ছাত্রলীগের দুই পক্ষে সংঘাতের ঘটনায় খুলনা মেডিক্যাল কলেজে (খুমেক) ছাত্র রাজনীতি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কলেজের একাডেমিক কাউন্সিল আজ রবিবার (২৮ আগস্ট) এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একাডেমিক কাউন্সিলের সভাপতি ও খুমেক অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. আবদুল্লাহ আল মাহবুব বাংলা ট্রিবিউনকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। একইসঙ্গে খুমেকের চার ছাত্রকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।
পাশাপাশি তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। এদিকে ৬ জন ছাত্র পৃথকভাবে ৬টি মামলা দায়ের করেছেন। এ সব মামলায় ২৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ ৪ জনকে গ্রেফতার করে জেল হাজতে পাঠিয়েছে।
কলেজের অধ্যক্ষ ও একাডেমিক কাউন্সিলের সভাপতি প্রফেসর ডা. আবদুল্লাহ আল মাহবুব বাংলা ট্রিবিউনকে আরও জানান, ‘ওপরের নির্দেশে কলেজের ছাত্র রাজনীতি ফের নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ কলেজে শুরু থেকেই ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে সরকারি দলের শিথিল অবস্থানের কারণে নিষেধাজ্ঞার কঠোর বাস্তবায়ন ছিল না। ফলে এখানে ধীরে ধীরে ছাত্র রাজনীতি সক্রিয় হয়ে ওঠে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই কলেজে কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধের জের ধরে শুক্রবার প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব নমিতা হালদারের সামনেই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ছাত্রদের রক্ত ছিটে তার গায়েও লাগে। পুলিশ প্রহরায় তাকে নিরাপদে নেওয়া হয়। এর ফলে প্রধানমন্ত্রীর দফতর, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দফতরসহ সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো থেকে বিষয়টি কঠোরভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে। ওপরের নির্দেশনার আলোকেই একাডেমিক কাউন্সিলের বৈঠকে এ সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘গঠিত তদন্ত কমিটি ৭ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবেন। এরপর উপযুক্ত প্রমাণ সাপেক্ষে সাময়িকভাবে বহিস্কৃত চার জনের ব্যাপারে স্থায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে। এখানে সুস্থ রাজনীতি থাকলে আবারও তা নিষিদ্ধ করার প্রয়োজন হতো না।’ তিনি জানান, সংঘর্ষের ঘটনায় কলেজ প্রশাসন থেকে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হবে।
সাময়িকভাবে বহিষ্কৃত চার ছাত্র হচ্ছেন- কে-২০ ব্যাচের সাইফুল্লাহ মানসুর, কে-২২ ব্যাচের অনিন্দ্য সুন্দর ও সাকিউল ইসলাম এবং কে-২৩ ব্যাচের মো. রাসেল। এরা সবাই ছাত্রলীগ নেতা-কর্মী বলে জানিয়েছেন খুলনা মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান রাসেল।
তিনি আরও জানান, ক্যান্টিনে লাইট জ্বালানো ও বন্ধ করাকে কেন্দ্র করে শনিবারের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এরপর মহানগর ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। একই সঙ্গে ঘটনাটি তদন্তের জন্য তাদের পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠিত হয়েছে। এই কমিটি আগামী তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে। এরপর মহানগর ছাত্রলীগ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির প্রধান করা হয়েছে মহানগর ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি রেজাউল করিম সবুজকে। অন্য সদস্যরা হলেন মহানগর ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান ইমরান, মাসুদ হোসেন সোহান ও টিপু সুলতান এবং সাংগঠনিক সম্পাদক হিরণ হাওলাদার।
