লবণের দাম বেশি থাকায় আর ট্যানারি মালিকদের বেধে দেওয়া চামড়ার দাম কম থাকায় যশোরের ব্যবসায়ীরা এবছর লোকসানের মুখে পড়েছেন। তাদের দাবি, কোরবানির চামড়া সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতের পর কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
দেশের অন্যতম প্রধান চামড়া বিক্রির মোকাম যশোর সদরের রাজারহাট চামড়া হাট। ব্যবসায়ীরা জানান, চামড়ার খুচরা দাম কম হওয়াতে অনেক ব্যবসায়ী শনিবারের হাটে চামড়া নিয়ে আসেন নি। এ কারণে ঈদের পর প্রথম হাটে বাজারে খুব বেশি চামড়া দেখা যাচ্ছে না।
যশোর-খুলনা মহাসড়কের পাশে শহরতলীর রাজারহাটে বসে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চামড়ার হাট। সপ্তাহের শনি ও মঙ্গলবার এখানে হাট বসে। যশোর ছাড়াও খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, নড়াইল, মাগুরা, ঝিনাইদাহ, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, বরিশাল, ফরিদপুর, পটুয়াখালী, ঢাকা, চট্টগ্রাম, পাবনা, ঈশ্বরদী ও নাটোরের বড় বড় ব্যবসায়ীরা এ হাটে চামড়া বেচাকেনা করেন। এজন্য রাজারহাট চামড়া বাজার সবসময় থাকে জমজমাট। বেচাকেনাও বেশ ভালো হয়।কিন্তু এ বছর লবণের দাম দ্বিগুণ ও চামড়ার দাম বেধে দেওয়ায় হাটে বেচাকেনা হচ্ছে কম।
যশোর সদরের তরফ নওয়াপাড়া এলাকার খুচরা ব্যবসায়ী নিখিল চন্দ্র দাস জানান, ‘আজ কে রাজারহাটে চামড়া প্রায় অর্ধেক দামে বিক্রি হচ্ছে। গত বছর যে গরুর চামড়া তিন হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়েছে, এবার তা ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে ‘
ঝিকরগাছা থেকে ৪৫টি ছাগলের চামড়া এনেছেন মশিয়ার রহমান নামে এক ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, ‘একটি ছাগলের চামড়ায় এক কেজি লবণ দিতে হয়। লবণের দাম ২৫ টাকা। চামড়া কেনা, সংগ্রহ ও বাজারে আনা নেওয়ার খরচ বাবদ গড়ে ৮০ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। এখন হাটে এসে সেগুলো পানির দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি। আবার ফিরিয়ে নিয়ে গেলে পরের হাটে যে বেশি দাম পাওয়া যাবে তারও নিশ্চয়তা নাই।’
এবছর ট্যানারি মালিকদের বেধে দেওয়া দাম হচ্ছে,গরুর চামড়া প্রতি বর্গফুট ৪০ টাকা ও ছাগলের চামড়া ১৫ টাকা।কিন্তু রাজারহাটে প্রতিবছরই সাইজ অনুসারে চামড়া বিক্রি হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে গরুর চামড়া প্রতিটি ১ হাজার ৮০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ এবং ছাগলের চামড়ার দাম সর্বোচ্চ ১০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।’
সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার ভাড়াশিমলা এলাকার ব্যবসায়ী আব্দুস সবুর জানান, ‘চার-পাঁচটা ছাগলের চামড়া ফেলে দিয়েছেন। কারণ, ক্রেতারা প্রতিটি চামড়ার দাম দিতে চাচ্ছেন ১০ থেকে ১৫ টাকা করে।যেখানে এক কেজি লবণে খরচ হচ্ছে ২৫ টাকা, সেখানে গোটা চামড়ার দাম ১০-১৫ টাকা বললে, তা ফেলে দেওয়া ছাড়া উপায় কী।’
গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর থেকে এসেছেন পঞ্চানন বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘লাভের আশায় কোরবানির পর ৩০ পিচ গরুর চামড়া এনেছি হাটে। কিন্তু হাটে এসে হতাশ হতে হয়েছে। চামড়া প্রতি গড়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা খরচ পড়লেও এখন দাম ১ হাজার ৩০০ টাকার বেশি উঠছে না।’
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ট্যানারি মালিকরা বেশি লাভের জন্য এবার চামড়ার দাম কমিয়ে দিয়েছেন। রাজারহাট চামড়া ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি আব্দুল মালেক বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা বেশি দামের আশায় এখনও চামড়া ধরে রেখেছেন। এ কারণে ঈদের পরে বড়হাট হলেও চামড়া উঠেছে কম।’
জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক শেখ মোমিনুল মজিদ পলাশ জানান, ‘গতবারের তুলনায় হাটে এবার ৫০ থেকে ৬০ ভাগ চামড়া উঠেছে। ব্যবসায়ীরা চামড়া আনেন নি ‘
বৃহত্তর যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন মুকুল বলেন, ‘প্রায় ২০ হাজার মানুষ রাজারহাট চামড়া ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত। যাদের বেশিরভাগই ব্যাংক বা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করেছেন।’ তার মতে, ট্যানারি মালিকদের বেধে দেওয়া দাম ও লবণের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির কারণে এবার চামড়া হাটে ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি কম।
আলাউদ্দিন মুকুল বলেন, ‘গতবারের ঈদ পরবর্তী হাটে প্রায় ১০ কোটি টাকার চামড়া বেচাকেনা হয়েছিল। এবার তা অর্ধেকেরও কম হবে।’
আরও পড়ুন টাঙ্গাইলে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ জন নিহত
/এমডিপি/এপিএইচ/








