জামায়াতে ইসলামীর বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য (এমপি) ও শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে একের পর এক নৈতিক স্খলন, স্বজনপ্রীতি ও বিতর্কিত মন্তব্যের অভিযোগ সামনে আসায় দলটির ভেতরে ও বাইরে তীব্র অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। প্রধান বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের সুশৃঙ্খল ও জবাবদিহিতামূলক ভাবমূর্তি তুলে ধরার চেষ্টার মধ্যেই এসব ঘটনা দলটিকে কঠোর জনসমালোচনার মুখে ফেলেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের একটি তরুণীর সঙ্গে আপত্তিকর ব্যক্তিগত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। সংসদে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ওই তরুণীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার এবং ঘটনা ধামাচাপা দিতে তরুণীর পরিবারকে সরকারি ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। সাংগঠনিক তদন্তে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় জামায়াতে ইসলামী তাকে দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে।
গাজী নজরুলের ঘটনার পর জামায়াতের আরেক এমপি শামসুল খালেক এক বক্তব্যে ঘটনাটিকে ‘অনৈতিক নয়, তবে সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেন। এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। পরে তিনি দাবি করেন যে তার বক্তব্য আংশিক ও বিকৃতভাবে প্রচার করা হয়েছে।
এর আগে নড়াইল-২ আসনের জামায়াত সংসদ সদস্য আতাউর রহমান বাচ্চুর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। সংসদ সদস্যের ঐচ্ছিক তহবিলের অনুদানপ্রাপ্তদের সরকারি তালিকায় তিনি নিজের মেয়ের নাম অন্তর্ভুক্ত করেন। এছাড়া ওই তালিকায় তার নিজ ইউনিয়ন ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও সামনে আসে।
দলীয় কয়েকজন নেতা বলছেন, নৈতিক স্খলন, বিতর্কিত বক্তব্য এবং শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের কারণে দলটির দীর্ঘদিনের আদর্শিক ভাবমূর্তি তীব্র সংকটের মুখে পড়েছে। প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর থেকেই দলের জনপ্রতিনিধি ও নেতাদের কর্মকাণ্ড জনসমক্ষে কড়া নজরদারিতে রয়েছে। যার ফলে একের পর এক বিতর্ক সামনে আসছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. মিজানুর রহমান বাজেট অধিবেশনে তার জন্য বরাদ্দকৃত ফ্ল্যাটের জন্য ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন এবং জানালার পর্দার দাবি জানিয়ে সংসদ ও সংসদের বাইরে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন।
কুষ্টিয়া-৩ আসনের এমপি আমির হামজা সাংবাদিকদের সামনে বক্তব্য দিতে গিয়ে দেশের জাতীয় বাজেটের আকার প্রথমে ২০০ কোটি এবং পরে ৬,০০০ কোটি টাকা হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন, যা রাজনৈতিক মহলে হাসির খোরাক জোগায় (পরে তিনি ৬ লাখ কোটি বলতে চেয়েছিলেন বলে দাবি করেন)।
চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) আরমান উদ্দিনের একটি অডিও ক্লিপ ফাঁস হয়, যেখানে এক যুবদল নেতার হুমকির জবাবে পিএস-এর প্রচ্ছন্ন সায় দেওয়ার সুর পাওয়া যায়।
গত জুন মাসে বিধবা নারীকে ধর্ষণ ও ভ্রূণ নষ্টের অভিযোগে করা মামলায় গ্রেফতার ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতা জিসান মিয়া প্রধানকে কুমিল্লার আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। জিসান মিয়া (২৮) ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সহকারী আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক এবং সংগঠনটির কুমিল্লা জেলা পশ্চিম শাখার সাবেক সভাপতি।
