নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের আন্দোলন, ব্লকেড কর্মসূচি থেকে আজমুল হত্যা মামলার আসামিদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার করার আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছিল সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে। এই আল্টিমেটামের ১৪ ঘণ্টা পার না হতেই সন্দেহভাজন এক আসামিকে পিরোজপুর থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এসআরবি দাবি করছে, গ্রেফতার হাসনাত হাবিব রিফাত (৩০) আজমুল হত্যা মামলার অন্যতম অভিযুক্ত। গোপন সংবাদ পেয়ে এসআরবি-৬ ও এসআরবি-৮ এর যৌথ আভিযানিক দল তাকে গ্রেফতার করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রিফাত নিজেকে আজমুল হত্যায় সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জড়িত অন্যদের গ্রেফতারে।অভিযান চলছে।
এসআরবি ৬ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল নিস্তার আহমেদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, সোমবার দিনগত রাত আড়াইটার দিকে এসআরবি-৬, খুলনা ও এসআরবি-৮, বরিশাল এর যৌথ আভিযানিক দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পিরোজপুর জেলার নেছারাবাদ থানাধীন কুড়িয়ানা আদাবাড়ি এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় খুলনা মহানগরীর হরিণটানা থানার চাঞ্চল্যকর আজুমল হত্যা মামলার অন্যতম অভিযুক্ত হাসনাত হাবিব রিফাতকে (৩০) গ্রেফতার করা হয়। সে সিরাজগঞ্জ সদরের গুনেরগাতির মনোয়ার হোসেনের ছেলে।
তিনি বলেন, গ্রেফতার হাসনাত হাবিব রিফাত (৩০) উক্ত ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে। তার দেওয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী অন্য অভিযুক্তদের গ্রেফতারে এসআরবি-৬ এর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য গ্রেফতার আসামিকে কেএমপি, খুলনার হরিণটানা থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
হরিণটানা থানার ওসি ইকবাল হোসেন বলেন, এসবিআরের হাতে আটক রিফাত খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। তাকে এসবিআর এর কাছ থেকে বুঝে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। রিফাতকে সন্দেহজনকভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে। আজমুলকে হত্যার ঘটনায় হরিণটানা থানায় একটি মামলা করেছেন তার বাবা কুতুব উদ্দিন। মামলায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও প্রাক্তন ৪ শিক্ষার্থীর নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ আসামিদের গ্রেফতারে তৎপর রয়েছে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. রেজাউল করিম বলেন, আজমুল হত্যার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির পক্ষে আমার অবস্থান। গ্রেফতার রিফাত খুবির সাবেক শিক্ষার্থী। আজমুল হত্যায় জড়িতদের গ্রেফতারের প্রশাসনকে সব ধরনের সহযোগিতা করবে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।
এর আগে খুলনা নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আজমুল হোসেন হত্যাকাণ্ডে কোনও আসামি গ্রেফতার না হাওয়ায় ফুঁসে ওঠেন শিক্ষার্থীরা। সোমবার তারা আসামিদের গ্রেফতারের দাবিতে সোনাডাঙ্গায় ৩ ঘণ্টার সড়ক অবরোধ (ব্লকেড) কর্মসূচি পালন করেন। পরে মেট্রোপলিটন পুলিশ ও কেসিসি প্রশাসকের আশ্বাসের ভিত্তিতে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে অবরোধ স্থগিত করে।
পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আজমুল হোসেন হত্যাকাণ্ডের পর ২ দিনেও কোনও আসামি গ্রেফতার না হওয়ায় চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বিচার ও আসামিদের গ্রেফতার দাবিতে সোমবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সোনাডাঙ্গা ক্যাম্পাসের সামনের সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। শেখপাড়া ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরাও মিছিল নিয়ে এ কর্মসূচিতে অংশ নেয়। একপর্যায়ে তারা রাস্তার মাঝখানে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ গড়ে তোলেন। শিক্ষার্থীদের এ কর্মসূচিতে শিক্ষকরাও একাত্মতা প্রকাশ করেন। শিক্ষার্থীরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এজাহারনামীয় আসামিদের গ্রেফতরোর সময়সীমা বেঁধে দেন এবং অন্যথায় আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন।
অবরোধ চলাকালে সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লা ও অভ্যন্তরীণ রুটে যান চলাচল বন্ধ থাকায় যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দুপুর ১টার পর কেএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ শাহনেওয়াজ খালেদ এবং খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন।
পুলিশ কর্মকর্তা শাহনেওয়াজ খালেদ জানান, আসামিদের গ্রেফতারে বিভিন্ন স্থানে পুলিশের একাধিক অভিযান চলছে এবং খুব দ্রুতই তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। এ ছাড়া আগামী এক মাসের মধ্যে আদালতে তদন্তের অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করার প্রতিশ্রুতি দেন ।
পুলিশের এই সুনির্দিষ্ট আশ্বাসের পর শিক্ষার্থীরা ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে দুপুর দেড়টার দিকে অবরোধ প্রত্যাহার করেন। আর দিন শেষে গভীর রাতে পিরোজপুর থেকে এক আসামিকে গ্রেফতার করা হয়।
উল্লেখ্য, আজমুল যে মেসে ছিলেন সেটি চারতলা ভবন। ভবনটির প্রতিটি তলায় আটটি করে কক্ষ ও দুটি করে শৌচাগার।
ওই মেসের শিক্ষার্থীরা জানান, শুক্রবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে তারা দৌড়াদৌড়ি ও চিল্লাচিল্লির শব্দ শুনে বাইরে বেরিয়ে দেখেন, আজমুল নিচে পড়ে আছে।
প্রতিবেশী ও পাশের ভবনের লোকজন জানান, চুরির অপবাদ দিয়ে আজমুলকে বেদম মারধর করা হয়। একপর্যায়ে আজমুল চারতলা ভবনের ছাদ থেকে পড়ে যায়। হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়। তবে আজমুল স্বেচ্ছায় ছাদ থেকে লাফ দিয়েছেন নাকি মেরে ছাদ থেকে নিচে ফেলে দেওয়া হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ভবনটি দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা আকিবুর রহমান বলেন, প্রায় এক বছর আগে আজমুল মেসে ওঠে। মেস ম্যানেজার মেহেদীই মেসের বিষয়টি দেখাশোনা করেন। গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী মেহেদী ভবনের চতুর্থ তলায় থাকতেন। অন্যদের সঙ্গে মেহেদীর কক্ষও তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। তার মোবাইল ফোন নম্বরও বন্ধ।