রবিবার দুপুরে খুলনা মহানগর ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে খুলনা প্রেসক্লাবের সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, তুচ্ছ ঘটনায় একটি মহল ছাত্রলীগের নামে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি শেখ শাহজালাল হোসেন সুজন ও সাধারণ সম্পাদক এস এম আসাদুজ্জামান রাসেল ঘোষণা করেন, কমার্স কলেজে ছাত্রলীগের অর্থ বাণিজ্যের বিষয়টি প্রমাণ করতে পারলে তারা ছাত্রলীগের রাজনীতি থেকে পদত্যোগ করবেন। তারা বলেন, খুলনা মেডিক্যাল কলেজে স্বাচিপ ছাত্রলীগের একটি কমিটি গঠন করার পর থেকেই বিরোধ সৃষ্টি হয়। মহানগরীর মধ্যে কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কমিটি দেওয়ার এখতিয়ার মহানগর ছাত্রলীগের। কেন্দ্রের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়েছে। সেই সিদ্ধান্তের আলোকে এ কলেজে আপাতত ছাত্রলীগের কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। আগামীতে সুবিধাজনক সময়ে মহানগর ছাত্রলীগের উদ্যোগে খুলনা মেডিক্যাল কলেজে ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হবে।
খুলনা ২ আসনের সংসদ সদস্য ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজান বলেন, কলেজের একাডেমিক কাউন্সিল যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরাও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।
এদিকে এ সংঘর্ষের ঘটনায় শনিবার দিনগত রাতে মহানগরীর সোনাডাঙ্গা মডেল থানায় পৃথকভাবে ৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ সব মামলায় ২৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে। ছাত্র বিভাস চন্দ্র দাশ বাদী হয়ে ২৪ জনের নাম এবং আরও দেড়শ জনকে আসামি করে হত্যাচেষ্টা, চুরি, ক্ষতিসাধানসহ ১০টি ধারায় মামলা করেছেন। এসআই ইব্রাহিম সোহেল এ মামলাটির তদন্তভার পেয়েছেন। এ মামলায় চার জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এরা হচ্ছেন- মামলার প্রধান আসামি আব্দুল জালাল, দ্বিতীয় আসামি আজাহার, তৃতীয় আসামি গোপাল কুমার সাহা এবং পঞ্চম আসামি রিপন সাহা।
কলেজের অপর ছাত্র মো. সাদমান হাসান সিদ্দিকি বাদী হয়ে ২৬ জনের নাম এবং আরও অজ্ঞাত ২০ জনের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টাসহ ৬টি ধারায় মামলা দায়ের করেছেন। এসআই ইব্রাহিম সোহেল এ মামলাটিরও তদন্ত করবেন। ছাত্র এম এম ওবায়েদুর রহমান বাদী হয়ে ৫ জনের নাম ও আরও অজ্ঞাত ৫ জনের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টাসহ ৬টি ধারায় মামলা করেছেন। এসআই উত্তম কুমার মিত্র এ মামলাটির তদন্ত করবেন। ছাত্র এ কে এম মঞ্জুরুল আহসান বাদী হয়ে ৬ জনের নামে হত্যাচেষ্টাসহ ৬টি ধারায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। এস আই দেবাশিষ রায় এ মামলার তদন্ত করছেন। ছাত্র সালাউদ্দিন ইউসুফ বাদী হয়ে ৫ জনের নাম ও অজ্ঞাত আরও ৬ জনের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টাসহ ৬টি ধারায় মামলা দায়ের করেছেন। এস আই মুন্সী রাসেল এ মামলার তদন্ত করবেন। ছাত্র সাইদুর রহমান বাদী হয়ে হত্যাচেষ্টাসহ ৬টি ধারায় ৭ জনের নাম ও অজ্ঞাত আরও ৫ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছেন। এ মামলার তদন্ত করবেন এস আই বনি আমিন।
সোনাডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুকুমার বিশ্বাস বলেন, মামলার বাদীরা সবাই কলেজের আচার্য্য প্রফুল্ল চন্দ্র ছাত্রাবাসের। রাতেই অভিযান চালিয়ে প্রথম মামলার চার জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
উল্লেখ্য, খুলনা মেডিকেল কলেজে (খুমেক) শনিবার ছাত্রলীগের দুগ্রুপের মধ্যে তিন দফা সংঘর্ষ হয়। এতে ছাত্রলীগের দু পক্ষের ৩৩ জন আহত হয়েছে।
আরও পড়ুন-
৫ এপ্রিল বাড়ি ছাড়ে তামিমের সহযোগী জঙ্গি রাব্বী
কল্যাণপুর থেকে পাইকপাড়া: জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নতুন মাত্রা
/এফএস/








