ভ্গ্নদশায় একুশে পদকপ্রাপ্ত লোককবি কবিয়াল বিজয় সরকার প্রতিষ্ঠিত টাবরা নবকৃষ্ণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের। প্রায় দুই বছর আগে একতলা ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করায় রোদ, বৃষ্টি ও শীত উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীদের গাছতলায় ক্লাস করতে হচ্ছে। এতে করে পড়ালেখার স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, চারণকবি বিজয় সরকার ১৯৪২ সালে নড়াইল সদর উপজেলার টাবরা গ্রামে তার বাবার (নববৃষ্ণ) নামে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর থেকে বিদ্যালয়টি প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক টাবরা গ্রামের শান্তিরাম বিশ্বাস (৭৫) বলেন, ‘কবিয়াল বিজয় সরকার শুধু গানের মানুষই ছিলেন না। একজন শিক্ষানুরাগী হিসেবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। অনেক প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও তার অদম্য উৎসাহ ও প্রাণের টানে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। এ বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা স্বনামধন্য চিকিৎসক, প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক সুনাম অর্জন করেছে। এখন অবকাঠামো সুযোগ-সুবিধা না থাকায় এবং সরকারের সুদৃষ্টির অভাবে বিদ্যালয়টির ভগ্নদশা।’
টাবরা নবকৃষ্ণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তন্ময় বিশ্বাস জানান, ১৯৯৫ সালের জুনে ভবনটিতে ক্লাস শুরুর ১০ বছরের মধ্যে তা জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে। অপর সহকারী শিক্ষক বরুন কুমার বলেন, ‘ভবনটির ভগ্নদশার কারণে গাছতলায় ক্লাস নিতে হয়। কর্তৃপক্ষকে বারবার বলেও কোনও সাড়া মেলেনি।’
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী চৈতী, হ্যাপি ও মুক্তা জানান, শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে গাদাগাদি করে কখনো টিনের ঘরে, কখনো গাছতলায় ক্লাস করতে হয়। এছাড়া রাস্তা পাকা না হওয়ায় অনেক কষ্ট করে বিদ্যালয়ে তাদের যাতায়াত করতে হয়। ছয়মাসের বেশি সময় কাঁদা-পানিতে ডুবে থাকা রাস্তায় মাঝে-মধ্যে পড়ে পোশাকসহ বই-খাতা নষ্ট হয়ে যায়।
স্থানীয়রা জানান, বিদ্যালয়ে অবকাঠামো দুর্বলতা থাকায় এবং যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় দিনদিন ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। বর্তমানে বিদ্যালয়ে দু’টি টিনের ঘরে পাঁচটি শ্রেণিকক্ষ রয়েছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৬৮ জন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দিলীপ কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘২০১৪ সালের প্রথমদিকে ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণার পর পাঠদানে খুব সমস্যা হচ্ছে। সংস্কারের জন্য ওই বছরের (২০১৪) ডিসেম্বরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেও কোনও কাজ হয়নি। বিষয়টি নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য, এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও আঞ্চলিক শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তাকে অবগত করা হয়েছে।’
জেলা প্রশাসক হেলাল মাহমুদ শরীফ বলেন, ‘বিজয় সরকারের বাবার নামে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টির সমস্যা সমাধানে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে। এছাড়া বিজয় সরকারের বাড়িতে যাতায়াতের রাস্তা পাকাকরাসহ তার প্রতিকৃতি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছি।’
উল্লেখ যে, ১৯৮৫ সালের ৪ ডিসেম্বর ভারতে পরলোকগমন করেন বিজয় সরকার। পশ্চিমবঙ্গের কেউটিয়ায় তাকে সমাহিত করা হয়। একাধারে গীতিকার, সুরকার ও গায়ক ছিলেন তিনি। অসাম্প্রদায়িক চেতনার সুরস্রষ্টা বিজয় সরকার ১৯০৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি নড়াইল সদর উপজেলার ডুমদি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। প্রকৃত নাম বিজয় অধিকারী হলেও সুর, সঙ্গীত ও অসাধারণ গায়কী ঢঙের জন্য ‘সরকার’ উপাধি লাভ করেন। মুক্তিযুদ্ধের গানসহ ১ হাজার ৮০০ বেশি গান লিখেছেন। শিল্পকলায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৩ মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত হন তিনি।
/এমও/








