দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকার মানুষ সবসময় প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে তাদের সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়। ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’র সম্ভাব্য আঘাত হানার খবরে গোটা উপকূলজুড়ে আতঙ্কজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মাত্র এক বছর আগে ঘটে যাওয়া আম্পানের ধকল কাটিয়ে ওঠার আগেই আবারও একটি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের আগমনী বার্তায় স্থানীয়দের মধ্যে রীতিমত ভীতিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে টেকসইভাবে সংস্কারের অভাবে থাকা জীর্ণশীর্ণ উপকূল রক্ষা বাঁধের করুন অবস্থা উপকূলবাসীকে সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে।
আম্পানের পরে শ্যামনগর উপজেলায় বেড়িবাঁধের ৪৩টি পয়েন্ট ও আশাশুনি উপজেলার ১৬ পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ। নদীতে একটু পানি বৃদ্ধি পেলেই এসব বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হতে পারে। এ ছাড়া ব্যবহার উপযোগী পানীয় জলের তীব্র সংকটের পাশাপাশি আম্পানের আঘাতে বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি এখনও পরিপূর্ণভাবে মেরামত করতে না পারায় চরম উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন তারা।
প্রতিবছর একেক সময় একেক রকম দুর্যোগের সম্মুখীন হতে হয়। কখনও ঝড় আবার কখনও নদীর বেড়ি বাঁধ ভেঙে পানিতে প্লাবিত হয়। কখনও বন্যায় প্লাবিত হয়। সম্প্রতি সবচেয়ে বড় দুর্যোগ বলে ধরা হয় নদী ভাঙন’কে। এ নদী ভাঙন যেন উপকূলের মানুষের পিছু ছাড়ছে না।
তবে নদী ভাঙনের জন্য সরকারি অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেন উপকূলের মানুষ। গত বছর আম্পান ঝড়ের পরে উপকূলের মানুষের যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয় সেগুলো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তার উপর আবার বড় ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসার পূর্বাভাস শোনা যাচ্ছে। যদি এ ইয়াস নামের ঝড় এলাকা দিয়ে বয়ে যায় তাহলে উপকূলের মানুষের চরম দুর্ভোগ নেমে আসবে।
উপকূলের মানুষের এ ধরনের দুর্যোগ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় হল টেকসই বেড়ি বাঁধ নির্মাণ। কিন্তু আম্পানের পরে এলাকায় বেড়িবাঁধের ৪৩টি পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ। খুব দ্রুত যদি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোর সংস্কার কাজ না করা যায়, তাহলে যে ঝড় আসছে তাতে আবারও উপকূলের মানুষ তাদের সর্বস্ব হারাবে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানের মধ্যে মুন্সীগঞ্জে ৭টি, বুড়িগোয়ালীনিতে ৮টি, গাবুরায় ১৪টি, পদ্মপকুরে ৮টি, কাশিমাড়িতে ৩টি, ও আটুলিয়ায় ৩টি পয়েন্ট রয়েছে।
হরিনগর সিংহড়তলী গ্রামের বিশ্বজিত রায় বলেন, আম্পানের পরে সিংহড়তলীর ভাঙন দেখা দেয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকদের বলার পরেও তারা কাজ করেনি। সামনে যে ইয়াস ঝড় আসছে সে ভয়ে আতঙ্কে আছি। যদি বাঁধ ভেঙে যায় তাহলে আমাদের সব ধ্বংস হয়ে যাবে।
বুড়িগোয়ালীনির দূর্গাবাটি গ্রামের দিনেশ মণ্ডল ও রতি রাণী বলেন, আম্পানের সময় বাঁধ ভেঙে ঘর-বাড়িতে পানি উঠে গাছপালা নষ্ট হয়ে গেছে। আবার শুনছি নতুন করে ইয়াস নামের ঝড় আসবে। আমাদের ওয়াপদার রাস্তাগুলো ঠিক করে দিলে আর পানিতে ভাসতাম না। এবার যদি পানি ঢোকে তাহলে কোথায় যাব?
মুন্সীগঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কাশেম মোড়ল বলেন, মুন্সীগঞ্জে ৭টি পয়েন্ট খুব ঝুঁকিপূর্ণ। আমি বার বার পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বলার পরেও তারা কাজ করছে না। সামনে ইয়াস নামের যে ঝড় আসছে এই ঝড়ে অনেক জায়গা ভাঙার আশঙ্কা আছে।
জেলা পরিষদের সদস্য ডালিম ঘরামী বলেন, আম্পানের রেশ কাটতে না কাটতে আবার ইয়াস নামের ঝড়ের পূর্বাভাস শোনা যাচ্ছে। উপকূলীয় এলাকা নদী বেষ্টিত। এখানে ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধের কারণে প্রতিনিয়ত দুর্যোগের সম্মুখীন হতে হয়। সরকারি মহল থেকে বার বার আশ্বাস প্রধান করলেও তা বাস্তবায়ন করতে দেখা যায় না। যে কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসলে আতঙ্কিত থাকি।
বুড়িগোয়ালীনি ইউপি চেয়ারম্যান ভবতোষ কুমার মণ্ডল বলেন, আমার ইউনিয়নে ৮টি ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট আছে। কিছু কিছু পয়েন্ট পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজন কাজ করেছে। ইয়াস ঝড়ের জন্য আমাদের পরিষদে কিছুটা প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আ ন ম আবুজার গিফারী বলেন, ইয়াস ঝড়ের জন্য আমাদের সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলোতে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের শ্যামনগর উপজেলা উপ-সহকারী প্রকৌশলী মাসুদ রানা বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে কাজ শুরু করে দিয়েছি। বাকি স্থানগুলোর জন্য সবসময় খোঁজ নিচ্ছি।
আশাশুনি উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান অসীম বরণ চক্রবর্তী বলেন, আম্পানের ক্ষত এখন কাটিয়ে উঠতে পারেনি উপকূলবাসী এর মধ্যে আবারও খারাপ খবর। এই অঞ্চলে ঝড়ের চেয়ে জলোচ্ছ্বাসে বাঁধ ভেঙে বেশি ক্ষতি হয়। এবার আশাশুনির ১৬টি পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ।
উল্লেখ্য, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপটি ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়ে আগামী ২৬ তারিখ সন্ধ্যার দিকে ভারত-বাংলাদেশের সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকা অতিক্রমের বার্তা দিচ্ছে আবহাওয়া অধিদফতর। ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বপ্রস্তুতির অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে উপকূলীয় জনপদে কর্মরত পাউবো, বিদ্যুৎ ও সিপিপি’র মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবায় যুক্ত সকলকে সর্বোচ্চ সতর্কতায় থাকতে বলা হয়েছে।









