ঝিনাইদহে জামায়াত ও বিএনপির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে নিহত কৃষক দল নেতা তরু মুন্সীর লাশ নিয়ে বিক্ষোভ করেছে বিএনপি। শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঝিনাইদহ মর্গ থেকে লাশ নিয়ে এ বিক্ষোভ করেন দলটির নেতাকর্মীরা। এ সময় লাশ নিয়ে শহর প্রদক্ষিণ শেষে হামদহ মোড়ে সমাবেশ করা হয়।
সেখানে জেলা বিএনপির সভাপতি এম এ মজিদ, সাধারণ সম্পাদক জাহিদুজ্জামান মনা ও দলটির নেতাকর্মী ছাড়াও নিহতের স্বজনরা বক্তব্য রাখেন। সমাবেশে জেলা বিএনপির সভাপতি এম এ মজিদ বলেন, ‘জামায়াত ও শিবিরের নেতাকর্মীরা কৃষক দল নেতা তরু মুন্সীকে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করেছেন। তার মাথায় বাঁশ দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। যে কারণে মৃত্যু হয়েছে। আমরা এই ন্যক্কারজনক হত্যার বিচার চাই।’
সমাবেশে জেলা বিএনপির সহসভাপতি মুন্সী কামাল আজাদ, মুকুল বিশ্বাস, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল মজিদ বিশ্বাস, শাহাজান আলী, আসিফ ইকবাল, সাংগঠনিক সম্পাদক সাজেদুর রহমান, সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন, জেলা যুবদলের সভাপতি আহসান কবির, সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম, জেলা ছাত্রদলের সভাপতি সোমেনুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক মুশফিকুর রহমানসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী এবং নিহতের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
তবে হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা জামায়াতের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়েছে, সংঘর্ষ চলাকালে স্ট্রোক করে তরু মিয়ার মৃত্যু হয়েছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এলে তা নিশ্চিত হবে।
এর আগে শুক্রবার ঝিনাইদহ সদর উপজেলার গান্না ইউনিয়নের মাধবপুর গ্রামে জামায়াতের নারী কর্মীদের একটি সভা করা নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় পক্ষের অন্তত আট জন আহত হন। আহতদের প্রথমে ঝিনাইদহ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে শারীরিক অবস্থা খারাপের দিকে গেলে তরু মুন্সীকে (৪৮) ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিতে বলেন চিকিৎসকরা। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত সাড়ে ৮টার দিকে মৃত্যু হয়।
তরু মুন্সী ঝিনাইদহ সদর উপজেলার মাধবপুর গ্রামের প্রয়াত মনছুর আলী মুন্সির ছেলে এবং গান্না ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড কৃষক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক বলে জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
গান্না ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সরোয়ার হোসেন বলেন, ‘রাতেই তরু মুন্সীর লাশ ঢাকা থেকে নিয়ে আসা হয়। সকালে পুলিশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। মর্গ থেকে নিয়ে জেলা বিএনপির নেতারাসহ সব পর্যায়ের নেতাকর্মী বিক্ষোভ মিছিল করেন। জামায়াতের নারী কর্মীরা তালিমের নামে জান্নাত পাওয়ার কথা বলে নারীদের স্বামীর অবাধ্য করে তুলছেন। এতে অনেক পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি হয়েছে। শনিবার তেমনই এক অনুষ্ঠানের প্রতিবাদ জানান ভুক্তভোগীরা। আর এর প্রতিবাদের নামে জামায়াতের কর্মীরা সংঘর্ষ সৃষ্টি করে তরুকে পিটিয়ে হত্যা করেছেন। আমরা এর বিচার চাই।’
জামায়াতের সংবাদ সম্মেলন
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শহরের হামদহ এলাকায় জেলা জামায়াতের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন দলটির নেতারা। সেখানে জেলা জামায়াতের পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান সদর উপজেলা জামায়াতের আমির মু. হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘তরু মুন্সীর মৃত্যু হয়েছে স্ট্রোকের কারণে। তরু উচ্চ ডায়াবেটিস ও হার্টের রোগী ছিলেন। সংঘর্ষের সময় মারামারি ও রক্তপাত দেখে স্ট্রোক করেন। তার গায়ের কোথাও আঘাতের চিহ্ন নেই।’
মু. হাবিবুর রহমান আরও বলেন, ‘সংঘর্ষের পর গতকাল বিকালে গান্না বাজারে জামায়াতের ছয় নেতাকর্মীর দোকান ভাঙচুর করা হয়েছে। রাতে ইউনিয়নের চণ্ডীপুর এলাকায় জামায়াতের নিরীহ কর্মীদের মারধর ও বাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। কোনও মামলা না হলেও পুলিশ জামায়াতের এক নারী কর্মীসহ চার জনকে আটক করেছে। পুলিশের ভয়ে জামায়াতের নেতাকর্মীরা বাড়িঘরে থাকতে পারছেন না।’
সংবাদ সম্মেলনে জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির মো. আবদুল আলীম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মো. ছগির আহম্মেদ, শহর আমির ইসমাইল হুসাইন, গান্না ইউনিয়ন জামায়াতের আমির জাহাঙ্গীর হোসেন, শহর শিবিরের সভাপতি আল আমিন ও জেলা শিবিরের সভাপতি ওবাইদুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
ঝিনাইদহ জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসক ফারজানা ইয়াসমিন বলেন, ‘তরু মুন্সীকে যখন হাসপাতালে আনা হয়েছিল তখন বমি করছিলেন। তার অবস্থা গুরুতর হওয়ায় দ্রুত ঢাকায় পাঠানো হয়। এখান থেকেই তিনি কোমায় চলে গিয়েছিলেন। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এলেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।’
ঝিনাইদহ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সামসুল আরেফিন বলেন, ‘তরু মুন্সী নিহতের ঘটনায় তার ছেলে মো. শিপন মিয়া বাদী হয়ে থানায় ৫১ জনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা করেছেন। ইতিমধ্যে ওই মামলায় মাধবপুর গ্রামের ফারজেল হোসেনের ছেলে জান্নাতুল ইসলাম (২৪) ও সিরাজুল ইসলামের ছেলে শহিদুল ইসলাম (৫৪) এবং পাইকপাড়া গ্রামের মো. ইউসুফ আলী বিশ্বাসের ছেলে মো. মোকলেচুর রহমানকে (৫৫) গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের আদালতের পাঠানো প্রক্রিয়া চলছে।’









