দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে চামড়া পাচারকারী চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। কোরবানির ঈদের পরই দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী ৮৯টি এলাকা দিয়ে ভারতে চামড়া পাচারে বিশেষ তৎপরতা চলছে। আর এ কাজে নিয়োজিত থাকে ৫৪ জন পাচারকারী। প্রশাসনের নজর এড়িয়ে এবং কখনও ‘ম্যানেজ’ করে চলে চামড়া পাচার। দেশীয় ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট, চামড়ার বিকিকিনি নিয়ে প্রতিযোগিতা, আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে দেশের বাজারে চামড়ার কম মূল্যমান, মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অপতৎপরতাসহ বিকল্প পথে ভারতীয়দের চামড়া সংগ্রহের ঔৎসুক্যের কারণে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল থেকে ব্যাপকভাবে চামড়া পাচার হয়ে থাকে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের করা এক বিশেষ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে গত কোরবানির ঈদ পর্যবেক্ষণ ও প্রাপ্ত তথ্যেও ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। প্রতিবেদনে ভারতে চামড়া পাচারের সঙ্গে জড়িতদের ওপর নজরদারি করার নির্দেশনা রয়েছে।
খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি একরামুল হাবিব বলেন, ঈদের আগের দিন থেকেই সীমান্তবর্তী জেলা বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, যশোর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও ঝিনাইদহের চামড়া পাচারের রূটগুলোতে পুলিশের তৎপরতা বাড়িয়ে চেকপোষ্ট বসানো হবে। প্রয়োজনে বিজিবিসহ অন্যান্য আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নিয়ে কঠোর নজরদারি করা হবে। এছাড়াও গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে চামড়া পাচার প্রতিরোধ করা হবে। বেনাপোল ও ভোমড়া বর্ডার এলাকায় বিশেষ নজরদারি থাকবে।
খুলনা কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আমান উল্লাহ জানান, সারাবছর সংকটের মধ্যে থেকে চামড়ার বেচাকেনা করে থাকি। কিন্তু কোরবানির সময় মৌসুমী ব্যবসায়ীদের কারণে বেশি সমস্যায় পড়তে হয়। এরা সরকার নির্ধারিত দরেরও বেশি দিয়ে চামড়া সংগ্রহ করে। যার ৮০ ভাগই সীমান্ত পথ দিয়ে পাচার হয়ে থাকে। স্থানীয় চামড়া ব্যবসায়ীরা সতর্ক থেকেও কোনও পদক্ষেপ নিতে পারে না। কারণ তারা কোনও পক্ষ থেকেই অর্থ সহায়তা পায় না।
খুলনার শেখপাড়া এলাকার ইয়াসিন লেদারের মালিক আবু জাফর বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, মৌসুমী ব্যবসায়ী ও পাচারকারীদের সক্রিয় ভূমিকার কারণে খুলনার কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীরা পথে বসতে চলেছে। তারা দেনায় জর্জরিত। সুদে টাকা এনে ব্যবসা করতে হচ্ছে তাদের। তিনি বলেন, ‘কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের ব্যাংক ঋণ দেওয়া হয় চলতি হিসাবের বিপরীতে। এরপরও ব্যাংকে সম্পত্তির দলিল জমা দিতে হয়। মামুন লেদার কমপ্লেক্সের মালিক শহিদুল ইসলাম জানান, কোরবানির ঈদের পর ঘর ছেড়ে দিতে হবে। ব্যবসা হারিয়ে তিনিসহ অনেকে পথে বসবেন। তিনি আরও জানান, চামড়া সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় লবণের দামও বেশি। চামড়া বিক্রির টাকা ট্যানারি মালিকদের কাছে বকেয়া পড়ে থাকে। ফলে ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত সামান্য ঋণের অর্থ পরিশোধের বদলে সুদসহ তা বাড়তে থাকে।’
