
কুষ্টিয়ায় নারী শ্রমিকরা মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি কাজ করেও তারা কম মজুরি পাচ্ছেন। নিয়ম অনুযায়ী ৮ ঘণ্টার স্থলে ১২ কিংবা ১৪ ঘণ্টা কাজ করেও বোনাস কিংবা পারটাইম কিছুই পাচ্ছেন না তারা। তারওপর বেঁচে থাকার তাগিদে কাজ করে চলেছেন জেলার প্রায় ২০ হাজার নারী শ্রমিক। শ্রম আইন থাকার পরও নারী শ্রমিকরা নানাভাবে নির্যাতিত কিংবা বঞ্চিত হলেও প্রতিরোধে এগিয়ে আসছেন না কেউ।
জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন বয়সের নারী শ্রমিকরা ধান খেত, সবজি খেত, গম খেত, মাটি কাটা, তামাকের গোডাউন, হোটেল, ইটভাটা ও চাতালে কাজ করছেন। পুরুষের তুলনায় নারীরা কাজে মনোযোগী এবং কম মজুরিতে কাজ করানো যায় এজন্য মালিকরা নারী শ্রমিক নিতে আগ্রহী। একই কাজ করে পুরুষ শ্রমিকরা ২০০ থেকে ২৫০ টাকা মজুরি পাচ্ছেন। সেখানে নারী শ্রমিকরা বেশি কাজ করেও ৮০ থেকে ১০০ টাকা মজুরি পাচ্ছেন।
আরও পড়ুন: মজুরি বৈষম্য: পুরুষের সঙ্গে লড়তে হচ্ছে নারী শ্রমিকদের
অধিকাংশ নারী শ্রমিকের কাজের জন্য সুষ্ঠ পরিবেশও নেই। নেই টয়লেটের এবং ছোট ছোট সন্তানদের রাখারও কোনও সু-ব্যবস্থা। ফলে ঘুমিয়ে পড়লেও সন্তানকে কোলে নিয়েই কাজ করেন তারা।

কুষ্টিয়ায় বিশেষত চাতালের কাজে নারী শ্রমিকরাই একমাত্র ভরসা। কাজে ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা কম থাকায় চাতাল ব্যবসায়ীরা এসব কাজে নারী শ্রমিকদেরই বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। অথচ পুরুষের তুলনায় তারা অনেক ক্ষেত্রে বেশি কাজ করলেও মজুরি দেওয়া হয় অর্ধেক। যেখানে একজন পুরুষ শ্রমিক সারাদিন কাজ করে পায় ২০০-৩০০ টাকা সেখানে একজন নারী শ্রমিকের ভাগ্যে জোটে ১০০-১৫০ টাকা।
খাজা নগরের চাতাল শ্রমিক মাসুদা খাতুন জানায়, তিনি ৮ মাস ধরে এই মিলে কাজ করছে। ধান সিদ্ধ করা থেকে শুরু করে শুকিয়ে ঘরে তোলা পর্যন্ত তার কাজ। এই কাজ করে মাসুদা তার বৃদ্ধা মা ও তিন বছরের সন্তান মাসুদ রানাকে নিয়ে কোনও রকমে বেঁচে আছে।

তিনি বলেন, ‘এখান থেকে যা পাই তা দিয়ে সংসার চলে খুবই কষ্টে। আবার মিল মালিকের মন জুগিয়েও চলতে হয়।’
আকলিমা ও রাহেলা খাতুন জানান, একই চাতালে আরও চারজন নারী শ্রমিক কাজ করছে। ২-৩ দিন কড়া রোদে ১০০ মণ ধান শুকানো ও ভাঙানোর পর ৪০০ টাকা ও ১৫ কেজি চালের খুদ পাওয়া যায়। এভাবে মাসে তারা জনপ্রতি ১ হাজার টাকা এবং এক মণ খুদ পান। যা দিয়েই কোনও মতে সংসার চালাচ্ছেন।
আরও পড়ুন: ট্রেড ইউনিয়ন নিয়ে চলে মালিক- শ্রমিক লুকোচুরি
জবেদা খাতুন ও জরিনা খাতুন জানান, মালিকরা পুরুষ শ্রমিকদের অনেক বেতন দেন। কিন্তু তাদের বেলায় উল্টো। তারা খুদের পরিবর্তে টাকা চায়। তবে অন্যান্য সময় যা পায় তা দিয়ে তাদের কোনও রকম চললেও বর্ষা মৌসুমে বিপাকে পড়তে হয়। কাজ না থাকায় অর্ধাহারে অনাহারে থাকতে হয় তাদের।
কুষ্টিয়ার চাতালে পুরুষ শ্রমিকরা মাসে ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা পান আর নারীরা ৮০০ থেকে ১৫০০ টাকা।
এ ব্যাপারে কুষ্টিয়া মেজর অটো রাইস অ্যান্ড হাস্কিং মিলের সভাপতি আব্দুস সামাদ বলেন, এখানে সরকারি কোন নিয়ম-কানুন নেই। তবুও তারা নারী শ্রমিকদের সাধ্য মতো দেওয়ার চেষ্টা করেন।

চাতাল ছাড়াও কুষ্টিয়ার বিভিন্ন কারখানা যেমন বিস্কুট ফ্যাক্টরি, বেকারিসহ নানা কারখানায় নারী শ্রমিকদের নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সময় কাজে লাগানো হচ্ছে। এক্ষেত্রে তাদের অতিরিক্ত মজুরি কিংবা ভাতা প্রদান করা হচ্ছে না।
আরও পড়ুন: গৃহকর্মীদের সুরক্ষা কতদূর?
স্থানীয় লতা এনজিও সংস্থার সভাপতি ডাক্তার আব্দুস সালাম জানান, বেসরকারি সংগঠনগুলো সবক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। নারীরা পুরুষের সমভাবে কাজ করলেও শ্রমমূল্যের ক্ষেত্রে এখনও বৈষম্য রয়েছে।
/এসটি/








