বাংলাদেশ-ভারতে চলাচল করা বাঘ কীভাবে গণনা করা হয়?

হেদায়েৎ হোসেন, খুলনা
৩০ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩০আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩১

বাংলাদেশ ও ভারতের ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে অবস্থিত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন, যার ৬০ শতাংশ বাংলাদেশে অবস্থিত। ২০২৪ সালের সর্বশেষ বাঘ জরিপে বাংলাদেশের সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১২৫টি, যা ২০১৮ সালের তুলনায় ৯.৬৫ শতাংশ এবং ২০১৫ সালের তুলনায় ১৭.৯২ শতাংশ বেড়েছে। এই হিসাবের বাইরেও ২১টি বাঘের শাবক পাওয়া গেছে, তবে কম বয়সী শাবকদের উচ্চ মৃত্যুহারের কারণে তাদের মূল তালিকায় রাখা হয়নি।

২০০৪ সালে দেশে বাঘের সংখ্যা ছিল ৪৪০টি, যার মধ্যে ১২১টি পুরুষ, ২৯৮টি স্ত্রী এবং ২১টি বাচ্চা ছিল। ২০০৯ সালে ৩০০-৫০০টির বাঘের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল বলে বন অধিদফতর থেকে জানানো হয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে ২০১০ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে দেশে বাঘের সংখ্যা নির্ণয় হয় ২৫০টি। আর ২০১২ সালে ডব্লিউটিপির জরিপে, দেশে এক দশকে বাঘের সংখ্যা ৭০ শতাংশ কমে গেছে বলে জানানো হয়। এরপর ২০১৫ সালের জরিপে বাঘের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় মাত্র ১০৬টিতে।

ভারতের ২০১৯ সালের জরিপ অনুসারে বাঘ আছে ৯৬টি। এ সংখ্যা ২০১৭ সালে ছিল ৮৭। বাংলাদেশের তুলনায় ভারতীয় সুন্দরবন অংশে বাঘ বৃদ্ধির লক্ষ্যে সেখানকার বন বিভাগ অনেক দিন ধরেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ফলে ভারতে বাঘের সংখ্যা বাংলাদেশের তুলনায় দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভারতীয় সুন্দরবনের ভেতর যেসব ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ বসবাস করত, তাদের সরিয়ে অন্যত্র পুনর্বাসন করা হয়েছে। বাঘের বিচরণস্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও জনসাধারণের চলাচল পর্যবেক্ষণ ও সীমিতকরণ নিশ্চিত করা হচ্ছে। এমনকি সুন্দরবনের ভারতীয় অংশের আয়তনও বেড়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে কিছুদিন আগেও সুন্দরবনের গহিনে বনদস্যু ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোলাগুলি ও অপহরণ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল; যদিও তা বর্তমানে অনেকাংশে কমে এসেছে।

কীভাবে বাঘ গণনা করা হয়

বর্তমানে সুন্দরবনে মূলত ক্যামেরা ট্র্যাপিং নামক আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বাঘ গণনা বা শুমারি করা হয়। পূর্বে পাগমার্ক বা বাঘের পায়ের ছাপ গণনা করার সনাতন পদ্ধতি ব্যবহার করা হলেও নির্ভুল ফলাফলের জন্য এখন সম্পূর্ণ প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করা হয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালের বাঘ শুমারিতে এই ক্যামেরা ট্র্যাপিং পদ্ধতির মাধ্যমেই সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে ১২৫টি প্রাপ্তবয়স্ক বাঘের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে।

বাঘ গণনার পুরো প্রক্রিয়া যেভাবে সম্পন্ন হয়

সুন্দরবনকে নির্দিষ্ট বর্গকিলোমিটারের ছোট ছোট ব্লকে বা গ্রিডে ভাগ করা হয়। সর্বশেষ জরিপে বনের ৬০৫টি গ্রিডে মোট ১,২১০টি বিশেষ স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা জোড়ায় জোড়ায় মুখোমুখি স্থাপন করা হয়েছিল। মোশন সেন্সর ও স্বয়ংক্রিয় ছবি ধারণ এই ক্যামেরাগুলোতে বিশেষ মোশন সেন্সর বা গতিবিধি শনাক্তকারী প্রযুক্তি থাকে। ক্যামেরার সামনে দিয়ে বাঘ বা যেকোনো বন্যপ্রাণী হেঁটে গেলেই সেন্সরের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেটির ছবি এবং ছোট ভিডিও ক্লিপ রেকর্ড হয়ে যায়। দিন বা রাত—যেকোনো সময়েই ইনফ্রারেড প্রযুক্তির সাহায্যে এই ক্যামেরাগুলো পরিষ্কার ছবি তুলতে পারে। 

