খুলনা মেডিক্যাল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা ৫০০। তবে হাসপাতালে প্রতিদিনই ভর্তি রোগী থাকছে প্রায় তিন গুণ। প্রয়োজনের তুলনায় কম শয্যা থাকলেও রোগীদের বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে এ হাসপাতালকে। চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি ও জনবল সংকটও প্রকট। ফলে রোগীদের পড়তে হচ্ছে চরম ভোগান্তিতে।
সড়ক দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন আবু সাইদ। বেড না পেয়ে হাসপাতালের মেঝেতে সিঁড়ির নিচের জায়গায় মাদুর পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। সাইদের বাবা মুনসুর বলেন, ‘রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি নসিমন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে সাইদের গায়ে পড়ে। এতে সাইদ মাথায় আঘাত পায়। এখানে নিউরো ডাক্তার দেখছেন। হাসপাতালে কোনও বেড ফাঁকা নেই। রোগীরা বাধ্য হয়ে মেঝেতে থাকছে। অন্য কোথাও জায়গা না পেয়ে সিঁড়ির নিচে থাকছি।’
রোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীরা সময়মত ডাক্তার পান না। কখনও কখনও কক্ষে নার্স বা ডাক্তার থাকেন না।
এই হাসপাতালে আসা কারীমা আক্তারও বেড পাননি। থাকছেন নিচতলার মেঝেতে। তার খালা আনজিরা বেগম বলেন, ‘এখানে মেয়েকে আনার পর ডাক্তার পেতে ৩ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়।’
খুমেক হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার আতাউর রহমান বলেন, ‘এখানে প্রতিদিনই ১২০০ থেকে ১৪০০ রোগী ভর্তি থাকেন। বৃহস্পতিবার এখানে ১৩০০ ও শুক্রবার ১২০০ রোগী ভর্তি ছিলেন। বিছানা নেই জানানোর পরও রোগীকে নিয়ে মেঝেতে থেকে চিকিৎসা করান স্বজনরা। এছাড়া আউটডোর বিভাগে দেড় হাজার থেকে দুই হাজার রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।’
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, খুলনা বিভাগের ১০টি জেলার রোগীদের চিকিৎসার জন্য এ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ফলে এখানে রোগীর চাপ বেশি। হাসপাতালে চিকিৎসকের ২৮৮টি পদের মধ্যে ৮১টি শূন্য রয়েছে। তত্ত্বাবধায়কের পদও শূন্য। আটটি পদের বিপরীতে পাঁচ জন সিনিয়র কনসালটেন্ট, ৪৪টি পদের বিপরীতে ৩১ জন রেজিস্ট্রার এবং ৯১টি পদের বিপরীতে ৬৩ জন ডেপুটি রেজিস্ট্রার রয়েছেন।
হাসপাতালে এখন ৫৫টি পদের বিপরীতে ৪৩ জন ইনডোর কর্মকর্তা, ৩৬টি পদের বিপরীতে ২৯ জন আউটডোর কর্মকর্তা এবং ছয়টি পদের বিপরীতে চারজন জরুরি কর্মকর্তা রয়েছেন। বর্তমানে এখানে ১৬টি বিভাগের অধীনে ৩১টি ওয়ার্ডে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। অ্যানেসথেসিয়া বিভাগে ৩৮টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন পাঁচজন চিকিৎসক। হাসপাতালে ১০টি পদের বিপরীতে দুজন অপারেশন থিয়েটার অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট নিয়োগ করা হয়েছে। ছয়টি পদ থাকা সত্ত্বেও হাসপাতালে নেই কোনো আইসিইউ অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট।
এ হাসপাতালে দুটি অপারেশন থিয়েটার রয়েছে। একটি জরুরি রোগীদের জন্য এবং অন্যটি সাধারণ রোগীদের জন্য। হাসপাতালের দুটি অপারেশন থিয়েটারের পাঁচটি বেডে গড়ে প্রতিদিন ২৭ জন রোগীর অস্ত্রোপচার হয়।
রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগের দুটি সিটিস্ক্যান মেশিনের মধ্যে একটি, এক্স-রে মেশিন এবং ছয়টি আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিনের মধ্যে দুটি কাজ করছে না। এছাড়া রেডিওথেরাপি বিভাগের রেডিয়েশন থেরাপি মেশিন প্রায় এক দশক ধরে অব্যবহৃত পড়ে আছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপন না হওয়ায় খুলনা অঞ্চলের ক্যান্সার রোগীরা হাসপাতালে যথাযথ চিকিৎসা পাচ্ছেন না।
হাসপাতালের রেডিওথেরাপি ও অনকোলজি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর প্রায় ১ হাজার ৬০০ ক্যান্সার রোগী সেখানে চিকিৎসা নিলেও তাদের কেউই রেডিওথেরাপি পাননি।
জানা গেছে, রেডিওথেরাপি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মুকিতুল হুদা বলেন, ‘ক্যান্সার রোগীরা তিন ধরনের চিকিৎসা পান- কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি এবং সার্জারি। হাসপাতালে রোগীরা কেমোথেরাপি ও সার্জারি করতে পারেন। আমরা রেডিওথেরাপি দিতে পারি না। রেডিওথেরাপির জন্য একটি মেশিন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু জায়গার অভাবে সেটিকে বাক্সের বাইরেও আনতে পারিনি। ফলে যেসব রোগীদের রেডিওথেরাপির প্রয়োজন তাদের ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে।’
খুমেক হাসপাতালের পরিচালক ডা. রবিউল হাসান বলেন, ‘হাসপাতালে মাত্র ৫০০ শয্যা আছে। কিন্তু এখানে প্রায় দেড় হাজার রোগী ভর্তি আছেন। ফলে হাসপাতালের বারান্দাসহ কোথাও জায়গা খালি নেই। এতো বিপুল সংখ্যক রোগীর চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক নেই।’
তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগের নতুন ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। ভবনটি তৈরি হলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পর্যাপ্ত জনবল ও যন্ত্রপাতি দেবে। হাসপাতালের রোগীদের তখন ঢাকায় পাঠানো হবে না।’
উল্লেখ্য, ১৯৮৯ সালে মহানগরীর বয়রা এলাকায় ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট খুলনা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা হয়। ১৯৯২ সালে এটি খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে উন্নীত হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ২০০৮ সালে হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা বাড়িয়ে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করে।









