মৎস্য খামার নিয়ে দ্বন্দ্ব: গরু-ছাগলের খোয়ারে আটকে রেখে দিনমজুরকে নির্যাতন!

আতাউর রহমান জুয়েল, ময়মনসিংহ
২২ জানুয়ারি ২০১৭, ১০:২৩আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০১৭, ১০:৩০

সাংবাদিকদের খোয়ারের ভেতরে ঢুকে আব্দুল কু্দ্দুস দেখান কীভাবে তাকে আটকে রাখা হয় ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার বালিয়ান ইউনিয়নের নয়ানবাড়ি গ্রামে মৎস্য খামার নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধের জেরে এক দিনমজুরকে গরু-ছাগলের খোয়ারে আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। খোয়ারে আটকে রাখার ঘটনা এলাকায় জানাজানি হওয়ার পর লজ্জায়-অপমানে ওই দিনমজুর আব্দুল কুদ্দুস (৫৫) ও তার পরিবারের সদস্যরা বাড়ি থেকে বের হচ্ছেন না বলে জানা গেছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিচার দাবি করেছেন স্থানীয়রা। তবে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বলেছেন, অভিযোগ পেলে দায়ীদের বিচার করা হবে।

যাদের বিরুদ্ধের নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে তাদের মন্তব্য, ‘গরু-ছাগলের মতো আচরণ করায় তাকে নিয়ে এই কাজ করা হয়েছে।’

সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে স্থানীয়রা বাংলা ট্রিবিউনের এ প্রতিবেদককে জানান, নয়ানবাড়ি পূর্বপাড়া গ্রামে এসএম শামসুল আলম কালু ও এসএম নুরুল আলম লালু দুই ভাইয়ের কাছ থেকে ১৭ একর জমি লিজ নিয়ে তিন বছর ধরে মৎস্য খামারে মাছ চাষ করে আসছে স্থানীয় সেলিম রেজা ও তার লোকজন। দুই পক্ষের মধ্যে টাকা-পয়সার লেনদেন নিয়ে কয়েক মাস ধরে দ্বন্দ্ব চলছিল। এ নিয়ে দুই পক্ষে মামলাও হয়েছে। স্থানীয় চেয়ারম্যানসহ গণ্যমান্যরা শালিস করে এর মিমাংসা করে দেন। ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে জমি তার মালিককে বুঝিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

গত বুধবার (১৮ জানুয়ারি) ৮/১০ দিনমজুরের সঙ্গে আব্দুল কুদ্দুসও শামসুল আলম কালুর হয়ে খামারে ডাটা কাটা ও আগাছা পরিষ্কারের কাজে যান। খামারে কাজ করায় কুদ্দুসসহ অপর দিনমজুরদের মারধরের হুমকি দেন সেলিম রেজার লোকজন। ওই ডাটা সেলিম রেজাই রোপন করেছিলেন।

পরের দিন বৃহস্পতিবার সকালে দিনমজুর আব্দুল কুদ্দুস স্থানীয় বাংলা বাজারে গেলে ক্ষুব্ধ সেলিম ও তার পরিবারের লোকজন লাঠিসোটা নিয়ে তাকে জোর করে ধরে নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ পরিচালিত গরু-ছাগলের খোয়ারে আটকে রেখে নির্যাতন চালায়। কুদ্দুসকে প্রায় দেড় ঘন্টা সেখানে আটকে রেখে হুমকি ধমকিসহ নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। পরে স্থানীয় ইউপি সদস্য শাহজাহান এসে তাকে উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে আসেন। এই ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। 

আব্দুল কুদ্দুস বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘এই বৃদ্ধ বয়সে এ ধরণের অপমানের শিকার আমি আর কোনও দিন হইনি। এখন মানুষ জন আমাকে দেখলেই টিটকারি মারে। লজ্জায়-ঘেন্নায় কী করবো বুঝে পাচ্ছি না। এই ঘটনার পর ছেলে-মেয়েরাও স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।’ কান্না জড়িত কণ্ঠে কুদ্দুস জানান, নির্যাতনকারীদের ভয়ে তিনি পুলিশের কাছেও বিচার দিতে যেতে পারছেন না।  

প্রত্যক্ষদর্শী সহকর্মী দিনমজুর তোতা মিয়া জানান, খবর পেয়ে তিনি বাজারে গিয়ে দেখেন কুদ্দুসকে খোয়ারে আটকে রেখে লাঠি দিয়ে মেরে ফেলার ভয় দেখাচ্ছে। লজ্জায় ঘৃণায় কুদ্দুস কেঁদে ফেললেও সেলিম ও তার ভাইয়েরা তাকে ছাড়েনি। এই ঘটনার বিচার দাবি করেন তোতা মিয়া।

