প্রশাসনের লাগাতার অভিযানের মধ্যেও খুলনা মহানগরীতে ভিন্ন কৌশলে ইয়াবা বিক্রি হচ্ছে। এ জন্য গড়ে উঠেছে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের নতুন সিন্ডিকেট। এ সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে কিছু অসাধু পুলিশ, ব্যবসায়ী, রেল কর্মচারী ও মোটর শ্রমিক নেতারা। আড়াল থেকে ভিন্ন পেশার মানুষ পৃথক এলাকায় সিন্ডিকেট গড়ে তুলছে। তালিকাভুক্ত মাদক বিক্রেতারা চাপের মুখে থাকার ফলে এ চক্রটি এখন সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। ফলে ক্রাশ প্রোগ্রামসহ মাদক দমনে প্রশাসনের কঠোর অভিযান চললেও মাদকের বিকিকিনি বন্ধ হচ্ছে না।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) এম এম সাকিলুজ্জামান বলেন,‘যে পেশার বা যত প্রভাবশালীই হোক না কেন- মাদকের সঙ্গে জড়িতদের ছাড় দেওয়া হবে না। মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান ক্রমেই কঠোর হচ্ছে।
অনুসন্ধ্যানে জানা গেছে, সোনা ব্যবসায়ী, উচ্চ পদধারী কর্মকর্তা, সুন্দরী নারী, রেলওয়ে কর্মচারী, কিছু পুলিশ কর্মকর্তা ও সোর্স নিরবে মহানগরীতে ইয়াবা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে মাদক সেবীরা নিয়মিত ইয়াবা পেয়ে যাচ্ছে। তবে এর জন্য তাদের চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে। ইয়াবার চালান মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব যানবাহনে করে মহানগরীতে ঢুকছে। এ সব গাড়ির পেছনের সিটে লাগানো হয়েছে কালো গ্লাস। ইয়াবার নব্য ব্যবসায়ীরা অনায়াসে ও নিরাপদে নির্ধারিত স্থানে ইয়াবা পৌঁছে দিচ্ছে। ইয়াবা সহজেই এক গাড়ি থেকে অন্য গাড়িতে হাত বদলও হচ্ছে। গাড়িতে বসেই লেনদেন সেরে ক্রেতাকে নামিয়ে সটকে পড়ছে। মহানগরীর আবাসিক হোটেলগুলোও এখন এ সব ভিআইপি মাদক বিক্রেতাদের নিরাপদ স্থানে পরিণত হয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর খুলনার উপ-পরিচালক মো. রাশেদুজ্জামান বলেন, লাগাতার অভিযানের ফলে খুলনায় মাদক বিকি-কিনি এখন প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এখন যত্রতত্র ইয়াবা বিক্রি হচ্ছে না। অভিযানের ফলে বিক্রেতারা ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে। নতুনভাবে অনেক প্রভাবশালী এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। নজরদারি ও অভিযান আরও জোরদার করা হচ্ছে।
খালিশপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্ত (ওসি তদন্ত) আবুল খায়ের জানান,গত ২২ আগস্ট দুপুরে মহানগরীর খালিশপুর পাওয়ার হাউস মোড়ের আরএফএল’র শো-রুমে অভিযান চালিয়ে ইয়াবাসহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক মো. জাহিদুল ইসলাম ও সোনা ব্যবসায়ী শ্যাম চন্দ্র পোদ্দারকে আটক করে পুলিশ। শ্যাম চন্দ্র পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার ব্লু-রঙ্গের একটি প্রাইভেটকারে করে ইয়াবা চালান এখানে আনে।
১০ আগস্ট রাত পৌনে ১টার দিকে বয়রা আইজের মোড়ে অভিযান চালিয়ে ৫০ পিস ইয়াবাসহ ৩য় আর্মড পুলিশ ব্যাটেলিয়নের (এপিবিএন) কর্মরত এএসআই আব্দুল্লাহ আল মামুন (৩৩), সোনালি জুট মিল কর্মকর্তা মেহেবুব বিন আফতাব (৪০), ব্যবসায়ী নাহিদ শেখ (৩০), বাগেরহাট সিআইডি’র পুলিশ কনস্টেবল সোহানুর রহমান (৩৫) ও মাদক বিক্রেতা সোহেল বেগমকে (২০) গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে এ্যাপাসি ব্রান্ডের একটি মোটর সাইকেলসহ নগদ ৪৬ হাজার টাকা জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় ৫ জনের নামে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের পৃথক মামলা দায়ের করা হয়। গত ২৮ আগস্ট বিকেলে রেলওয়ে খুলনার এসিসট্যান্ট লাইন ইলেকট্রেশিয়ান শাহজাহান ইসলাম নয়ন (৩৫) ও রেলের ওয়েম্যান মহিদুল ইসলামকে (৩৮)ইয়াবাসহ গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে পাঁচ পিচ ইয়াবা ও দুই বোতল ফেনসিডিল পাওয়া যায়। তাদের বিরুদ্ধে সদর থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। গত ১৫ আগস্ট রাতে খুলনার মিডনাইট আবাসিক হোটেল থেকে ইয়াবাসহ পুলিশ কনস্টেবল ও তার দুই সহযোগী পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়।
আটককৃতরা হচ্ছে সাতক্ষীরার সদর থানাধীন ফিংড়ী এলাকার পবিত্র রায়ের ছেলে পুলিশ কনস্টেবল প্রীতম রায়, খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার রঘুনাথপুরের প্রভাত মণ্ডলের ছেলে সুমন মণ্ডল এবং দাকোপ উপজেলার বাজুয়া গ্রামের প্রভাত রায়ের ছেলে শাওন রায়।
খুলনা মেট্রেপলিটন পুলিশের (কেএমপি) উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) মোল্লা জাহাঙ্গীর আলম বলেন,‘ইয়াবা বিক্রি বা সেবনের সঙ্গে জড়িতদের সঙ্গে পুলিশের সখ্যতা থাকতে পারে না। অতি লোভের কারণে দু’একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনায় মাদকসহ পুলিশ সদস্যরা গ্রেফতারের হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কঠিন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।এছাড়া মাদকের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার বিষয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনও অভিযোগ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কঠোর অভিযানের মধ্যেও কয়েকটি সংঘবদ্ধ চক্র তৎপড়তা শুরু করেছে তথ্য পেয়ে পুলিশ অভিযান পরিচালনা করে সফল হয়েছে।







