কুসংস্কার ভেঙে দুধ বিক্রি করে সচ্ছল কোরবান আলী

তৌহিদ জামান, যশোর
২৮ আগস্ট ২০১৮, ১১:৩২আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০১৮, ১৩:২২

খামারে কোরবান আলী চৌদ্দ পুরুষের প্রথা ভেঙে যশোরের ভগবতীতলা গ্রামের কোরবান আলী (৪০) প্রতিদিনই শহরে গিয়ে দুধ বিক্রি করছেন। দুধ বিক্রি করে সপ্তাহে কমপক্ষে ২৪শ’ টাকা আয় করছেন তিনি। অবশ্য এই দুধ বিক্রি করাটা তার জন্যে এতটা সহজ ছিল না বছর কয়েক আগেও। গ্রামের প্রচলতি কুসংস্কার ভেঙে সংগ্রাম করে দুধ বিক্রি করে আজ তিনি স্বাবলম্বী।

ভগবতীতলা গ্রামটি যশোর সদরের কচুয়া ইউনিয়নের ভৈরব নদের কোল ঘেঁষে। সবুজ-শ্যামল ছায়া ঢাকা শান্ত গ্রামটি। এখানকার মানুষ বংশপরম্পরায় যে নিয়মটি মেনে আসছেন তা হলো- ‘গরুর দুধ বিক্রি কিংবা গ্রামের ভেতরে কোনও গরু জবাই করা যাবে না।’ ভয় কিংবা প্রথার প্রতি আনুগত্য- যে কারণেই হোক, তারা কোরবানির ঈদে ছাড়া এই অঞ্চলে গরু জবাই করেন না। তবে তারা মাংস খান না, তা নয়। পাশের নিমতলী, মুন্সেফপুর, রায়মানিক কিংবা দাইতলা থেকে গরু জবাই করে ভ্যানে কিংবা সাইকেলে মাংস এনে তারপর খান।

গরুর দুধ বিক্রি বা গরু জবাই কেন করা হয় না? এই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর কারও কাছেই পাওয়া যায়নি। তবে,এবিষয়ে প্রবীণ কয়েকজন গ্রামবাসীর সঙ্গে আলাপ করে একটি কাহিনী জানা গেছে। তবে সেই কাহিনীর সত্যতা নিশ্চিত নন প্রবীণরাও।

ভগবতীতলা বাজারের একটি চায়ের দোকানে বসেছিলেন অশীতিপর গহর আলী মোল্যা ও আছর আলী মোল্যা (৭২)। তাদের সঙ্গে কথা বলার সময় উপস্থিত হন মাহবুবুর রহমান (৪০) ও ওবায়দুর রহমান (৪২)। গহর আলী মোল্যা বলেন, ‘বাপ-দাদাদের কাছে শুনেছি, বহু বছর আগে এক ব্যক্তি আমাদের গ্রামে আসেন দুধের সন্ধানে। আশপাশের গ্রামে দুধ না পেয়ে তিনি এই গ্রামে এসে দুধ পান। তিনি গ্রামবাসীর উদ্দেশে বলেছিলেন, তোমরা খুব ভাগ্যবান; কখনও দুধ বিক্রি করো না। বিনা পয়সায় কেউ চাইলে দিও, আর গরু জবাই করো না। দেখবে তোমরা তাতে ভালো থাকবে। এই ঘটনার পর থেকে গ্রামের কেউই আর দুধ বিক্রি করতো না; গরুও জবাই করতো না।’ এই প্রথা যুগের পর যুগ চলে এলেও মাঝে কিছু ব্যতিক্রম ঘটনা ঘটে।