এদিকে বিধবা নারীকে ধর্ষণের অভিযোগে পটুয়াখালী সদর উপজেলা যুব জামায়াতের সভাপতি মো. শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা হয়েছে। এ ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছেন অভিযুক্ত শহিদুল ইসলাম। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাতে বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. হুমায়ুন কবির বিষয়টি বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেছেন। এর আগে ২২ জুলাই পটুয়াখালী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনানে বাদী হয়ে মামলা করেন ওই নারী। মামলায় একজনকেই আসামি করা হয়েছে। আদালতের বিচারক শিরিন নিলা মামলাটি আমলে নিয়ে পটুয়াখালী সদর থানাকে এজাহারপূর্বক আসামির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
সবশেষ যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-অভয়নগর) আসনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য (এমপি) এবং জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক গোলাম রসুলের বাসভবনে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এমপির বাসভবনের সামনে অবস্থিত ‘আল মাদ্রাসাতুশ শারইয়াহ’ ও মসজিদের যাতায়াতের রাস্তা এবং মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এমপির পরিবারের দীর্ঘদিনের বিরোধকে কেন্দ্র করে এ ঘটনার সূত্রপাত ঘটে। তবে এ নিয়ে বুধবার (২৯ জুলাই) জেলা প্রশাসন দুই পক্ষকে নিয়ে সমঝোতা সভা করলেও বিষয়টি মানেননি স্থানীয় লোকজন। তারা বলছেন, জামায়াত এমপির মেয়েকে ক্ষমা চাইতে হবে। যদিও এর মধ্যে মঙ্গলবার মেয়েকে মানসিক রোগী দাবি করে ক্ষমা চেয়েছেন জামায়াত এমপি। সেটি মানতে চান না এলাকাবাসী।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বেলা ১১টার দিকে মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে এমপি এবং তার মেয়ে মেহজাবিন জান্নাত অনন্যার কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে এমপির মেয়ে অনন্যা তালা দিয়ে আঘাত করলে রোকসানা খাতুন নামে স্থানীয় এক নারী অভিভাবক আহত হন। সেইসঙ্গে অন্য এক অভিভাবকের ওপর চড়াও হন। এমপির মেয়ে এর আগে সোমবারও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি দেখান এবং মঙ্গলবার সকালে মাদ্রাসাটি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেন, যা এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে কড়া বার্তা দিয়ে বলেছেন, দলের আকার বড় করার চেয়ে আদর্শ ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখাকেই তারা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবেন এবং শৃঙ্খলা ভঙ্গের ক্ষেত্রে কাউকে কোনও ছাড় দেওয়া হবে না।
জামায়াতের সংসদ সদস্যদসহ সিনিয়র নেতাদের বিতর্কিত ও অনভিপ্রেত ঘটনাগুলোকে কঠোরভাবে ও গঠনতন্ত্র অনুসারে শূন্য সহনশীলতার নীতিতে দেখছে বলে জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ।
বুধবার বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘দল যতো বড় হচ্ছে কিছুটা বিশৃঙ্খলা বিভিন্ন জায়গায় সৃষ্টি হচ্ছে। তবে এসব ঘটনা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের তুলনায় খুবই নগণ্য। তবে যে বা যারাই গঠনতন্ত্র পরিপন্থি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত তাদের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলের ভাবমূর্তি রক্ষায় ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আমরা অভ্যন্তরীণ তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
তবে কিছু কিছু বিষয়কে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের উসকানি বা পরিকল্পিত প্রপাগান্ডা হিসেবে অভিহিত করে জামায়াতের এই নেতা বলেন, ‘আমাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যারা আছে তারা অনেক সময় জামায়াতের নামে বা জামায়াতের নেতাকর্মীদের নাম করে অনেক ধরণের প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে থাকে। অনেক পজিটিভ বিষয়কে তারা নেগেটিভভাবে উপস্থাপন করে। তিল কে তাল বানিয়ে তা প্রচার করে নেতাকর্মীদের চরিত্রহননের চেষ্টা করে। তবুও আমরা দলের মধ্যে থেকে সবার উদ্দেশ্যে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছি, সবাই যেন গঠনতন্ত্র মোতাবেক ইসলামী নীতিনৈতিকতা ও আদর্শ মেনে সতর্ক থাকেন।’









