যশোরের ছয়টি আসনের এক তৃতীয়াংশ প্রার্থী অপরিচিত মুখ। এসব প্রার্থীর পোস্টার দেখলেও তাদের চেনেন না সংসদীয় আসনের ভোটাররা। অনেকেই জানেন না তাদের আসনে কত জন প্রার্থী। তাদের বেশিরভাগ প্রার্থী এলাকায় প্রচারণা চালাননি। এমনও প্রার্থী আছেন, যাদের দেখেননি বলে জানালেন ভোটাররা।
ঝিকরগাছার পৌর শহরের দক্ষিণের একটি গ্রাম বড় কলসি। উপজেলার বাঁকড়া ইউনিয়নের গ্রামটির বাজারে অবস্থিত আমজাদ টি স্টল। সোমবার (০৯ ফেব্রুয়ারি) বিকালে দোকানটিতে সাত-আট জন বসে ছিলেন। কেউ চায়ের অর্ডার দিয়ে বসে আছেন; কেউ চা পান করছেন। আবার কেউ নির্বাচন নিয়ে কথা বলছেন। মাঝেমধ্যে দোকানের ভেতরে থাকা টেলিভিশনের দিকে তাকাচ্ছেন। খবর শুনছেন, আলোচনাও করছেন।
এর মধ্যে একজন বলে উঠলেন, ‘আমাগের আসনে প্রার্থী কয়ডা?’ একজন জবাবে বললেন, ‘দাঁড়িপাল্লা, ধানের শীষ ছাড়া তো কাউরে দেখি নে।’ আরেকজন বললেন, ‘কেন লাঙ্গলও তো আছে।’ এর জবাবে পাশ থেকে আরেকজন বললেন, ‘দাঁড়িপাল্লা আর ধানের শীষের প্রার্থী ছাড়া তো কাউরে চিনি নে। পোস্টার না থাকায় তো অন্য কাউরে চিনতে পারতিছিনে।’
শুধু চায়ের দোকানে উপস্থিত এসব ভোটারই নন, এই চিত্র পুরো নির্বাচনি এলাকায়। ঝিকরগাছার ও চৌগাছা উপজেলা নিয়ে যশোর-২ আসন গঠিত। আসনটিতে আট জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ভোটারদের কাছে জামায়াত ও বিএনপির প্রার্থী ছাড়া বাকি ছয় জনই অপরিচিত। পাশাপাশি ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জেলার বাকি পাঁচটি আসনেও একই তথ্য পাওয়া গেছে। সর্বমোট ৩৭ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ১৩ প্রার্থীকে চেনেনই না ভোটাররা। অনেক ভোটার এসব প্রার্থীকে প্রচারে দেখেননি। কারও নির্বাচনি অফিসও নেই।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সচেতন নাগরিক কমিটির যশোরের সভাপতি পাভেল চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যশোরে এক-তৃতীয়াংশ প্রার্থী অপরিচিত। অনেকেই প্রার্থী হয়েছেন নামকাওয়াস্তে। এসব প্রার্থীর সাধারণ দুটি উদ্দেশ্য থাকে; একটি অসৎ; অন্যটি পরিচিত হওয়া। আবেগে প্ররোচিত হয়েও অনেকেই প্রার্থী হন। তাছাড়া এবার পোস্টার না থাকায় অপরিচিত প্রার্থীদের চিনতেও পারছেন না ভোটাররা।’
যশোর-১ আসনে নির্বাচন করছেন চার জন। বিএনপির নুরুজ্জামান, জামায়াতের আজীজুর রহমানের চলছে জমজমাট প্রচারণা। শার্শাবাসী এই দুজনকে মাঠে দেখলেও জাতীয় পার্টির জাহাঙ্গীর আলম চঞ্চল ও ইসলামী আন্দোলনের বক্তিয়ার রহমানকে মাঠে তেমন দেখা যায়নি। এ জন্য অধিকাংশ ভোটার তাদের চেনেন না।
প্রচারণার মাঠে থাকার বিষয়ে জাতীয় পার্টির প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম চঞ্চল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের কর্মী-সমর্থক কম। যতটুকু পারছি প্রচারণা চালাচ্ছি। আবার সব এলাকায় যাওয়ার সময় পাইনি।’
যশোর-২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আট প্রার্থী। এর মধ্যে প্রচারণায় মাঠ সরগরম রেখেছেন বিএনপির সাবিরা সুলতানা ও জামায়াতের মোহাম্মদ মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ। প্রচারণায় দুইপক্ষের কর্মীদের মধ্যে পাল্টাপালি হামলাসহ নানা অভিযোগের ঘটনা ঘটেছে। শেষ পর্যন্ত দুই জনই ভোটারদের নজরে আছেন।
