X
রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২
৯ আশ্বিন ১৪২৯

পানির চাপ বাড়লেই ভাঙছে ৩৫০ কোটি টাকার বেড়িবাঁধ

হেদায়েৎ হোসেন
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, ২৩:৫৯আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৯:০৪

খুলনার দাকোপ উপজেলার দুটি বাঁধে (৩২ ও ৩৩ নং পোল্ডার) ভাঙন শুরু হয়েছে। গত ৩০ জুন দুটি বাঁধের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। তিন মাস না যেতেই পানির চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙছে নতুন বাঁধ দুটি। আগস্টে ৩২ নম্বর পোল্ডারের একাধিক জায়গা ধসে গেছে। এতে ঝুঁকিতে রয়েছে আরও পাঁচটি এলাকা। ১৫ সেপ্টেম্বর চুনকুড়ি খেয়াঘাটের পাশে ৩৩ নং বাঁধের ১০০ মিটার নদীতে ধসে যায়। এতে দোকানপাটসহ বেশ কিছু ঘর চুনকুড়িতে ভেসে গেছে।

বিশ্বব্যাংকের ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাঁধের বিভিন্ন এলাকায় ভাঙন দেখা দেওয়ায় টনক নড়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের। বাঁধের ভাঙন ঠেকাতে এখন নদীশাসনের নতুন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। ভাঙনকবলিত সাত কিলোমিটার অংশে নদী শাসন করতে ১৫২ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রকল্প যতো বড়, সেই হিসাবে কাজ ততো ভালো হয়নি। বেশিরভাগ স্থানে পুরোনো বাঁধের ওপর মাটি দিয়ে নতুন বাঁধ তৈরি করা হয়েছে। প্রকল্পের কাজ চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পেলেও প্রায় এলাকায় কাজ শেষ করেছেন তাদের নিয়োগ করা দেশীয় উপঠিকাদাররা। কাজেও মনিটরিং ব্যবস্থা ছিল দুর্বল। এতো টাকার প্রকল্প গ্রহণের আগে নদীভাঙনের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। খরস্রোতা নদীগুলো শাসন না করে বাঁধ নির্মাণ করার কারণে তা টেকসই হচ্ছে না।

জানা যায়, উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্প (সিইআইপি) ফেজ-১ নামের এই প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রকল্পের আওতায় ৩ হাজার ২৮০ কোটি টাকা দিয়ে ১৭টি বাঁধ (পোল্ডার) নির্মাণ করা হয়েছে। এর আওতায় খুলনার দাকোপ উপজেলার ৩২ নং পোল্ডারে ৪৯ দশমিক ৬৬ কিলোমিটার এবং ৩৩ নং পোল্ডারে প্রায় ৫০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। ২০১৭ সালে শুরু হওয়ায় এই কাজ শেষ হয়েছে গত ৩০ জুন। খুলনার অংশে প্রকল্প ব্যয় প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা। বাঁধ নির্মাণ ছাড়াও প্রকল্পের আওতায় ৩২ নং পোল্ডারে ১৫টি কালভার্ট ও স্লুইসগেট নির্মাণ, ৩ দশমিক ৩০০ কিলোমিটার বাঁধের ঢাল সংরক্ষণ, ১৭ কিলোমিটার খাল খনন এবং ২ কিলোমিটার নদী শাসন করা হয়। ৩৩ নং পোল্ডারে বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি ৬২ কিলোমিটার খাল খনন, ২১টি কালভার্ট ও স্লুইসগেট, ৪ কিলোমিটার ঢাল সংরক্ষণ এবং ১ দশমিক ৩০০ কিলোমিটার নদী শাসন করা হয়।

গুনারী গ্রামের বাঁধে ফাটল দেখা দিয়েছে। যেকোনও সময় ধসে যেতে পারে

স্থানীয় ব্যক্তিরা জানান, গত ২৪ আগস্ট গুনারী কালিবাড়ি অংশে ৫০ মিটার বাঁধ ধসে যায়। এর আগে ধসে গেছে পাশের ১০০ মিটারের বিভিন্ন অংশ। ধসে যাওয়া বাঁধের অংশের দুই পাশে মাটিতে বড় ধরনের ফাটল ধরেছে। ভাঙন ধরেছে গুনারী, কালীবাড়ী, নলিয়ান, জালিয়াখালী, কালাবগী, সুতারখালী, কামারখোলা জোড়াগেট এলাকায়। কাজ চলাকালে গত বছর কালাবাগী গ্রামের বৃহস্পতি বাজারের কিছুটা উত্তর দিকে বাউলি বাড়ির সামনে বাঁধের ৫০ থেকে ৬০ হাত সুতারখালী নদীতে বিলীন হয়ে যায়।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর ৩৩ নং পোল্ডারেও ভাঙন শুরু হয়েছে। বাজুয়া ইউনিয়নের চুনকুড়ি খেয়াঘাটের পাশে ১০০ মিটার বাঁধ নদীতে ধসে যায়। সুতারখালী ইউনিয়নের তেলিখালী স্থানে ভরা জোয়ারে বাঁধের চার-পাঁচ ফুট পর্যন্ত পানি উঠে যায়। নতুন এ দুটি বাঁধের বেশি ভেঙেছে ৩২ নম্বর পোল্ডার। এই বাঁধের ভেতরে সুতারখালী ও কামারখোলা ইউনিয়নের প্রায় ৬০ হাজার মানুষের বসবাস। ইউনিয়ন দুটি চারপাশেই খরস্রোতা শিবসা, ভদ্রা, ঢাকী ও সুতারখালী নদী।