ডোরাকাটা দাগের অনন্যতা বিশ্লেষণ ও মানুষের আঙুলের ছাপ

যেমন একজনের সঙ্গে অন্যজনের আঙুলের ছাপ মেলে না, তেমনি প্রতিটি বাঘের শরীরের ডোরাকাটা দাগের নকশাও সম্পূর্ণ আলাদা এবং অনন্য হয়। ক্যামেরায় ধারণ করা লাখ লাখ ছবি ও ভিডিও উন্নত সফটওয়্যারের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে বাঘের গায়ের এই ডোরাকাটা দাগের প্যাটার্ন মেলানো হয়। এর ফলে একটি বাঘের ছবি বারবার আসলেও সেটিকে আলাদা একটি বাঘ হিসেবে ভুল করার কোনও সুযোগ থাকে না।

তথ্য সংগ্রহের পর বিশেষজ্ঞরা ডাটাবেজে থাকা ছবি ও ভিডিওগুলো কঠোরভাবে নিরীক্ষা করেন। একই সঙ্গে বাঘের ঘনত্ব, প্রধান বিচরণ ক্ষেত্র এবং শাবকদের উপস্থিতিও এই প্রক্রিয়ায় আলাদাভাবে হিসাব করা হয়।

বাংলাদেশ-ভারতে চলাচল করা বাঘ কীভাবে গণনা করা হয়

সুন্দরবনের বাঘ মূলত নদী ও খাঁড়ি সাঁতরে বাংলাদেশ থেকে ভারতের অংশে যাতায়াত করে। বাংলাদেশ ও ভারতের সুন্দরবনের মাঝে কোনও কৃত্রিম বা কাঁটাতারের সীমানা নেই; প্রাকৃতিকভাবেই এরা একটি অবিচ্ছিন্ন ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে ঘুরে বেড়ায়। বাঘেরা তাদের শিকারের সন্ধানে বা নতুন বিচরণ এলাকা (টেরিটরি) খোঁজার জন্য প্রাকৃতিকভাবেই এই জলসীমা অতিক্রম করে। আর প্রতিটি বাঘের শরীরের অনন্য ডোরাকাটা দাগের প্যাটার্ন দেখে ক্যামেরা ট্র্যাপের মাধ্যমে এদের আলাদাভাবে চেনা বা শনাক্ত করা যায়।

সুন্দরবনের বাঘের ভারতে যাওয়া এবং এদের চেনার উপায়গুলো কী

বাংলাদেশ ও ভারতের সুন্দরবন রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত হলেও প্রাকৃতিকভাবে এক। বাঘের জন্য কোনও ভৌগোলিক বাধা বা কাঁটাতার নেই। সুন্দরবনের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগাররা লবণাক্ত পানির পরিবেশে বেঁচে থাকার জন্য বিশেষভাবে অভিযোজিত এবং অত্যন্ত দক্ষ সাঁতারু।

শিকারের খোঁজে বা নিজেদের এলাকা বিস্তারের উদ্দেশ্যে এরা সহজেই নদী বা ছোট ছোট চ্যানেল সাঁতরে এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে, অর্থাৎ বাংলাদেশ অংশ থেকে ভারতীয় অংশে চলে যায়। মানুষের আঙুলের ছাপের মতো প্রতিটি বাঘের শরীরের কালো ডোরাকাটা দাগের প্যাটার্ন সম্পূর্ণ আলাদা। দুটি বাঘের গায়ের দাগ কখনই এক হয় না। 

এ ছাড়া বন বিভাগ বনের বিভিন্ন গাছে স্বয়ংক্রিয় ট্র্যাপ ক্যামেরা বসিয়ে রাখে। বাঘ সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ছবি উঠে যায়। কম্পিউটারে বিশেষ সফটওয়্যারের সাহায্যে বাঘের গায়ের ডোরাকাটা দাগের নকশা বিশ্লেষণ করা হয়। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট বাঘটিকে চিহ্নিত করা হয় এবং সেটি আগে বাংলাদেশের ক্যামেরায় ধরা পড়েছিল কিনা, তা মেলানো সম্ভব হয়। 

এ ছাড়া কাদা মাটিতে বাঘের পায়ের ছাপ বা পাগমার্ক দেখেও বাঘের উপস্থিতি, লিঙ্গ এবং আকার অনুমান করা যায়। আধুনিক গবেষণার অংশ হিসেবে কখনও কখনও বাঘের গলায় স্যাটেলাইট রেডিও কলার পরিয়ে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে জিপিএস ট্র্যাকিং প্রযুক্তির সাহায্যে বাঘটি কখন কোন দেশে অবস্থান করছে, তা একদম নিখুঁতভাবে জানা যায়।

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেএম হাসানুর রহমান বলেন, ‘২০১৮ সালের পর থেকে কোনও বাঘ লোকালয়ে প্রবেশ করেনি। এখন আর পিটিয়ে বাঘ হত্যার খবর পাওয়া যায় না। তবে এগুলো ভারতে যায় আবার আসে এবং সহজে শনাক্ত করা যায়।’

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ২৩ মার্চ ‘সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্প’ শীর্ষক একটি প্রকল্পের অনুমোদন দেয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। যার ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৫ কোটি ৯৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এই প্রকল্পের দুটি অংশ ছিল। যার একটি ছিল বাঘ জরিপ ও অন্যটি বাঘ সংরক্ষণ। চলতি বছরের মার্চে প্রকল্পটি শেষ হয়েছে।

বন বিভাগের তথ্যমতে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে মোট নয়বার সুন্দরবনের বাঘ জরিপ করা হয়েছে। তবে ২০১৫ সালের আগের জরিপগুলোর কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। 

২০১০ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে দেশে বাঘের সংখ্যা নির্ণয় হয় ২৫০টি। আর ২০১২ সালে ডব্লিউটিপির জরিপে, দেশে এক দশকে বাঘের সংখ্যা ৭০ শতাংশ কমে গেছে বলে জানানো হয়। এরপর ২০১৫ সালের জরিপে বাঘের সংখ্যা কমে দাড়ায় মাত্র ১০৬টি।

সুন্দরবন অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, ‘গত পাঁচ-সাত বছরে সুন্দরবনের প্রাণীর পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতিক সময়ে সন্দরবন ঘুরতে যাওয়া পর্যটকরাও বাঘের চলাচল কিংবা নদী পাও হওয়ার চিত্র বেশি দেখতে পাচ্ছেন। পাশাপাশি বাঘ যেসব প্রাণীকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে সেগুলোর পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে।’ 

বাঘ সুরক্ষায় বন অধিদফতর সর্বোচ্চ কার্যক্রম পরিচালনা করছে জানিয়ে বন সংরক্ষক বলেন, ‘বন বিভাগ, পুলিশ, র‌্যাব, কোস্টগার্ড ও নৌ পুলিশ যৌথভাবে বাঘ শিকার প্রতিরোধেও কাজ করছে।’

কীভাবে নিজেদের বাঘ শনাক্ত করা হয়

সুন্দরবন অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সুন্দরবনের ভারত ও বাংলাদেশ অংশের বাঘের আচরণ, কালার বা অন্যভাবে পৃথকভাবে শনাক্তকরণ কোনও চিহ্ন নেই। তবে সুন্দরবনের সীমান্ত এলাকার টেরিটোরিতে থাকা বাঘ আসা যাওয়া করে। এদের আলাদা করে চেনার সুযোগ কম। যদি ওই এলাকায় ক্যামেরা ট্র্যাপিং করে নজরদারি করা হয় তাহলে সহজে চেনা যায়। সেটা আবার কঠিন কাজ।’

 

/এএম/ 
সম্পর্কিত
বনের গল্প, মানুষের স্মৃতি ‘সুন্দরবন সংগ্রহশালা’
বানরের হাত থেকে রেহাই পেতে ডিসির কাছে আবেদন, দু্ই মাসেও কাজ হয়নি
সুন্দরবনের দস্যু ‘নানা ভাই বাহিনীর’ ১২ সদস্যের আত্মসমর্পণ
সর্বশেষ খবর
৩৭ জনের পর হাতিয়ার সেই স্কুলে এবার ৯ শিক্ষার্থী অসুস্থ
৩৭ জনের পর হাতিয়ার সেই স্কুলে এবার ৯ শিক্ষার্থী অসুস্থ
স্কুলে ক্লাস চলাকালে অসুস্থ হয়ে পড়লো ২৫ শিক্ষার্থী, তিন জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক
স্কুলে ক্লাস চলাকালে অসুস্থ হয়ে পড়লো ২৫ শিক্ষার্থী, তিন জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক
অল্প জায়গায় বেশি জিনিস রাখবেন যেভাবে
অল্প জায়গায় বেশি জিনিস রাখবেন যেভাবে
সুইমিংপুলে সাঁতার কাটতে নেমে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মৃত্যু
সুইমিংপুলে সাঁতার কাটতে নেমে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মৃত্যু
সর্বাধিক পঠিত
‘আমি ডিলার, চেয়ারম্যান হলে গাঁজা-ইয়াবা ফ্রি দেবো’
‘আমি ডিলার, চেয়ারম্যান হলে গাঁজা-ইয়াবা ফ্রি দেবো’
একলাফে ইলিশের মণে দাম কমেছে ২০ হাজার টাকা
একলাফে ইলিশের মণে দাম কমেছে ২০ হাজার টাকা
বাংলাদেশিদের জন্য ওয়ার্ক পারমিট ও শ্রম ভিসা বন্ধ করলো এক দেশ
বাংলাদেশিদের জন্য ওয়ার্ক পারমিট ও শ্রম ভিসা বন্ধ করলো এক দেশ
অপু বিশ্বাসকে যে পরামর্শ দিলেন অভিনেত্রী নূতন
অপু বিশ্বাসকে যে পরামর্শ দিলেন অভিনেত্রী নূতন
ঢাকা-কক্সবাজার রুটে বাড়ছে আরেকটি ট্রেন, যেখানে যেখানে থামবে
ঢাকা-কক্সবাজার রুটে বাড়ছে আরেকটি ট্রেন, যেখানে যেখানে থামবে