আছর আলী বলেন, ‘খুব ছোটবেলায় দেখেছি- আত্মীয়রা এলে তাদের দুধের নানা ধরনের পিঠা খাওয়ানো হত। যাওয়ার সময় তাদের ভাঁড়ে করে দুধও দেওয়া হত। কিন্তু কখনও শুনিনি কেউ বিক্রি করেছে। আর কোরবানির ঈদ ছাড়া গরু জবাইও করতে দেখিনি আজ পর্যন্ত।’ তিনি বলেন, ১০-১২ বছর আগে মোজের মোল্যার মা নামে এক বুড়ি গরুর দুধ জ্বাল দিয়ে ঘি বানায়ে তা বিক্রি করেন। এরপর তার গরুটি মারা যায়। বছর তিন আগে আব্দুল্লাহর ছেলে সদর আলী তার গরুর দুধ বিক্রি করায় গরুটি মারা যায়।’

কোরবান আলীর গ্রামে স্থানীয়দের সঙ্গে প্রতিনিধি তৌহিদ জামান ওবায়দুর রহমান বলছিলেন, ‘আমাদের এখানে শীতকালে সেনাবাহিনীর সদস্যরা ট্রেনিং করতে আসেন। ১৯৯৭-৯৮ সালের দিকে একজন মেজর গ্রামবাসীর সঙ্গে আলাপ করে একটি গরু জবেহ করার কথা বলেন। গণ্যমান্যরা তাকে নিষেধ করলেও তিনি তা মানেননি। কথিত আছে, ওইরাতেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে কী হয়েছিল তা জানিনে।’
এমন আরও কিছু গল্প প্রচলিত রয়েছে। তারা জানান, এই গ্রামের একজন মৌলভী যার নাম মোহাম্মদ, তিনি এই প্রথার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে গরু জবাই করেন এবং তিনি রোগে ভুগে মারা যান।

গল্পগুলোর সার সংক্ষেপ হচ্ছে- কেউ দুধ বিক্রি করলে গাভী মারা যায় আর গরু জবাই করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে মারা যান! এই ভয়ে কেউই সাধারণত আর দুধ বিক্রি কিংবা গরু জবাই করতে চান না।

এই ধারণার বিপরীতে দাঁড়িয়েছেন পশ্চিপাড়ার গোলাম রসুলের ছেলে কোরবান আলী। ২০১২ সালে তিনি একটি ফ্রিজিয়ান গরু কেনেন ১৪ হাজার টাকা দিয়ে। পরের বছর থেকে ১২ থেকে ১৪ কেজি দুধ প্রতিদিন বিক্রি শুরু করেন। তার ভাষায়, ‘দুধ বিক্রি করার পর এক ঈদের দিন ঈদগাহে স্থানীয় গণ্যমান্যরা আমাকে ব্যাপকভাবে তিরস্কার করেন। তারা দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়ে দেন, আমাদের চৌদ্দপুরুষ যে নিয়মনীতি মেনে আসছে, তার ব্যত্যয় হতে তারা দেবেন না।’
কোরবান আলী বলেন, ‘আমার বাড়ি থেকে যে গোয়ালা দুধ নিতে আসতো, একদিন তাকে মারধর করা হয়। ভয়ে তিনি আর আসতে চাননি। কিন্তু তার বাড়ি পাশের গ্রামে হওয়ায় নদী সাঁতরে চুরি করে এসে তিনি দুধ নিয়ে যেতেন। এভাবেই আমার দুধের ব্যবসা শুরু।’

ছয় বছর আগে ১৪ হাজার টাকা দিয়ে গরু পোষার কাজ শুরু করলেও আজ তিনি ৫টি গরুর মালিক। ইতোমধ্যে দুটি ষাঁড় বিক্রি করে পেয়েছেন দেড় লাখ টাকা। এখনও প্রায় ৫ লাখ টাকা মূল্যের গরু রয়েছে তার গোয়ালে। দুধ বিক্রি করে এ পর্যন্ত তার কোনও গরু মরেনিও কিংবা তারও কোনও ক্ষতি হয়নি।

