চলতি বছর সরকারিভাবে ১২ হাজার ৭১২ টন বোরো ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও এখন পর্যন্ত সংগ্রহ করা হয়েছে মাত্র ২ হাজার ২২১ দশমিক ৪৪০ টন ধান, যা লক্ষ্যমাত্রার ১৮ শতাংশ।
অন্যদিকে বাম্পার ফলনের পরও সরকারের কাছে সরাসরি ধান বিক্রি করতে না পারায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কৃষকরা। তাদের দাবি, কৃষকদের কাছ থেকে সরকারি ধান কেনা না হলে আগামীতে তারা ধান উৎপাদনের আগ্রহ হারাবে।
যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার খাজুরা বাজারে সপ্তাহে দুই দিন ধানের সবচেয়ে বড় হাট বসে। হাটের পাশেই সরকারি খাদ্যগুদাম। সেখানে সরকারিভাবে ১০৪০ টাকা দরে বোরো ধান সংগ্রহের কথা থাকলেও কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনছেন না সরকারি কর্মকর্তারা। এ গুদামে ধান ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ১২৯৮ টন, যার মধ্যে গত দুই মাসে ক্রয় করা হয়েছে মাত্র ১০৪ টন ধান।
বাঘারপাড়া উপজেলার খাজুরা এলাকার কৃষক আরশাদ আলী জানান, এবার উৎপাদিত ধানের মধ্যে তিনি সরকারি গুদামে বিক্রি করতে পেরেছেন মাত্র ২৫ মণ ধান। কিছু ধান ৬৮০ থেকে ৭০০ টাকায় আড়তদারদের কাছে বিক্রি করেছেন। এই দামে বিক্রি করে খরচের টাকাই উঠছে না।
একই উপজেলার নিত্যানন্দপুর এলাকার কৃষক আব্দুস সবুর বলেন, ‘লিস্টে নাম না থাকায় সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করতে পারছি না। তাছাড়া সরকারি গুদামও আমার এলাকা থেকে বেশ দূরে। বহন করে নিয়ে যাওয়া আরেক ঝামেলা। সে কারণে সাতশ টাকা দরে আড়তদারদের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি।’
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের ঘরে এখনও প্রচুর ধান রয়েছে। সরকারি গুদাম উপজেলার এক কোনায় হওয়ায় পরিবহন খরচের কথা চিন্তা করে অনেকে সেখানে যেতে পারছেন না। ইউনিয়ন পর্যায়ে ধান সংগ্রহের ব্যবস্থা এবং নগদ মূল্যে কেনা হলে কৃষকরা লাভবান হতেন।
তারা জানান, এবার ধানের যে দাম পাওয়া গেছে, তাতে আমন ফলনে বেশ প্রভাব পড়বে। একে তো বৃষ্টি নেই, তার ওপর ধানের এই দাম। এসব কারণে কৃষকরা বেশ হতাশ।
জাতীয় কৃষক সমিতি যশোর জেলার সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বলেন, ‘উৎপাদিত ধানের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় বেশিরভাগ কৃষকই আমন ধান উৎপাদনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। অনেকে জমি বন্ধক দিয়ে দিয়েছেন।’
তিনি বলেন, কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি নগদ মূল্যে ধান কিনতে হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে গুদাম তৈরি করে ধান সংগ্রহ করলে কৃষকরা বাঁচবেন। বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদের যে ভবন রয়েছে, তাতেও ধান সংগ্রহ সম্ভব। শুধু সরকারের সদিচ্ছার প্রয়োজন। কৃষক যদি তার ধান সঠিক দামে বিক্রি করতে না পারেন, তবে সামনে ধান চাষ থেকে তারা মুখ ফিরিয়ে নেবেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর যশোরের উপপরিচালক এমদাদ হোসেন শেখ জানান, এ জেলায় বোরো মৌসুমে উৎপাদন হয়েছে ১০ লাখ ৬৪ হাজার ৭২৮ টন ধান। সরকার যশোর জেলা থেকে প্রায় ১৩ হাজার টন ধান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সে লক্ষ্যে কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করে উপজেলা পর্যায়ে কমিটি দিয়ে অনুমতি নিয়ে কৃষকদের তালিকা সংশ্লিষ্ট খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দফতরে পাঠানো হয়েছে। প্রায় ৫ লাখ কৃষকের মধ্য থেকে তাদের নির্বাচন করা হয়েছে।
যোগাযোগ করা হলে জেলার ভারপ্রাপ্ত খাদ্য কর্মকর্তা লিয়াকত আলী বলেন, ‘সরকারিভাবে গত ২৫ এপ্রিল থেকে বোরো ধান সংগ্রহ অভিযান শুরু করেছে খাদ্য বিভাগ। গত দুই মাস ধরে ধান ক্রয় হয়েছে ২২২১ দশমিক ৪৪০ টন।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, তালিকা সংগ্রহে সমস্যা, কৃষকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট না থাকায় ও গুদামে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় ধান কেনার কার্যক্রম গতি পাচ্ছে না।
তিনি বলেন, খাদ্য গুদামে যথেষ্ট খাদ্যশস্য স্টক রয়েছে। শিগগিরই টিআর, কাবিখা, ভিজিডির মাল বেরিয়ে যাবে। আবার ধান ক্রয় শুরু করে আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সম্ভব হবে।








