অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে খুলনায় বিশেষ অভিযান (স্পেশাল ড্রাইভ) শুরু করেছে জেলা পুলিশ। সাত দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে জানিয়েছেন খুলনার পুলিশ সুপার ওমর ফারুক। অভিযানে মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার, মাদকদ্রব্য উদ্ধার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বুধবার (৭ অক্টোবর) বিকালে খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এসব কথা বলেন পুলিশ সুপার।
তবে এর মধ্যে খুলনায় জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের সামনে থেকে সদরের সাব-রেজিস্ট্রার তন্ময় কুমার মণ্ডলকে তুলে নিয়ে যায় কয়েকজন দুর্বৃত্ত। বেলা ২টা ৪৫ মিনিটের দিকে চারটি মোটরসাইকেলে করে আসা বেশ কয়েকজন যুবক প্রথমে তাকে রিকশায়, পরে মোটরসাইকেলে করে নগরীর কালীবাড়ি ঘাটের দিকে নিয়ে যায়। প্রায় ৪০ মিনিট পরে তাকে আবার রিকশায় করে কার্যালয়ে পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু ফিরে এসে কারা তাকে নিয়ে গেছে, এ ব্যাপারে কোনও কথা বলছেন না তন্ময় মণ্ডল।
মতবিনিময় সভায় পুলিশ সুপার বলেন, ‘যেকোনো সময়ের চেয়ে এবার পুলিশ দ্বিগুণ আক্রমণাত্মক হবে। জেলা পুলিশ, মেট্রোপলিটন পুলিশ ও এসআরবি সমন্বিতভাবে এ অভিযান পরিচালনা করবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জেলা এলাকার জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জেলা পুলিশ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে আসছে। মাদক, অবৈধ অস্ত্র, সন্ত্রাস ও অন্যান্য অপরাধ দমনে ধারাবাহিক কার্যক্রমের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত কয়েকটি ঘটনা, বিশেষ করে টার্গেট কিলিং, বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে।’
প্রথম দিনে কোনও অস্ত্রধারী গ্রেফতার বা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হয়নি
অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তা আরও সুসংহত করতে মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ী, দুষ্কৃতকারী ও অপরাধীদের গ্রেফতার, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং ওয়ারেন্ট তামিলসহ বিভিন্ন অপরাধ দমনের লক্ষ্যে ৬ অক্টোবর রাত থেকে বিশেষ অভিযান শুরু করা হয়েছে। অভিযানের প্রথম দিনেই খুলনা জেলা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ৯৫ জনকে গ্রেফতার করেছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম চলছে। গ্রেফতার ব্যক্তিদের অধিকাংশই মাদক ব্যবসায়ী। তাদের মধ্যে অনলাইন জুয়াড়ি ও ইভটিজারও রয়েছে। তবে প্রথম দিনে কোনও অস্ত্রধারী গ্রেফতার বা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হয়নি।
পুলিশ সুপার বলেন, ‘জনগণের জানমালের নিরাপত্তা ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এ বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকবে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি মাদক, অবৈধ অস্ত্র ও অন্যান্য অপরাধের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করা হবে। এ অভিযানের ফলে দৈনন্দিন নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজার উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় থাকবে।’
খুলনা জেলা পুলিশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করছে উল্লেখ করে পুলিশ সুপার বলেন, ‘জেলার শান্তি, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে সচেতন নাগরিক, জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।’
চার থানা হটস্পট
পুলিশ সুপার বলেন, খুলনা জেলার ৯টি থানার মধ্যে রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া ও বটিয়াঘাটা থানাকে ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ চার থানার মধ্যে আরও ছোট ছোট হটস্পট শনাক্তের কাজ চলছে। এসব এলাকায় ব্লক রেইড দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ‘চায়ের দোকানে আড্ডা, ক্যারাম খেলার নামে আড্ডা ও অনলাইন জুয়ার আড্ডা শনাক্ত করে অভিযান চলছে। হটস্পটে যাকে পাওয়া যাবে, তাকেই থানায় নেওয়া হবে। পরে তার বিষয়ে যাচাই-বাছাই করা হবে। নিরপরাধ হলে ছেড়ে দেওয়া হবে। আর অপরাধের বিন্দুমাত্র নমুনা পাওয়া গেলে গ্রেফতার করা হবে।’
৩৫ হত্যাকাণ্ড, রহস্য উদ্ঘাটন ২৫টির
পুলিশ সুপার জানান, খুলনার ৯টি থানায় এ পর্যন্ত ৩৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ২৫টি হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে। এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যে মাদকসংক্রান্ত ১২টি—এর মধ্যে ৯টি গুলিতে এবং ৩টি কুপিয়ে; সামাজিক দ্বন্দ্বে ১৩টি, রাজনৈতিক কারণে ২টি, শ্বাসরোধ করে ২টি, পারিবারিক কলহে ২টি এবং অজ্ঞাত কারণে ২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। মাদকের প্রসার ঘটাতে মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে অবৈধ অস্ত্র থাকে। সামান্য বিরোধ হলেই এসব অস্ত্রের ব্যবহার হয়।’
বেকার শ্রমিকদের সন্তানদের একাংশ মাদকে
পুলিশ সুপার বলেন, খুলনা একসময় শিল্পাঞ্চল ছিল। এখন অনেক মিল বন্ধ। তবে সেসব মিলের শ্রমিকরা রয়ে গেছেন। তাঁদের বেকার সন্তানদের একটি বড় অংশ মাদকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, ‘এসব ব্যক্তিকে এনআইডির ঠিকানায় পাওয়া যায় না। আবার ভাড়াটিয়া হওয়ায় তারা প্রতিনিয়ত বাসা বদল করেন। ফলে তাদের শনাক্ত করা কঠিন হচ্ছে।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নজরদারি
পুলিশ সুপার বলেন, ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটক যুবসমাজকে নষ্ট করছে। এটিও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে প্রভাব ফেলছে। তাই মিসইনফরমেশন ও ডিজইনফরমেশনের বিষয়টি সাইবার ক্রাইম টিমের নজরদারিতে নেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানোর চেষ্টা মনিটরিং করা হচ্ছে। পাশাপাশি কিশোর গ্যাং ও ইভটিজারদের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নেওয়া হচ্ছে।