চিহ্নিত পাচারকারীর মধ্যে রয়েছে সাতক্ষীরার ২২ জন, যশোরের ১৫ জন, কুষ্টিয়ার ১০ জন এবং ঝিনাইদহের ৭ জন। প্রতিবেদনে তালিকাভুক্ত চামড়া পাচারকারী হলো— সাতক্ষীরা সদর উপজেলার চৌরঙ্গি মোড় এলাকার মৃত মোহাম্মদ আলীর ছেলে মো. মোহিনী বিশ্বাস, কলারোয়া উপজেলার মুরারী কাঠি গ্রামের মোহর আলীর ছেলে ইব্রাহীম ও ছবেদ আলীর ছেলে ইমাদুল, জালালাবাদ গ্রামের বাবু রাম দাসের ছেলে সাধু দাস, চিনে দাস ও মতি দাস, কলারোয়া সদর বাজারের মতিয়ার, কাকডাঙ্গা তিন রাস্তার মোড় এলাকার মো. ইয়ার আলী এবং সোনাবাড়িয়া গ্রামের মোতালেব সরদারের ছেলে মো. আবু হাসান, পাটকেলঘাটা উপজেলার তৈলকুপি গ্রামের সমরজিত পালের ছেলে মহাদেব পাল, নিমাই চন্দ্র দাসের ছেলে মহিতোষ দাস ও আবুল কাশেম সরদারের ছেলে আবুল কালাম, কাদিকাঠি গ্রামের সচিন কুমার পালের ছেলে রবিন কুমার পাল ও পলাশপোল গ্রামের মো. ওহেদ আলীর ছেলে মো. হাশেম আলী এবং দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া গ্রামের মো. মোকছেদ আলীর ছেলে আব্দুল মালেক, যশোরের বেনাপোল বন্দর থানার পুটখালী উত্তরপাড়ার শহিদুল ইসলামের ছেলে মো. রেজাউল ইসলাম রেজা, পুটখালী গ্রামের মৃত শাহাদাত আলীর ছেলে কালো রেজাউল, মো. চুনি কামাল, ধান্যখোলা গ্রামের মৃত আনোয়ার হোসেনের ছেলে আশা, গাতিপাড়া গ্রামের আব্দুল জলিলের ছেলে আলিমুর, দৌলতপুর বটতলা গ্রামের মতিউর রহমানের ছেলে মো. জিয়া, তষের বেড় গ্রামের শফি মোড়লের ছেলে মোহাম্মদ আলী, সাদিপুর গ্রামের আব্দুল মান্নানের ছেলে কোরবান ও বড়আঁচড়া গ্রামের ইলাহী বক্সের ছেলে ইয়াকুব, শার্শা উপজেলার কাজীর বেড় গ্রামের শহর আলীর ছেলে শাখাওয়াত হোসেন, উত্তর বারোপোতা গ্রামের মৃত বাবু জানের ছেলে আলাউদ্দিন আলা, শিকারপুর গ্রামের নূর বক্সের ছেলে অনু, বাগআঁচড়া গ্রামের মৃত খোরশেদ আলীর ছেলে মশিয়ার রহমান, পাঁচভুলোট গ্রামের লবিস উদ্দিনের ছেলে মো. তোফাজ্জেল ও গোগা গ্রামের রবিউল সরদারের ছেলে নুহ। কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার পাকুড়িয়া গ্রামের সায়েম উদ্দিনের ছেলে মো. লাবু, একই গ্রামের মৃত লিয়াকত আলীর ছেলে মো. হাবু, খলিশাকুণ্ডি পাইকপাড়া গ্রামের আহম্মদ আলীর ছেলে মো. জামিল হোসেন, আল্লার দর্গা গ্রামের মো. লাভলু, আল্লার দর্গা লস্করপাড়া গ্রামের ইসরাইল লস্করের ছেলে মো. রুবেল, ফিলিপনগর মাঠপাড়া গ্রামের হাফিজুল সরদারের ছেলে মো. রাকিবুল ইসলাম রাখী, বাহিরমাদী সদরঘাট গ্রামের আমজাদ ফকিরের ছেলে মো. শাজুল হোসেন, গোলাবাড়িয়া গ্রামের হবির ছেলে মো. মামুন, মহিষকুণ্ডি গ্রামের মো. আমানুল্লাহ এবং জামালপুর গ্রামের আব্দুস সুবহানের ছেলে মো. আলতাফ হোসেন (ডেয়ারিং)। ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার ব্যাপারীপাড়া গ্রামের হরি মিয়ার ছেলে মাহাবুবুর রহমান, একই গ্রামের আব্দুল মান্নানের ছেলে বাবু, মৃত কাজী ইউসুফের ছেলে মো. আমির হোসেন, পাগলা কানাই সড়ক এলাকার মৃত শাহাদত হোসেনের ছেলে আবতাব উদ্দিন, আদর্শপাড়া গ্রামের ইসমাইল হোসেনের ছেলে রাসেল, কৃষ্ণনগর মুচিপাড়া গ্রামের সুবল দাস এবং কালীগঞ্জ উপজেলা সদরের আলাউদ্দিন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা রুটগুলোর মধ্যে সাতক্ষীরায় ২২টি, যশোরের ১৯টি, কুষ্টিয়ায় ১০টি, ঝিনাইদহে ৭টি, বাগেরহাটে ১১টি এবং মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গায় ২০টি রয়েছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরার সদর উপজেলার বৈকারী, ঘোনা, কুশখালী, ভোমরা, হাড়দ্দাহ, কলারোয়া উপজেলার মাদ্রা, সোনাবাড়িয়া, চান্দুড়িয়া, কেড়াগাছি, কাকডাঙ্গা, ভাদিয়ালী ও হিজলদী এবং দেবহাটা উপজেলার কুলিয়া, শাকরা, গাজিরহাট ও টাউন শ্রীপুর, বাগেরহাটের মংলা উপজেলার নালা, নলিয়ান, তাতরাল পয়েন্ট, হংসরাজ চ্যানেল, বোর পয়েন্ট, হিরণ পয়েন্ট, দুবলার চর, ছোট আমবাড়িয়া খাল, জ্যাফোর্ড পয়েন্ট, ফেয়ার ওয়েবয়া ও এর পাশ্ববর্তী এলাকা, যশোরের শার্শা উপজেলার শিকারপুর, গোগা, শালকোনা, রুদ্রপুর, কায়বা ও অগ্রভুলোট, বেনাপোল বন্দর থানার গাতিপাড়া, দৌলতপুর, পুটখালী, ঘিবা, বেনাপোল আইসিপি ও রঘুনাথপুর এবং চৌগাছা উপজেলার মাশিলা, আন্দুলিয়া বিওপি, বর্ণী, শাহাজাদপুর, পুড়াপাড়া, যাদবপুর ও হিজলী, ঝিনাইদহের সীমান্ত থানা মহেশপুরের বাঘাডাঙ্গা, শ্যামকুড়, জুলুশী ও কুসুমপুর এলাকা।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার সাথে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার করিমপুর ও মুর্শিদাবাদ জেলার জলঙ্গী থানার ৪৬ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে ২৯ কিলোমিটার স্থল এবং ১৭ কিলোমিটার জল সীমানা। স্থল ভাগের ২৯ কিলোমিটারে কাঁটাতারের বেড়া রয়েছে। আর নদী পথের ১৭ কিলোমিটার জলসীমা উন্মুক্ত। এছাড়া সীমান্ত এলাকার মহিষকুণ্ডির ভাগজোত মোড়, মুন্সিগঞ্জ, প্রাণপুর, চরপাড়া, রামকৃষ্ণপুর, চিলমারী ও চরচিলমারী নামক স্থান দিয়ে ঈদ পরবর্তী সময়ে চামড়া পাচার হয়ে থাকে।
পশু কোরবানিকে উপলক্ষ করে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে চামড়া শিল্পের উন্নতির কারণে সীমান্তবর্তী জেলাগুলো দিয়ে চামড়া পাচার হয়ে থাকে। এছাড়া ঈদ মৌসুমে চামড়া ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট গড়ে তোলার প্রভাবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সীমান্ত এলাকার প্রশাসনকে ম্যানেজ করে চোরাকারবারিরা দিয়ে চটের বস্তায় কোরবানির চামড়া পাচার করে থাকে। প্রতিটি বস্তায় ১৫ থেকে ২০টি চামড়া থাকে। পাচারকারীরা বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করে ছোট ব্যাগে ভরে বাস, নছিমন, মোটর সাইকেল ও ভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহনে সীমান্ত এলাকার গোপন স্থানে জড়ো করে। পরে সুযোগ বুঝে ভারতীয় চোরাকারবারিদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
/এইচকে/







