সাভার
০৪ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৫৮আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৫৮

ঢাকার সাভারে ফুটপাত দখল করে অবৈধ দোকানপাট, উল্টোপথের যানবাহনসহ নানাভাবে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলায় সড়কে তীব্র যানজটে আটকা পড়ে যন্ত্রণায় ভুগে সড়কেই সন্তান প্রসব করেছেন এক নারী।

রবিবার (২ আগস্ট) সন্ধ্যায় সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

এমন পরিস্থিতিতে দিশেহারা হয়ে ওই নারীর স্বামী পার্শ্ববর্তী একটি প্রাইভেট হাসপাতালে ছুটে গিয়ে দায়িত্বরতদের কাছে নিজেদের এমন অসহায়ত্বের বিষয়টি তুলে ধরেন। হাসপাতালের লোকজন স্ট্রেচার নিয়ে ছুটে গিয়ে সড়ক থেকে ওই নারী ও নবজাতককে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। পরবর্তীতে হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসকরা ওই নারীর প্লাসেন্টা অপসারণ করেন।

এ ঘটনার পর ভুক্তভোগী ওই নারীর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল থাকলেও নবজাতকটি প্রিম্যাচিউর হওয়ায় তাকে এনআইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়েছে।

ভুক্তভোগী নারীর নাম রাজিয়া খাতুন (৩২)। তিনি স্বামীর সঙ্গে সাভারের পৌর এলাকার ভাটপাড়ায় বসবাস করেন।

ভুক্তভোগী নারীর স্বামী পোশাককর্মী মো. আমীর হামজা সোমবার (৩ আগস্ট) বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তার স্ত্রীর সন্তান প্রসবের নির্ধারিত সময় হতে এখনও দুই মাস বাকি থাকায় এমন পরিস্থিতির প্রস্তুতি তাদের ছিল না।

গতকাল দুপুরে কারখানায় কর্মরত অবস্থায় সর্বপ্রথম মুঠোফোনে তার স্ত্রী তাকে পেটে ব্যথার কথা জানান। পরবর্তীতে স্ত্রীর অসুস্থতার কথা জানার পর তিনি কারখানার লাইন চিফের নিকট ছুটি চাইলে লাইন চিফ তাকে ছুটি দিতে অসম্মতি জানান। এরপর কারখানার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি জানালে বিকাল ৫টা নাগাদ ছুটি নিয়ে বাসায় যান তিনি।

আমীর হামজা বলেন, “বাসায় ফেরার পর স্ত্রীর শারীরিক অবস্থা দেখে দ্রুত তাকে ডাক্তার দেখাতে ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য একটি রিকশায় উঠিয়ে সাভারের শিমুলতলা এলাকায় অবস্থিত একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাই। ততক্ষণে তার ব্যথা আরও তীব্র হয়। এ সময় এই পরিস্থিতি দেখে সেখানকার দায়িত্বরতরা তাকে দ্রুত একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে আবারও তাকে রিকশায় উঠিয়ে আমরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নবীনগরগামী সার্ভিস লেন ধরে উল্টোপথে কাছেই অবস্থিত সুপার মেডিকেল হসপিটাল লিমিটেডের উদ্দেশে রওনা হই। পথে আমাদের রিকশা সাভার বাসস্ট্যান্ডের সিটি সেন্টারের সামনে এলে সেখানে তীব্র যানজট থাকায় আমরা আর এগোতে পারছিলাম না। ওখান থেকে হাসপাতালের দূরত্ব মাত্র দুই মিনিটের পথ হলেও সেখানেই আমাদের ১০ থেকে ১৫ মিনিট আটকে থাকতে হয়। ততক্ষণে আমার স্ত্রীর অবস্থা আরও গুরুতর হয়ে পড়ে। এ সময় আশপাশের লোকজনের কাছে সহযোগিতা চেয়েও কারও সহযোগিতা পাইনি।”

“এমন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিই যে, তাকে কাঁধে করেই হাসপাতালে নিয়ে যাবো। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমি ও আমার সঙ্গে থাকা এক আত্মীয় মিলে তাকে ধরে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলেও প্রচণ্ড প্রসবব্যথা ও যন্ত্রণায় চিৎকার করতে করতে সেখানেই তিনি সন্তান প্রসব করেন এবং সন্তান প্রসবের পরপরই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন,” যোগ করেন হামজা।