স্থানীয় ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শাহজাহান আলোচনা করে সেলিমদের হাত থেকে কুদ্দুসকে  উদ্ধার করেছিলেন। শাহজাহান বলেন, ‘এ ধরণের ঘটনা কোনও দিন দেখিনি। মানুষকে গরু ছাগলের খোয়ারে আটকে রেখে নির্যাতন করা জঘন্য কাজ ছাড়া আর কিছুই না। এর বিচার করা উচিত।’

খামারের জমির মালিক এসএম শামসুল আলম কালু বলেন, ‘স্থানীয় চেয়ারম্যান দুপক্ষকে ডেকে নিয়ে দ্বন্দ্ব সমাধান করলেও তাদের তিনটি পুকুর এখনও দখল করে আছে সেলিম রেজার পরিবার। তাদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে অত্যাচার নির্যাতন করার অভিযোগ রয়েছে।’

অভিযুক্ত পরিবারের সদস্য সেলিম রেজার ভাই মাসুদ রানা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘খামারের জমি নিয়ে দুইপক্ষের মধ্যে মামলা চলছে। শামসুল আলম কালু মিয়া দিনমজুর লাগিয়ে দিয়ে জমিতে থাকা ডাটা কেটে নিয়ে গেছে। কুদ্দুস আমাদের সঙ্গে গরু ছাগলের মতো আচরণ করায় তাকে খোয়ারে আটকে রাখা হয়।’

বালিয়ান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফ উজ্জামান সরকার ঘটনা স্বীকার করে বলেন, ‘ইউপি সদস্য শাহজাহানের কাছ থেকে বিষয়টি তিনি শুনেছেন। ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। কুদ্দুসের পরিবার অভিযোগ দিলে এর যথাযথ বিচার করা হবে।’

এদিকে ফুলবাড়িয়া থানার অফিসার ইনচার্জ রিফাত খান রাজিব বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, এ ধরণের ঘটনা তার জানা নেই। তবে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

/এফএস/ 

আরও পড়ুন- 

হিসাব না দেওয়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা প্রকাশ করবে ইউজিসি
ঢাকা মেডিক্যালে ধর্ষণ: অভিযুক্ত আনসার সদস্যদের চেনেন না তদন্ত কর্মকর্তা!

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
এবার পে-স্কেল নিয়ে সুখবর দিলেন অর্থমন্ত্রী
এবার পে-স্কেল নিয়ে সুখবর দিলেন অর্থমন্ত্রী
মার্কিন সেনা ধরলে ৩০ হাজার ডলার পুরস্কার, নারীদের ক্ষেত্রে দ্বিগুণ: ইরান
মার্কিন সেনা ধরলে ৩০ হাজার ডলার পুরস্কার, নারীদের ক্ষেত্রে দ্বিগুণ: ইরান
প্রত্যাশা অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে আরও সময় লাগবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
প্রত্যাশা অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে আরও সময় লাগবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
দুই নম্বর জমিতে এক নম্বর ফসল ফলে না: ফয়জুল করীম
দুই নম্বর জমিতে এক নম্বর ফসল ফলে না: ফয়জুল করীম
সর্বাধিক পঠিত
‘লিভ ইন সন্দেহে’ বিবাহিত দম্পতির ফ্ল্যাটে বিশ্ববিদ্যালয় ৪ ছাত্রের হামলাচেষ্টা
‘লিভ ইন সন্দেহে’ বিবাহিত দম্পতির ফ্ল্যাটে বিশ্ববিদ্যালয় ৪ ছাত্রের হামলাচেষ্টা
‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই এমরানকে ট্রান্সফার করবেন’, ফোন দিয়ে বললেন মন্ত্রী
‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই এমরানকে ট্রান্সফার করবেন’, ফোন দিয়ে বললেন মন্ত্রী
এক সিনেমার সম্মানী দিয়ে পাকিস্তানে বাড়ি কেনেন শবনম
এক সিনেমার সম্মানী দিয়ে পাকিস্তানে বাড়ি কেনেন শবনম
২৬ দিন ধরে বন্ধ সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র, পরিচালক বললেন ‘ড. ইউনূসের দোষ’
২৬ দিন ধরে বন্ধ সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র, পরিচালক বললেন ‘ড. ইউনূসের দোষ’
মেয়ের বিয়ের বাজারের টাকা হারিয়ে ফেললেন বাবা, পেয়ে ফিরিয়ে দিলেন পুলিশ
মেয়ের বিয়ের বাজারের টাকা হারিয়ে ফেললেন বাবা, পেয়ে ফিরিয়ে দিলেন পুলিশ