সুতারখালী পূর্বপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি নিরেন্দু মন্ডল বলেন, ‘বেড়িবাঁধের কাজ শুরু হলে এলাকার মানুষ আশায় বুক বেঁধেছিলাম। কিন্তু কাজ শুরুর পর আমরা হতাশ হয়েছি। কিছু এলাকায় ভালো কাজ হয়েছে, কিছু এলাকায় যাচ্ছেতাই কাজ হয়। আমার বাড়ির সামনেই পুরাতন বাঁধের দুপাশে মাটি দিয়ে কোনো রকম কাজ করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তেলিখালী বাজারের সামনে বালু দিয়ে বাঁধ নির্মাণ করেছে। প্রতিবাদ করায় আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের জানিয়েও কাজ হয়নি।’

দাকোপের গুনারী গ্রামের কালিবাড়ি এলাকায় ৫০ মিটার অংশ নদীওেত ধসে যায়

দাকোপ উপজেলার গুনারী শীতল চন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আদিত্য নারায়ণ সরদার বলেন, ‘নতুন এই বাঁধ নিয়ে সবারই স্বপ্ন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কাজ শুরুর সময়ই নদীশাসনের দাবিতে আন্দোলন করেছি। কোটি কোটি টাকা খরচের পর সেই টাকা পানিতে চলে যাচ্ছে। নদীশাসন না করলে যতো টাকাই খরচ করুক, বাঁধ টেকানো যাবে না।’

সুতারখালী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মাসুম আলী ফকির বলেন, ‘বাঁধে ধস লাগলে পাউবো কর্মকর্তাদের খবর দিই। কালিবাড়ি এলাকায় বাঁধ ধসার খবর আগে জানিয়েছি। কিন্তু তারা গুরুত্ব দেয়নি।’

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল আলম জানান, এ অঞ্চলের নদীর গতিপ্রকৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রকল্পের সমীক্ষা করা হয়েছিল ২০১২-১৩ অর্থবছরে। ওই সময়ের নদীর গতিপ্রকৃতির সঙ্গে বর্তমানের কোনও মিল নেই। কাজ শুরুর সময় এসব এলাকায় ভাঙনের কোনও লক্ষণ ছিল না। নদীর স্রোত দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে, যে কারণে নতুন নতুন এলাকায় ভাঙন বাড়ছে।

তিনি আরও জানান, কাজ চলা অবস্থায় ভাঙন দেখেই দুটি পোল্ডারের প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার এলাকায় নদী শাসন করা হয়েছে। নতুন করে আরও সাত কিলোমিটার এলাকায় তীর সংরক্ষণের জন্য ১৫২ কোটি টাকার প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে। আপাতত ভাঙনকবলিত এলাকায় বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চলছে। সার্বিক পরিস্থিতি বোর্ডকে জানানো হচ্ছে।

/এনএআর/
সম্পর্কিত
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পরীক্ষায় বসে ফেসবুকে লাইভ, দুই শিক্ষার্থী বহিষ্কার
পরীক্ষায় বসে ফেসবুকে লাইভ, দুই শিক্ষার্থী বহিষ্কার
দুই গ্রুপের কোন্দলে মধ্যরাতে উত্তপ্ত ইডেন কলেজ
দুই গ্রুপের কোন্দলে মধ্যরাতে উত্তপ্ত ইডেন কলেজ
রামনাথ বিশ্বাসের বসতভিটা পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণে ১০০ নাগরিকের বিবৃতি
রামনাথ বিশ্বাসের বসতভিটা পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণে ১০০ নাগরিকের বিবৃতি
এতদিন কোথায় ছিলেন রহিমা?
এতদিন কোথায় ছিলেন রহিমা?
এ বিভাগের সর্বশেষ
পরীক্ষায় বসে ফেসবুকে লাইভ, দুই শিক্ষার্থী বহিষ্কার
পরীক্ষায় বসে ফেসবুকে লাইভ, দুই শিক্ষার্থী বহিষ্কার
এতদিন কোথায় ছিলেন রহিমা?
এতদিন কোথায় ছিলেন রহিমা?
‘আমার মাকে পেয়ে গেছি’
‘আমার মাকে পেয়ে গেছি’
খুলনার নিখোঁজ সেই রহিমা ফরিদপুরে জীবিত উদ্ধার
খুলনার নিখোঁজ সেই রহিমা ফরিদপুরে জীবিত উদ্ধার
ছাত্রলীগ নেতার মৃত্যু, চেয়ারম্যান আসাদকে আ.লীগ থেকে বহিষ্কার
ছাত্রলীগ নেতার মৃত্যু, চেয়ারম্যান আসাদকে আ.লীগ থেকে বহিষ্কার