বাড়ির সামনের রাস্তায় এক মেয়ের সঙ্গে কথা বলার অপরাধে ঝিনাইদহে পারভেজ মোল্লা (১৩) নামের এক শিশুকে মধ্যযুগীয় নির্যাতন চালানো হয়েছে। শিশুটিকে মারধর করেই ক্ষান্ত হয়নি নির্যাতনকারীরা। তার পুরুষাঙ্গে পেরেক ঢুকিয়েও নির্যাতন চালিয়েছে তারা। এ ঘটনায় শিশু পারভেজের মা পারভিনা বেগম গত সোমবার (৩ জুলাই) ৮ জনের নাম উল্লেখ করে ১০ জনের বিরুদ্ধে কালীগঞ্জ থানায় এই মামলা দায়ের করেন। কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পারভেজের নানা লিটন চৌধুরী জানান, গত ২২ জুন বিকালে কালীগঞ্জ উপজেলায় রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে একটি মেয়ের সঙ্গে কথা বলছিল পারভেজ। কথা বলার কারণে মেয়েটির বাবা আজিজুল লস্কর ও তার চাচারা শিশু পারভেজকে প্রচণ্ড মারধর করে। পরে তাকে ধরে নিয়ে লুকিয়ে রাখে। মারধরের সময় পারভেজের সঙ্গে থাকা নাজমুল নামের আরেক শিশু দৌড়ে পালিয়ে গিয়ে তার বাড়িতে খবর দেয়। খবর পেয়ে আজিজুল লস্করের কাছে পারভেজকে ফেরত চান তার মা পারভিনা বেগম। তখন আজিজুল লস্কর বলেন, ‘আমরা তাকে মারপিট করে তাকে ছেড়ে দিয়েছি।’
তবে পারভেজের নানা অভিযোগ করেন, ‘তাকে (পারভেজকে) রাতে প্রথমে একটি পাটক্ষেতে ও পরে একটি গোডাউনে আটকে রেখে পুরুষাঙ্গে পেরেক ঢুকিয়ে এবং বুক-হাত-পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে, পিটিয়ে নির্যাতন করে। নির্যাতনের ফলে সে রক্তাক্ত জখম হয়। তারপরও তারা তাকে ছাড়েনি। তার চিৎকার পাশ্ববর্তী বাড়ির লোকজন শুনতে পেয়েছেন।’
পারভেজের মা পারভীনা বেগম জানান, ‘একদিন পর গত ২৩ জুন দুপুরে, একটি ফোন আসে আমার কাছে। বলে, তোমাদের ছেলেকে পাওয়া গেছে, এসে নিয়ে যাও। এরপর আমরা গিয়ে দেখি পারভেজ অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে।’
পারভীনা বেগম বলেন, ‘নির্যাতনের ফলে আমার ছেলে মলমুত্র ত্যাগ করে ফেলে, এসব তার সারাশরীরে মেখে ছিল। আমরা পাশের একটি টিউবওয়েল থেকে তাকে পরিষ্কার করে আনি। তারা (নির্যাতনকারীরা) আমাদের জোর করে একটি ভ্যান ডেকে তুলে পাঠিয়ে দেয়। ছেলের অবস্থা খারাপ দেখে ওইদিন দুপুর ২টার দিকে প্রথমে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করি। পারভেজের অবস্থার অবনতি দেখে ডাক্তাররা তাকে যশোর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করেন। সেখানে নিয়ে গেলে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর সেদিন রাতেই ডাক্তাররা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করেন। আমরা পর দিন (ঈদের আগের দিন) ঢাকায় নিয়ে যাই। সেখানে তার মাথায় অপারেশন করা হয়েছে। পারভেজ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ১০০নং ওয়ার্ডের ইউনিট-২-এর বি-৪০ নং বেডে চিকিৎসাধীন ছিল। সোমবার (৩ জুলাই) রাতে তাকে কালীগঞ্জে আনা হয়েছে। ১২ দিন পর তার তার জ্ঞান ফিরেছে।’
স্থানীয় কোলা ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডের মেম্বর জাফর হোসেন জানান, ‘কারা কিভাবে নির্যাতন করেছে, এটা আমি বলতে পারব না। তবে পারভেজের চিকিৎসার জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে ১২ হাজার টাকা দিয়েছি। গ্রাম থেকেও প্রায় লক্ষাধিক টাকা সংগ্রহ করে দেওয়া হয়েছে। তবে পারভেজের অব্স্থা দেখে মনে হচ্ছে, তাকে ব্যাপক নির্যাতন করা হয়েছে।’
কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা প্রফুল্ল কুমার বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘জ্ঞান ফেরার পর পারভেজ এখন কিছুটা ভালো আছে। সে স্বাভাবিকভাবেই খাওয়া-দাওয়া করছে। ধীরে-ধীরে কথাবার্তাও বলছে। তবে তার মাথার সেলাই খোলার জন্য আবার ঢাকায় নিতে হবে।’
এদিকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও কালীগঞ্জ থানার এসআই কওসার আলী জানান, ‘মামলা দায়েরের পর তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। তারাসহ মোট ৯ আসামি এখন জামিনে মুক্ত আছে।’
কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক। ছেলেটির চিকিৎসার কারণে যথাসময়ে তার স্বজনরা থানায় মামলা করতে আসতে পারেননি। পরে তারা মাগুরা জেলার শালিখা থাকায় মামলা করতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে পরামর্শ পেয়ে সোমবার কালীগঞ্জ থানায় ৮ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ২ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেফতার করেছে। পরে ৯ জন জামিন পেয়েছে।’
মামলার আসামিরা হচ্ছে, দাস বাইসা গ্রামের মৃত ছদোর আলী লস্করের তিন ছেলে আজিজুল লস্কর (৪২), মাজিদুল লস্কর ( ৩৮), রবিউল লস্কর (৩৫)। অন্য আসামিরা হচ্ছেন, দাস বাইসা গ্রামের তছির উদ্দীন, আব্দুস সালাম, ইমামুল, আজিজ শেখ, আজিজুলসহ অজ্ঞাত আরও ২ জন। মামলার পর পুলিশ মাজিদুল লস্কার, তছির উদ্দীন ও সন্দিগ্ধ আলফাজ নামের তিনজনকে গ্রেফতার করে।
কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ছাদেকুর রহমান জানান, ‘গত সপ্তাহে পারভেজের বাড়িতে গিয়ে দেখি তার অবস্থা খুবই খারাপ। পরে তার চিকিৎসার জন্য পরিবারের সদস্যদের কাছে ৫ হাজার টাকা দেই। কালীগঞ্জ হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা করানোর জন্য অ্যাম্বুলেন্স পাঠাই।’
উল্লেখ্য, পারভেজ মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলার পিয়াপুর গ্রামের শিমুল মোল্লার ছেলে। তার বয়স যখন চার বছর বছর তখন বাবা-মায়ের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। এরপর সে কালীগঞ্জ উপজেলার দামোদরপুর গ্রামে নানা জিল্লুর রহমানের বাড়িতে থাকতো। সম্প্রতি সে রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করছিল।
/এফএস/এমএনএইচ/
আরও পড়ুন- মুক্তামনির কী অসুখ জানেন না চিকিৎসকরাও!








