তেলিখালি যুদ্ধ: মুক্তিযুদ্ধে ময়মনসিংহ সীমান্তে প্রথম জয়

আবুল কালাম, ময়মনসিংহ
০৩ নভেম্বর ২০১৬, ০৭:৪০আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০১৬, ০৭:৪০

আজ ৩ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার ঐতিহাসিক তেলিখালি যুদ্ধ দিবস। একাত্তরের এই দিনে ভারতীয় সীমান্তবর্তী হালুয়াঘাটের তেলিখালি ক্যাম্প পাকিস্তানি সেনাদের কাছ থেকে দখলমুক্ত করতে ভারতীয় মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা এক সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হয়। পাঁচ ঘণ্টার রক্তক্ষয়ী এই যুদ্ধে ১২৪ জন পাকিস্তানি সেনা ও তাদের শতাধিক সহযোগী রাজাকার আলবদরসহ ২৩৪ জনকে খতম করে মুক্তিযোদ্ধাদের যৌথবাহিনী। এতে শহীদ হন মিত্রবাহিনীর ২১ জন জওয়ান ও সাতজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ময়মনসিংহ সীমান্তে এটি প্রথম বিজয়। তেলিখালি যুদ্ধ: মুক্তিযুদ্ধে ময়মনসিংহ সীমান্তে প্রথম জয়

ময়মনসিংহের স্থানীয় রাজাকার ও আলবদরদের সহায়তায় হালুয়াঘাট সীমান্তের তেলিখালি ক্যাম্প দখল করে নেয় পাকিস্তানি সেনারা। ক্যাম্পের ভেতর গর্ত করে তৈরি করে অসংখ্য বাংকার। ভারত সীমান্ত থেকে চার কিলোমিটার ও হালুয়াঘাট উপজেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরের এই ক্যাম্পে পাকিস্তানি সেনারা বিশাল অস্ত্র ও গোলাবারুদের ভাণ্ডার গড়ে তোলে। এর পূর্বপাশের কড়ইতলী, দক্ষিণের মায়াঘাসি ও পশ্চিমের রামচন্দ্রপুরা ক্যাম্পও দখলে নিয়ে পাকিস্তানি সেনারা সীমান্ত বরাবর শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যূহ গড়ে তোলে। তবে শক্তির দিক থেকে প্রধান ঘাটি ছিল তেলিখালি। ৩৩ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের একটি পুরো ইউনিট ছিল এই তেলিখালি ক্যাম্পে।

পরিকল্পনা করা হয় তেলিখালি ক্যাম্প পাকিস্তানি সেনাদের দখল থেকে মুক্ত করতে হবে। এ লক্ষ্যে ২ নভেম্বর সকালে এ নিয়ে এক বৈঠকে যোগ দেন যৌথবাহিনীর কর্নেল রঘুবন সিংহ, ক্যাপ্টেন বালজিত সিংহ, ক্যাপ্টেন মালেক শাহ ও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার প্রয়াত আবুল হাশেমসহ মুক্তিযোদ্ধাদের কোম্পানি কমান্ডারগণ। বৈঠকে যুদ্ধের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়।

সেদিন ছিল ৩ নভেম্বর, ১৯৭১। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের তুরা জেলার গাছুয়াপাড়া টিলাসহ নির্ধারিত কয়েকটি জায়গা থেকে কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে রাত ১২টার পর তেলিখালি অভিমুখে যাত্রা করে এক ঘণ্টা হেঁটে চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ছক অনুযায়ী তেলিখালির দক্ষিণ, পশ্চিম ও পূর্ব এই তিনদিকে অবস্থান নেয় ভারতের ১৩ রাজপুত রেজিমেন্ট ও পাঁচ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা। এর মধ্যে তেলিখালি ক্যাম্পের দক্ষিণে অবস্থান ছিল কর্নেল রঘুবন সিংহ, আবুল হাশেম কোম্পানি ও ইপিআর জওয়ানদের একটি দল। তিন দিকের তিনটি দলকে পেছনের দিকে যেকোনও হামলা থেকে রক্ষা করছিল কাটঅফ পার্টি। বিশেষ করে আক্রমণের পর কড়ইতলী, হালুয়াঘাট সদর, মায়াঘাসি, বাঘাইতলী, রামচন্দ্রপুরা কিংবা নালিতাবাড়ি পথ দিয়ে আসা পাকিস্তানি সেনাদের যেকোনও ধরনের অভিযান আক্রমণ রুখে দিয়ে মোকাবিলার জন্য মূলত এসব কাটঅফ পার্টি অবস্থান নিয়েছিল।

মার্চ করার সিগন্যাল পাওয়ার পর বুক সমান ধানক্ষেত মাড়িয়ে এবং ক্যাম্পের পাশ দিয়ে বয়ে চলা খরস্রোতা একটি পাহাড়ী ছড়া পার হয়ে তেলিখালি ক্যাম্পের দক্ষিণ পাশের পাহারাদার চৌকির কাছাকাছি চলে আসেন তারা। এ সময় টের পেয়ে যায় এক পাকিস্তানি পাহারাদার। ‘কৌন হ্যায়’ বলা মাত্রই হাবিলদার মেসবাহর পাশে থাকা ইদ্রিসের গুলিতে লুটিয়ে পড়ে ওই পাকিস্তানি পাহারাদার। এ সময় পূর্বপাশে থাকা অপর পাহারাদার দৌড়ে ক্যাম্পের ভেতরে গিয়ে ডাক চিৎকার শুরু করলে তুমুল যুদ্ধ বেধে যায়। তখন ভোর ৩টা। রমজানের সেহরির সময় চলছিল। ক্যাম্পের ভেতরের বাংকারগুলোতে আলো জ্বলছিল। যৌথবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের গুলি বর্ষণের জবাবে পাকিস্তানি সেনারাও ক্যাম্পের বাংকার থেকে পাল্টা গুলি চালায়। ১৩ রাজপুত রেজিমেন্ট আর মুক্তিযোদ্ধাদের তিন দিক থেকে একযোগে আক্রমণের মুখে পাকিস্তানি সেনারা বাংকারের ভেতর থেকে প্রতিরোধের চেষ্টা করে সকাল ৮টা পর্যন্ত। একই সময়ে পাকিস্তানি সেনাদের পাঠানো এসওএস বার্তায় কড়ইতলী ক্যাম্প থেকে মর্টার শেল আসতে থাকে তেলিখালি ক্যাম্পের চারপাশে। ভোর ৩টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত টানা পাঁচ ঘণ্টার এই যুদ্ধে একদিকে গুলি বর্ষণ, আরেকদিকে ক্যাম্পের ভেতরে ঢুকে গ্রেনেড চার্জ করে যৌথবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা এই ক্যাম্পের সমুদয় পাকিস্তানি সেনা ও তাদের সহযোগী রাজাকার আলবদরদের খতম করতে সক্ষম হন।