খামারে কোরবান আলী প্রতিবেশী সদরের গরুটা কেন মরেছিল- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাছুর হওয়ার পর গরুটি খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে। কিন্তু সে গরুর চিকিৎসা করায়নি। এতে গরুটি মরে যায়; এরসঙ্গে দুধ বিক্রির কোনও সম্পর্ক থাকার কথা না।’

এই গ্রামের মসজিদের ইমাম সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘আল্লাহর দুনিয়ায় এই গ্রামের জন্যে আলাদা কোনও বিধান নেই। বছর তিনেক আগে একটি অসুস্থ গরু গোয়াল ঘরেই জবাই করেছিলাম। এই ঘটনায় গ্রামের মুরুব্বিরা আমাকে ভর্ৎসনা করেছিলেন।’

জানতে চাইলে দাইতলা হাইস্কুলের প্রধানশিক্ষক সফর আলী বলেন, ‘বছর ১৫ আগে এক মৌলভী প্রথা ভেঙে গরু জবাই করেছিলেন। পরে তিনি অসুস্থ হয়ে মারা যান। এটি আমাদের প্রথা। তবে, ইদানিং কয়েকজন দুধ বিক্রি করছেন বলে শুনেছি।’

কচুয়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বর ও এই গ্রামের বাসিন্দা মো. আবদুল হান্নান বলেন, ‘আমরা বাপ-দাদাদের মুখে শুনেছি। আসলে এই ঘটনার সত্যতা আমিও জানিনে। কবে কার কাছে কে দুধ চেয়েছিল, কাকে বলেছিল দুধ বিক্রি করা যাবে না বা গরু জবাই করা নিষেধ- তা কেউই জানে না। শুধু এইটুকু বিশ্বাস করেই যুগের পর যুগ এই প্রথা চলে আসছে। কারও প্রয়োজন হলে সে দুধ বিক্রি করতেই পারে; তাকে নিষেধ করার কিছুই নেই।’

এসব বিষয়ে কথা হয় বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক বেনজীন খানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘প্রকৃতিগতভাবেই অনেককিছু ঘটে। হয়তো দুধ বিক্রি করার পর স্বাভাবিকভাবেই গরুটি মারা যেত কিংবা একজন মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন- এই বিষয়টিকে মানুষ অতিপ্রাকৃত ভাবতে পছন্দ ও প্রচার করে। আর এ ঘটনার পর অনেকে ভয় পেয়ে যেতেও পারেন। মানুষের ভেতরে কিছু দুর্বলতা কিন্তু থাকে। এতকিছুর পর যে দুধ বিক্রি করেও একজন মানুষ সুস্থ সবল আছেন, সচ্ছল হয়েছেন- এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, তারা যা ভাবছে, সেটি আসলে ভুল। তবে, এগুলো যদি কেউ বিশ্বাসও করে, তা ভেঙে দেওয়াও যেমন ঠিক না, তেমনি কেউ বেরিয়ে আসতে চাইলে তাকে সহায়তা করাও উচিৎ।’
ভগবতীতলা গ্রামটি যশোর-নড়াইল সড়কের পাশে অবস্থিত। প্রায় দুই হাজার লোকের বসবাস এখানে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট এই এলাকাতে ৩০ ঘরের মতো একটি ঋষিপল্লী রয়েছে।

 

/আইএ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর কারণ জানালো তদন্ত কমিটি
আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর কারণ জানালো তদন্ত কমিটি
নিউ জিল্যান্ডের চার এমপির ওপর চীনের নিষেধাজ্ঞা
নিউ জিল্যান্ডের চার এমপির ওপর চীনের নিষেধাজ্ঞা
হাওরের জন্য ৫০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দের দাবি
হাওরের জন্য ৫০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দের দাবি
চীনের বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুলে প্রদর্শিত হবে বাংলাদেশের তথ্যচিত্র ‘পায়ের ছাপ’
চীনের বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুলে প্রদর্শিত হবে বাংলাদেশের তথ্যচিত্র ‘পায়ের ছাপ’
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের