বঙ্গোপসাগর পাড়ের সুন্দরবনের দুবলার চরে মৎস্য আহরণ ও শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণ মৌসুমকে সামনে রেখে জেলেরা সমুদ্রযাত্রার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। ৩০ অক্টোবর (বুধবার) পর্যন্ত ইলিশ আহরণ ও সুন্দরবনে সব ধরনের মাছ আহরণের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হওয়ার পরই বৃহস্পতিবার (৩১ অক্টোবর) ভোর থেকে হাজার হাজার জেলে দুবলার চরে যাওয়ার উদ্দেশে রওনা হবেন। এরইমধ্যে জেলেরা দুবলার চরে যাওয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। মঙ্গলবার বিকেল থেকেই জেলেরা মোংলার পশুর নদীর চিলা খাল এলাকায় অবস্থান করছেন। তাদের মধ্যে কোনও কোনও দল বুধবার রাতে আবার কেউ বৃহস্পতিবার ভোরে সমুদ্রে যাত্রা করবেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ অর্থাৎ ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসসহ ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা মাথায় নিয়েই জেলেরা জাল-নৌকা ও শুঁটকি তৈরির উপকরণ নিয়ে দুর্গম চরাঞ্চল ও গভীর সমুদ্রের উদ্দেশে রওনা হবেন।
বনবিভাগ জানায়, জেলেদের জন্য এবার দুবলার চরে অস্থায়ীভাবে সহস্রাধিক জেলে ঘর ও জেলে-মহাজনদের জন্য অর্ধশত ডিপো ঘর স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হবে। ২৮ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১২ ফুট প্রস্থ নির্ধারণ করে ঘরের মাপ ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে বড় আকারে ঘর তৈরি করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে বনবিভাগ।
বহু বছর ধরে অক্টোবর মাসেই জেলেদের মৎস্য আহরণ ও শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণ মৌসুম শুরু হয়। এবার ৭ অক্টোবর থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত ইলিশসহ সব ধরনের মৎস্য আহরণ নিষিদ্ধ থাকায় ৩১ অক্টোবর ভোর থেকে এ মৌসুম শুরু হবে। আগামী মার্চ মাস পর্যন্ত মোংলা, রামপাল, খুলনা, সাতক্ষীরা, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী ও বরিশালসহ সুন্দরবন উপকূলের কয়েক হাজার জেলে দুবলার চরে অস্থায়ী বসতি গড়ে তুলবেন। এসব ছাড়াও বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের জেলে ও মৎস্যজীবীরাও আসবেন এ চরে।
মৎস্যজীবীদের বড় সংগঠন ‘দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপে’র সাধারণ সম্পাদক কামাল উদ্দিন আহমেদ জানান, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষয়ক্ষতিসহ অজানা আতঙ্ক মাথায় নিয়ে উপকূলীয় অঞ্চলের মৌসুমি জেলেরা দুবলার চরে যাবেন। তাই জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি অনুরোধ জানান।
জেলে ও মহাজন সূত্রে জানা গেছে, সমুদ্রে মৎস্য আহরণ ও শুঁটকি মৌসুমকে ঘিরে এ বছরও সুন্দরবনের দুবলার চর, মেহেরআলীর চর, আলোরকোল, অফিসকিল্লা, মাঝেরকিল্লা, শেলার চর ও নারকেলবাড়িয়ার চরে সমবেত হবেন হাজার হাজার জেলে-মহাজন। সাগর পাড় এবং সুন্দরবনের অভ্যন্তরে ৮টি চরের মৎস্য আহরণ, শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণ ও বাজারজাতকরণকে কেন্দ্র করে এ দুবলা জেলে পল্লি। দুবলা জেলে পল্লির জেলেরা নিজেদের থাকা, মাছ ধরার সরঞ্জাম রাখা ও শুঁটকি তৈরির জন্য অস্থায়ী ডিপো ঘর ও মাচা তৈরি করে থাকেন। জেলেরা সমুদ্র মোহনায় বেহুন্দীসহ বিভিন্ন প্রকার জাল দিয়ে মাছ ধরে তা বাছাই করে শুঁটকি করে থাকেন। পরে সেই শুঁটকি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমনকি বিদেশেও বাজারজাতকরণ করা হয়।
পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, শুরু হতে যাওয়া শুঁটকি মৌসুমে দুবলার চরে অবস্থানরত জেলেরা ঘর তৈরিসহ জ্বালানি হিসেবে সুন্দরবনের গাছ ব্যবহার করতে পারবেন না। সব কাঠ তাদের সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হবে। গত শুঁটকি মৌসুমেও সুন্দরবনের গাছ ব্যবহার করতে দেওয়া হয়নি। যারা এ আইন অমান্য করবেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি। এছাড়া জেলে ও মৎস্যজীবীরা পাস-পারমিট ছাড়া সুন্দরবনে অবৈধ অনুপ্রবেশ করলে তাদের বিরুদ্ধেও সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শুঁটকি মৌসুমকে ঘিরে রাজস্ব আদায়ে যাতে কোনও ধরনের অনিয়ম না হয়, সেজন্য আগেভাগেই নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে বন বিভাগ।







