ফরিদপুরে সীমান্তবর্তী ময়েনদিয়া বাজারের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বোয়ালমারীতে দুই পক্ষের মধ্যে হামলা ও দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে কমপক্ষে ৩০ জন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাজারে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এছাড়া সংঘর্ষের ঘটনায় দুই জনকে আটক করা হয়।
শনিবার ময়েনদিয়া বাজারে হামলার পর রবিবার পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের ধুলজোড়া ব্রিজ এলাকায় বিকাল থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত দফায় দফায় সংঘর্ষ চলে। পরে বাজারে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
সোমবার (৩১ আগস্ট) বোয়ালমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান এসব তথ্য জানান।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বোয়ালমারী উপজেলার পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের ময়েনদিয়া বাজারটি বোয়ালমারী ও সালথা উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত। বাজারের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের বরখাস্ত চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপিতে যোগ দেওয়া আব্দুল মান্নান মাতুব্বর এবং পার্শ্ববর্তী সালথা উপজেলার খাড়দিয়া গ্রামের বিএনপি নেতা মুশফিক বিল্লাহ জিহাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুইপক্ষের বিরোধ আরও তীব্র হয়। ওই সময় আব্দুল মান্নান মাতুব্বর ও তার ভাই সিদ্দিক মাতুব্বরের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ ওঠে মুশফিক বিল্লাহ জিহাদের সমর্থকদের বিরুদ্ধে। এরপর মান্নান মাতুব্বরসহ তার পক্ষের লোকজন এলাকা ছেড়ে গেলে ময়েনদিয়া বাজারের নিয়ন্ত্রণ জিহাদপন্থি লোকজন নেয়।
পরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আব্দুল মান্নান মাতুব্বর ও তার পক্ষের লোকজন এলাকায় ফিরে এলে বাজারের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য নিয়ে দুইপক্ষের মধ্যে ফের উত্তেজনা দেখা দেয়।
এরই ধারাবাহিকতায় গত শুক্রবার ময়েনদিয়া দাইপাড়া এলাকায় একটি দোকানে হামলার অভিযোগ ওঠে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, জিহাদের কয়েকজন সমর্থক ওই হামলা চালান। শনিবার ময়েনদিয়া বাজারে গেলে জিহাদপন্থি যুবদল নেতা সোলায়মান মাতুব্বরের সঙ্গে স্থানীয়দের বাগ্বিতণ্ডা হয়। এ সময় এক ইলেকট্রনিকস ব্যবসায়ীর কাছে ৪ হাজার টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে। পরে ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা জড়ো হলে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এতে সোলায়মান আহত হন।
খবর পেয়ে জিহাদ বাজারে গিয়ে সোলায়মানকে উদ্ধার করে একটি ফার্মেসিতে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। জিহাদের অভিযোগ, সেখানে রামদা, চাইনিজ কুড়াল ও লোহার পাইপসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে একদল লোক ঢুকে তার ওপর হামলা চালায়। এতে তিনিও গুরুতর আহত হন। এ হামলার জন্য তিনি আব্দুল মান্নান মাতুব্বর ও তারা মিয়া নামে এক ব্যক্তিসহ কয়েকজনকে দায়ী করেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জিহাদপন্থি যুবদল নেতা মাহবুব হাসান সজিব বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আব্দুল মান্নান মাতুব্বর বাজারে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। বাজারকে তার প্রভাবমুক্ত করতে মুশফিক বিল্লাহ জিহাদকে উপদেষ্টা করা হয়। শনিবার মান্নান মাতুব্বরের লোকজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালালে জিহাদ ও সোলায়মান আহত হন।
অন্যদিকে ময়েনদিয়া বাজারের ব্যবসায়ী মজিবর রহমান মোল্যার অভিযোগ, জিহাদ লোকজন নিয়ে এলাকায় এসে হামলা চালান। সাধারণ দোকানি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা না দিলে মারধর ও হুমকি দেওয়া হয়।
ব্যবসায়ী মাওলানা মাসুদুর রহমানও কয়েকজনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজির অভিযোগ করেন। শনিবারও এক ব্যবসায়ীর কাছে চার হাজার টাকা দাবি করা হয়েছিল বলে তিনি জানান।
অভিযোগের বিষয়ে আব্দুল মান্নান মাতুব্বরের ও তারা মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
শনিবারের হামলার জেরে রবিবার বিকাল ৪টার দিকে পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের ধুলজোড়া ব্রিজ এলাকায় দুইপক্ষের লোকজন সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। বিকাল থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত প্রায় সাড়ে সাত ঘণ্টা ধরে দফায় দফায় সংঘর্ষ চলে। একপর্যায়ে সংঘর্ষটি আশপাশের এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
পুলিশ ও স্থানীয়দের সূত্রে জানা গেছে, সালথার খাড়দিয়া গ্রামের হুমায়ন খাঁ, রফিক মোল্যা ও ইলিয়াস কাজীর নেতৃত্বে বোয়ালমারীর ময়েনদিয়ার আব্দুল মান্নান মাতুব্বরের পক্ষের লোকজনের সংঘর্ষ হয়। এতে উভয়পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হন।
আহতদের বোয়ালমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। গুরুতর আহত পরমেশ্বরদী গ্রামের বাচ্চু মোল্যার ছেলে কবির মোল্যা, হাশেম মোল্যার ছেলে কামরুল মোল্যা ও মনসুর মোল্যার ছেলে লোকমান মোল্যাকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
বোয়ালমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. ইজাজ আহমেদ শাওন রবিবার রাতে বলেন, সন্ধ্যার পর বেশ কয়েকজন আহত অবস্থায় হাসপাতালে আসেন। তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। গুরুতর তিন জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
এদিকে সংঘর্ষের পর ময়েনদিয়া বাজার ও আশপাশের এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, যেকোনও সময় দুইপক্ষের মধ্যে আবারও সংঘর্ষ বাধতে পারে। ব্যবসায়ীরাও রয়েছেন আতঙ্কে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শনিবার থেকেই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
সোমবার সকালে বোয়ালমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জিহাদের ওপর হামলার ঘটনায় অভিযোগ পাওয়ার পরে দুই জনকে গতকাল আটক করা হয়েছে। পরে দুইপক্ষের সংঘর্ষের ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। পরিবেশ শান্ত রাখতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।