তিনি বলেন, “এ ঘটনার পর কেউ একজন একটি চাদর দিলে সেটি দিয়েই তাকে ঢেকে রেখে আমি দৌড়ে সুপার মেডিকেলে গিয়ে সেখানকার দায়িত্বরতদের বিষয়টি জানালে মেডিকেলের লোকজন দ্রুত স্ট্রেচার নিয়ে গিয়ে হাতে হাতে আমার স্ত্রীকে সড়ক থেকে হাসপাতালে নিয়ে এসে ভর্তি করে।”

“এমন একটি দেশে বসবাস করি, যেখানে এমন জরুরি পরিস্থিতিতেও একজন মুমূর্ষু রোগী নিয়ে সড়কে বিশৃঙ্খলার কারণে সময়মতো হাসপাতালে যাওয়া যায় না। এর চেয়ে দুঃখজনক কিছু হতে পারে না। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয়, শত শত মানুষ সেখানে আমাদের এমন অসহায়ত্ব দেখেও কেউ এগিয়ে আসছিল না আমাদের হাসপাতালে পৌঁছাতে সহযোগিতা করতে,” বলেন হামজা।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাজিয়া খাতুন বলেন, “গতকালের অভিজ্ঞতা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। দিনে বাসায় একাই ছিলাম। ব্যথা নিয়ে সারাদিন কাটিয়েছি। পরে আমার স্বামী কারখানা থেকে ফেরার পর আমাকে নিয়ে রিকশায় প্রথমে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যায়, কিন্তু ততক্ষণে আমার অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। পরে এই হাসপাতালে আসার পথে জ্যামে আটকা পড়ি। একপর্যায়ে প্রচণ্ড যন্ত্রণায় চিৎকার করতে করতে রাস্তাতেই আমার জ্ঞান হারিয়ে যায়। এর পরে আর কিছু মনে নেই।”

এ বিষয়ে জানতে হাসপাতালটি ভিজিট করলেও গতকাল এই ঘটনার সময় হাসপাতালটিতে দায়িত্বরত চিকিৎসক ফারহানা শেখকে না পেয়ে তার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও কল রিসিভ না করায় তার বক্তব্য জানা যায়নি।

তবে হাসপাতালটির ব্যবস্থাপক মো. আসিফ হামজা বলেন, “গতকাল খবরটি জানার পর আমি সঙ্গে সঙ্গে আমাদের লোকজনকে স্ট্রেচারসহ পাঠিয়ে নবজাতকসহ ওই নারীকে উদ্ধার করে আমাদের হাসপাতালে এনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করি। সে সময়ও ওই নারীর প্লাসেন্টা যুক্ত ছিল। পরে আমাদের দায়িত্বরত চিকিৎসক প্লাসেন্টা রিমুভ করেন। এখন মা ও সন্তান উভয়ের শারীরিক অবস্থা যদিও স্থিতিশীল রয়েছে, তবে শিশুটি প্রিম্যাচিউর হওয়ায় তাকে এনআইসিইউতে রাখা হয়েছে।”

হাসপাতালটির আরেক ব্যবস্থাপক মো. হুমায়ুন কবির বলেন, “ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে রোড ডিভাইডার দিয়ে ডেডিকেটেড হাইওয়ে পৃথক করে দেওয়ার পর থেকেই মানুষের ভোগান্তি আরও তীব্র হয়েছে। কাছাকাছি কোথাও ইউটার্নের ব্যবস্থা না থাকায় অনেক পথ ঘুরে মানুষকে তার গন্তব্যে যেতে হয়। অন্যদিকে সার্ভিস লেনগুলো ফুটপাতের অবৈধ দোকানপাট, অবৈধ পার্কিংয়ের দখলে থাকায় এবং উল্টোপথের যানবাহন, বিশেষ করে অটোরিকশার কারণে সড়কে এত বিশৃঙ্খলা হয় যে, দুই মিনিটের পথ অতিক্রম করতে ঘণ্টাও অপেক্ষা করতে হয়। যদিও বিষয়টি সমাধানে কোনো উদ্যোগই চোখে পড়ছে না। গতকালের ঘটনাটি হয়তো রেয়ার কেস, তবে এতে মানুষের ভোগান্তি কোন পর্যায়ে রয়েছে, সেটি আরও স্পষ্ট হয়েছে।”