তবে বাকি ছয় জন অর্থাৎ- ইসলামী আন্দোলনের ইদ্রিস আলী, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) ইমরান খান, বিএনপির বিদ্রোহী জহুরুল হক, স্বতন্ত্র মেহেদী হাসান, বিএনএফের শামছুল হক ও এবি পার্টির রিপন মাহমুদকে প্রচারণার মাঠে তেমন দেখা যায়নি। তবে বিদ্রোহী প্রার্থী বিএনপি নেতা জহুরুল হক বিএনপির প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। এ জন্য প্রচারণা চালাননি তিনি।
আসনটির ভোটাররা বলছেন, এই ছয় প্রার্থীকে চেনেন না অধিকাংশ ভোটার। তাদের পোস্টারও দেখেননি। এ জন্য চেনেন না। বাড়িতে বাড়িতে ভোট চাইতেও যাননি তারা। ফলে মূল প্রার্থী বিএনপি ও জামায়াতের।
যশোর-৩ (সদর) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ছয় জন। এর মধ্যে বিএনপির অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, জামায়াতের আব্দুল কাদের, ইসলামী আন্দোলনের শোয়াইব হোসেন, কমিউনিস্ট পার্টির রাশেদ খানকে প্রচারণার মাঠে দেখা গেছে। তবে জাতীয় পার্টির খবির গাজী, জাগপার নিজামউদ্দিন অমিত শহরের মাঝে মধ্যে প্রচরণা চালালেও শহরের বাইরে যাননি। এ জন্য ভোটাররা তাদের চেনেন না। নির্বাচনি অফিসও নেই তাদের।
যশোর-৪ আসনে আট জন প্রার্থী হয়েছেন। ভোটারদের কাছে পরিচিত মুখ বিএনপির মতিয়ার ফারাজী ও জামায়াতের গোলাম রসুল। মাঝে মধ্যে ইসলামী আন্দোলনের বায়েজিদ হোসাইন প্রচারণা চালিয়েছেন। তবে মাঠে দেখা যায়নি খেলাফত মজলিসের আলেক এলাহী, জাতীয় পার্টির জহুরুল হক, বিএমজেপির সুকৃতি মণ্ডলকে। এসব প্রার্থীর নিজ গ্রাম ছাড়া অন্যান্য এলাকায় নির্বাচনি অফিস চোখে পড়েনি। আবার সংসদীয় এলাকার সব স্থানে তাদের পোস্টারও নেই। যার কারণে তাদের চিনতে পারছেন না ভোটাররা।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টির (বিএমজেপি) সুকৃতি মণ্ডল বলেন, ‘প্রচারণার মাঠে তেমন একটা যাওয়া হয়নি। এ জন্য সংসদীয় এলাকায় পরিচিত কম। তবে আমার প্রচারণা চলছে।’
যশোর-৫ (মনিরামপুর) ছয় জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাদের মধ্যে ভোটারদের কাছে পরিচিত মুখ জামায়াতের গাজী এনামুল হক, বিএনপির রশীদ আহম্মাদ, স্বতন্ত্র শহীদ ইকবাল। এই তিন প্রার্থীর ত্রিমুখী লড়াই হবে বলছেন ভোটাররা। তাদের বাইরে অন্য প্রার্থীদের তারা চেনেন না। কারণ প্রচারণার মাঠে দেখা যায়নি অন্যদের। এরা হলেন জাতীয় পার্টির এম এ হালিম, স্বতন্ত্র কামরুজ্জামান, ইসলামী আন্দোলনের জয়নাল আবেদীন। এই তিন প্রার্থীর কর্মী সংকট থাকায় সব এলাকায় যেতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন।
যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনে পাঁচ জন প্রার্থী হয়েছেন। প্রচারণায় এগিয়ে আছেন বিএনপির আবুল হোসেন আজাদ ও জামায়াতের মোক্তার আলী। বাকি তিন জন জাতীয় পার্টির জি এম হাসান, এবি পার্টির মাহমুদ হাসান, ইসলামী আন্দোলনের শহিদুল ইসলাম ভোটারদের কাছে অপরিচিত মুখ।
ভোটাররা বলছেন, তাদের চেনেন না। নির্বাচনি অফিসও দেখা যায়নি তাদের। অধিকাংশ ভোটারের বাড়িতে যাননি এসব প্রার্থীর কেউ। তবে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী এবং কর্মীরা তাদের বাড়িতে গেছেন।
সচেতন অনেক ভোটার বলছেন, যারা নির্বাচিত হবেন তারা দেশের জন্য কাজ করবেন। এলাকার উন্নয়ন করবেন। অথচ নির্বাচনে এমন অনেকেই দাঁড়িয়েছেন, যাদের সঙ্গে ভোটারদের পরিচয় ও যোগাযোগ নেই।








