একই ঘের বা পুকুরে একসঙ্গে চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষ করার প্রবণতা হ্রাস পাচ্ছে খুলনা অঞ্চলে। এ পদ্ধতিতে চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হওয়ায় এর পরিবর্তে আধুনিক পদ্ধতি খাঁচায় কাঁকড়া চাষে ঝুঁকছেন চাষিরা। ঝুঁকি কম ও লাভ বেশি হওয়ায় কাঁকড়া চাষের এ পদ্ধতি বেশ সাড়া ফেলেছে চাষিদের মধ্যে। তাছাড়া এই পদ্ধতিতে কাঁকড়া চাষে সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে জেলা মৎস্য অধিদফতর, যা চাষিদের আরও উদ্বুদ্ধ করছে।
চাষিরা জানান, একসময় তারা একই ঘের বা পুকুরে একসঙ্গে চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষ করতেন। কিন্তু এভাবে চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষ করায় সাদা সোনা খ্যাত চিংড়িতে ভাইরাসের সংক্রমণ হতো। এতে লাভের আশায় একসঙ্গে চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষ করে তারা লোকসানে পড়তেন। এ অবস্থা থেকে বাঁচতে জেলা মৎস্য অধিদফতরের পরামর্শে তারা বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ‘সুশীলন’র এক প্রকল্পের আওতায় আধুনিক পদ্ধতির কাঁকড়া চাষের প্রশিক্ষণ নেন। এখন সেই পদ্ধতিতে কাঁকড়া চাষ করে লাভের মুখ দেখছেন তারা।
কাঁকড়া চাষ আধুনিকীকরণে সুশীলনের প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণ নেন বটিয়াঘাটা উপজেলার ভগবতিপুরের কাঁকড়া চাষি রতন সরকার। তিনি বলেন, ‘একসময় এক ঘের বা পুকুরে একইসঙ্গে চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষ করায় ভাইরাসের সংক্রমণ হতো। এতে চিংড়ি ও কাঁকড়ার উৎপাদন ভালো হতো না। এখন আধুনিক চাষ পদ্ধতির ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে কাঁকড়া চাষ করছি, লাভও হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সঠিক প্রক্রিয়ায় কাঁকড়া বীজ আনতে না পারায় ২০-২৫ ভাগ কাঁকড়া মারা যাচ্ছে। তবে এরপরও এখন লাভ থাকছে। ৫০ শতক জমিতে প্রথম দফায় ৩৫ কেজি কাঁকড়া ছেড়ে পাঁচ হাজার টাকা লোকসান হয়। তবে দ্বিতীয় দফায় ৩৫ কেজি কাঁকড়ায় কম হলেও ৪০-৪৫ হাজার টাকা লাভ হচ্ছে। আধুনিক পদ্ধতিতে কাঁকড়া চাষ করলে ১৫-২৫ দিনের মধ্যে তা বিক্রিযোগ্য হয়ে উঠছে।’
একই উপজেলার রায়পুরের চাষি পরিমল মণ্ডল বলেন, ‘চিংড়ি থেকে আলাদা করে কাঁকড়া চাষের ফলে ভাইরাস সংক্রান্ত কোনও জটিলতায় পড়তে হচ্ছে না। এখন কাঁকড়া অর্ধেক মারা গেলেও ভালোই লাভ পাচ্ছি।’
রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘সুমাইয়া সি ফুড’-এর মালিক মো. মুসা শেখ বলেন, ‘বিশ্ববাজারে সুন্দরবনের কাঁকড়ার চাহিদা ব্যাপক। এ অঞ্চলের কাঁকড়া অন্য যেকোনও জোনের চেয়ে সুস্বাদু। তাই আধুনিক চাষ পদ্ধতির প্রশিক্ষণ পাওয়া চাষিরা এখন বেশি লাভবান হচ্ছেন।’ তিনি আরও জানান, সরকার কাঁকড়া চাষের উন্নয়নে হ্যাচারি স্থাপনের পরিকল্পনা করছে, যা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
রামপাল উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা রিপন কান্তি ঘোষ বলেন, ‘একই ঘেরে বাগদা চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষের ফলে তাতে ভাইরাস সংক্রমণ হয়। লবণাক্ততা হ্রাস-বৃদ্ধিজনিত সংকটও সৃষ্টি হয়। কিন্তু আধুনিক কাঁকড়া চাষের পদ্ধতিতে তেমন কোনও সমস্যা হয় না।’
সুশীলনের উপ-পরিচালক (কর্মসূচি) মো. রফিকুল হক বলেন, ‘২০১৬ সালের আগস্ট মাস থেকে এক প্রকল্পের আওতায় আধুনিক পদ্ধতিতে কাঁকড়া চাষের ওপর ৩০০ চাষিকে আমরা প্রশিক্ষণ দিই। এখান থেকে প্রশিক্ষিত হয়ে খুলনা শহর ও বটিয়াঘাটা, বাগেরহাটের মংলা ও রামপাল এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ওই চাষিরা এখন আধুনিক পদ্ধতিতে কাঁকড়া চাষ করছেন। এতে তাদের আয় আগের চেয়ে ২-৩ গুণ বেড়েছে।’
খুলনা জেলা মৎস্য অধিদফতরের সিনিয়র সহকারী পরিচালক অমল কান্তি রায় বলেন, ‘এ অঞ্চলে অধিক লাভের আশায় একই ঘেরে একসঙ্গে চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষ করার প্রবণতা এখন কমেছে। একই ঘেরে একসঙ্গে দীর্ঘদিন চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষ করলে ওই ঘেরের জীবণুচক্রে পরিবর্তন আসে। এতে ঘেরের মাটি ও পানিতে প্রয়োজনীয় জীবকোষ দুর্বল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, ওই ঘেরের জীবাণুচক্র সক্রিয় হয়ে উঠে, যা চিংড়ির ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে। তবে আধুনিক পদ্ধতির কাঁকড়া চাষে এ ঝামেলা নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘সাধারণত সেপ্টেম্বর-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কাঁকড়া চাষের মৌসুম। এ মৌসুমে আধুনিক পদ্ধতিতে কাঁকড়া চাষ করলে প্রতি মাসে দুইবার বিক্রিযোগ্য কাঁকড়া পাওয়া যায়।’