উল্লেখ্য, রোড ডিভাইডারের মাধ্যমে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাভারের ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ডেডিকেটেড লেন পৃথক করা হলেও অপ্রতুল ইউটার্নের কারণে কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে সাভার। মহাসড়কে চলাচলে ভোগান্তি কমলেও এটি এখন স্থানীয়দের জন্য রীতিমতো গলার কাঁটায় রূপান্তর হয়েছে।

অপরদিকে, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে ভেঙে পড়া ট্রাফিক ব্যবস্থা এখনো পুনরুদ্ধার করতে না পারায় এই অঞ্চলে সড়কে বিশৃঙ্খলা এখন চরম আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে ফুটপাতে অবৈধ দোকানপাট ও অবৈধ গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে যেমন বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে, একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রণহীন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার আধিক্য, উল্টোপথে চলাচলের কারণে সার্ভিস লেনগুলোও রীতিমতো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে তীব্র ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে স্থানীয়দের। বিশেষ করে রোগী পরিবহনে যুক্ত হয়েছে বাড়তি ভোগান্তি।

সড়কে এমন বিশৃঙ্খলার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা জেলা পুলিশের পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেন, “সড়কে বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে আমাদের ট্রাফিক ডিপার্টমেন্ট নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এ ছাড়া এসবের পেছনে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয় রয়েছে। মানুষের সচেতনতারও প্রয়োজন রয়েছে। তবে আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। বিশেষ করে অবৈধ পার্কিং করতে দেখলেই তো আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করি। তবে গতকালের নারীর সন্তান প্রসবের এই ঘটনাটি আমার জানা নেই। তবে যেহেতু বিষয়টি নজরে আনলেন, আমি আমাদের ট্রাফিক ডিপার্টমেন্টকে নির্দেশনা দিয়ে দিচ্ছি, যেন তারা আরও সতর্ক হন এবং এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।”

/এএম/এম/
সম্পর্কিত
চিকিৎসক হত্যা: জুতার ছাপের সূত্র ধরে গ্রেফতার সোহেল রিমান্ডে
সাত বছরের সন্তানের সামনে অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূকে পিটিয়ে হত্যা, স্বামী গ্রেফতার 
আ.লীগের মশাল মিছিলে ধাওয়া দিয়ে ৯ জনকে ধরলো পুলিশ
সর্বশেষ খবর
সমাজে মৌলবাদী-ফ্যানাটিক প্রবণতা বাড়ছে: সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী
সমাজে মৌলবাদী-ফ্যানাটিক প্রবণতা বাড়ছে: সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী
ঘুরতে বেরিয়ে স্কুলছাত্রীকে রাস্তায় ফেলে পালালো প্রেমিক, পরে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার
ঘুরতে বেরিয়ে স্কুলছাত্রীকে রাস্তায় ফেলে পালালো প্রেমিক, পরে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার
পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের অভিযোগ, ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি অ্যাসোসিয়েশনের
পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের অভিযোগ, ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি অ্যাসোসিয়েশনের
মধ্যরাতে এলাকা পরিদর্শনে ইশরাক
মধ্যরাতে এলাকা পরিদর্শনে ইশরাক
সর্বাধিক পঠিত
জুলাই কুস্তিগিরদের আগাম অভিনন্দন, মাইর একটাও মাটিতে পড়বে না: মাহফুজ আলম
জুলাই কুস্তিগিরদের আগাম অভিনন্দন, মাইর একটাও মাটিতে পড়বে না: মাহফুজ আলম
৫ আগস্টের ছুটি কারা পাবেন, কারা পাবেন না
৫ আগস্টের ছুটি কারা পাবেন, কারা পাবেন না
নাম পাল্টালো বিশ্বের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ
নাম পাল্টালো বিশ্বের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ
ভূমি অফিসের সব কর্মকর্তাকে একসঙ্গে বরখাস্ত, কারণ জানালেন জেলা প্রশাসক
ভূমি অফিসের সব কর্মকর্তাকে একসঙ্গে বরখাস্ত, কারণ জানালেন জেলা প্রশাসক
কেন বাড়িঘর ফেলে চলে যাচ্ছেন টেকনাফের মানুষ, জনপ্রতিনিধিরাও আতঙ্কে
কেন বাড়িঘর ফেলে চলে যাচ্ছেন টেকনাফের মানুষ, জনপ্রতিনিধিরাও আতঙ্কে