তেলিখালি যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধা বিমল পাল জানান, এই যুদ্ধে একজন পাকিস্তানি সেনা ও কয়েকজন রাজাকার আত্মসমর্পণ করার পর তাদের হত্যা করা হয়। ক্যাম্পের ভেতর পাকিস্তানি সেনা ও স্থানীয় রাজাকার আলবদর ছাড়াও অনেক নারীর লাশ পড়েছিল।

ময়মনসিংহ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আবদুর রব জানান, এই যুদ্ধে ১২৪ জন পাকিস্তানি সেনা, ৮৫ জন রাজাকার ও ২৫ জন রেঞ্জারসহ ২৩৪ জনের লাশ পড়েছিল ক্যাম্পের ভেতরে-বাইরে। বিপরীতে মিত্রবাহিনীর ২১ জন ও আটজন মুক্তিযোদ্ধাসহ ২৮ জন শহীদ হন। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন অনেকে। মিত্রবাহিনীরও অনেকে গুরুতর আহত হয়েছিলেন। তবে এই সংখ্যা ও যুদ্ধের সময় নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

এই যুদ্ধে কাটঅফ পার্টিতে থাকা মুক্তিযোদ্ধা আবদুল গনি জানান, ময়মনসিংহ সীমান্তের প্রথম এই সফল যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে চলে আসে। এছাড়া এই যুদ্ধ মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বাড়িয়ে তোলে। ভেঙে পড়ে সীমান্তে থাকা পাকিস্তানি সেনা ও তাদের সহযোগীদের মনোবল।

তেলিখালি যুদ্ধে শহীদদের স্মরণে সম্প্রতি ক্যাম্পসংলগ্ন স্থানীয় বাজারে নির্মাণ করা হয়েছে শহীদ স্মৃতিফলক। তেলিখালি ক্যাম্পের পেছনে সাত শহীদের গণকবর শনাক্ত করা হয়েছে। তাতে শ্বেতপাথরে লেখা সাত শহীদের নামফলক বসানো হয়েছে।

তালিকাভুক্ত সাত শহীদ হচ্ছেন জামালপুরের সরিষাবাড়ির শওকত আলী, ময়মনসিংহের ফুলপুরের হযরত আলী, হালুয়াঘাটের আক্তার হোসেন, ময়মনসিংহ সদরের আলাউদ্দিন, শাহজাহান ও রঞ্জিত গুপ্ত এবং সিপাহী ওয়াজিউল্লাহ।

অভিযোগ উঠেছে, তেলিখালি যুদ্ধে শহীদ পরিবারগুলোর কোনও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে না। রাষ্ট্রীয় সম্মান ও মর্যাদাও দেওয়া হচ্ছে না তাদের।

যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মেসবাহ উদ্দিনের অভিযোগ, তেলিখালি যুদ্ধে তার বীরত্বগাথার কথা মুখে মুখে থাকলেও অনেক আবেদন করার পরও তার ভাগ্যে এখনও জোটেনি কোনও খেতাব। জীবদ্দশায় তিনি চান রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও প্রাপ্য সম্মান।

এদিকে দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপন করার জন্যে ব্যাপক প্রস্ততি নেওয়া হয়েছে। সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে তেলিখালি দিবসটির তাৎপর্য, তেলিখালি যুদ্ধে শহীদ পরিবার বর্গের সম্মাননা, শহীদদের কবর জিয়ারত ও দোয়া মাহফিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে প্রধান অতিথী হিসেবে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক মো. খলিলুর রহমান ও উদ্ভোদক জুয়েল আরেং এমপি উপস্থিত থেকে দিবসটি পালিত হবে।

/এআর/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
নতুন যুদ্ধবিরতিতে সম্মত ইসরায়েল-লেবানন: হিজবুল্লাহমুক্ত জোন গঠনের সিদ্ধান্ত
নতুন যুদ্ধবিরতিতে সম্মত ইসরায়েল-লেবানন: হিজবুল্লাহমুক্ত জোন গঠনের সিদ্ধান্ত
বিশ্ব অর্থনীতির সামনে দুই কঠিন পথ, নেপথ্যে ইরান যুদ্ধ ও এআই সংকট
বিশ্ব অর্থনীতির সামনে দুই কঠিন পথ, নেপথ্যে ইরান যুদ্ধ ও এআই সংকট
এবার পল্লবীতে মিললো আরেক নারীর গলিত মরদেহ
এবার পল্লবীতে মিললো আরেক নারীর গলিত মরদেহ
নিখোঁজ ব্যবসায়ীর হাত-পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধার
নিখোঁজ ব্যবসায়ীর হাত-পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধার
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম