ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা) আসনের সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর বিরুদ্ধে ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি এবং দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের নানাবিধ অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছে কেন্দ্রীয় বিএনপি। এর আগেও তাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এমপি বাচ্চু এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা ভালুকা এলাকার বিভিন্ন পোশাক কারখানার ঝুট ব্যবসা জোরপূর্বক নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। টেক্সটাইল ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করছেন। চলতি বছরের মার্চে তার অনুসারীরা জোরপূর্বক ঝুটবোঝাই ট্রাক কারখানা থেকে নিয়ে যান। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের হস্তক্ষেপে উদ্ধার করা হয়।
একাধিক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন, বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্প গ্রুপ থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে এমপি বাচ্চু ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। দুটি শিল্পগ্রুপের কর্মকর্তাদের ওপর ককটেল হামলা ও হুমকির ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করা হয়েছে।
দলীয় অন্তত পাঁচ জন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে অনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিজস্ব সিন্ডিকেট তৈরি করে বিশৃঙ্খলা করছেন এমপি বাচ্চু। এ ধরনের দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগেও তার বিরুদ্ধে একাধিকবার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর ভালুকার শিল্পপ্রতিষ্ঠান দখল ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তাকে বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদসহ সকল পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে সে সময় ভালুকা থানায় মামলাও করা হয়। ২০২৫ সালের ২৪ অক্টোবর নিজের ভুল স্বীকার করে এবং দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা প্রার্থনা করায় কেন্দ্রীয় বিএনপি তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে প্রাথমিক সদস্যপদ ফিরিয়ে দেয়। বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের পর তিনি বিএনপির টিকিটে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ময়মনসিংহ-১১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার কয়েক মাসের মাথায় তিনি পুনরায় একই ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন।
ভালুকায় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাট
ভালুকায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কারা নির্যাতিত সাবেক ছাত্রনেতা পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক তিয়াস মাহমুদ শুভর বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। তার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস ছন্দা জানান, তার স্বামী ভালুকা পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক তিয়াস মাহমুদ স্বতন্ত্র প্রার্থী মোর্শেদ আলমের পক্ষে কাজ করায় এ হামলার ঘটিয়েছেন এমপি বাচ্চু ও তার অনুসারীরা।
তিনি জানান, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে ২০-২৫ জনের একটি দল ভালুকা পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মেজরভিটা এলাকায় তাদের বাসায় প্রবেশ করে। এ সময় নেতৃত্বে ছিলেন কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহবায়ক জাহিদ হাসান প্রান্ত, তার সহযোগী ওমর ফারুক সানি ও সাগর। তারা এমপি বাচ্চুর কর্মী।
ছন্দা বলেন, ‘হামলাকারীরা প্রথমে বাসার মূল ফটকে এসে আমার স্বামীকে খুঁজতে থাকে এবং তাকে বের করে না দিলে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে হত্যার হুমকি দেয়। একপর্যায়ে তারা দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে ঘরের বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাঙচুর করে এবং প্রতিটি কক্ষ তল্লাশি চালায়। হামলাকারীরা ভয়ভীতি দেখিয়ে আলমারির চাবি নিয়ে নেয়। পরে আলমারিতে থাকা ৭০ হাজার টাকা ও প্রায় ৩ লাখ ৪৬ হাজার টাকা মূল্যের স্বর্ণালংকার নিয়ে যায়। এ সময় আমার ১০ বছর বয়সী মেয়ে ও ৯ মাসের শিশুসন্তান আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।’
এ ঘটনায় থানা অভিযোগ দেন তিনি। এতে উল্লেখ করা হয়, যাওয়ার আগে হামলাকারীরা তাদের এলাকা ছাড়ার হুমকি দেয় এবং পুনরায় হামলা ও প্রাণনাশের ভয় দেখায়। পরে প্রতিবেশীরা এগিয়ে এলে অভিযুক্তরা সেখান থেকে চলে যায়। ঘটনার পর থেকে তিনি ও তার পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
এ বিষয়ে ভালুকা মডেল থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় একটি অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজির কাছে অভিযোগ
একইভাবে হামলার অভিযোগ করেছেন একই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মোর্শেদ আলমের পক্ষে কাজ করা আমান উল্ল্যাহ। এ নিয়ে গত ৩ এপ্রিল ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজির কাছে লিখিত অভিযোগ দেন তিনি। এতে আমান উল্ল্যাহ উল্লেখ করেছেন, ৩ এপ্রিল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ভালুকা নতুন বাসস্ট্যান্ডস্থ মোর্শেদ আলমের কার্যালয়ে আমরা সাত-আট জন বসে চা খাচ্ছিলাম। হঠাৎ এমপি বাচ্চুসহ তার ৭০-৮০ জন অনুসারী আমাদের হত্যার উদ্দেশ্যে দা, লাঠিসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মোর্শেদ আলমের কার্যালয়ে হামলা চালায়। আমরা প্রাণ ভয়ে দৌড়ে পালিয়ে যাই। তখন তারা কার্যালয়ের সব জিনিসপত্র ভাঙচুর করে এবং বিভিন্ন জরুরি কাগজপত্র লুটপাট করে। এ সময় আমাদের সঙ্গে থাকা তিয়াস মাহমুদকে উদ্দেশ্য করে তার অনুসারী শুভ বলেছেন জবাই করে ফেলবো, এমপি বাচ্চুর নির্দেশ। এ অবস্থায় পরিবারসহ আমরা মৃত্যুঝুঁকিতে আছি। তাই আইনের সহায়তা কামনা করছি। একই বিষয়ে ময়মনসিংহের পুলিশ সুপারের কাছে অভিযোগ দিয়েছেন তিনি।
দলীয় চেয়ারম্যানের কাছেও অভিযোগ
এদিকে, এমপি বাচ্চুর বিরুদ্ধে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভালুকা উপজেলা হবিরবাড়ী ইউনিয়নের বিএনপি নেতা মিজানুর রহমান। এতে দলীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে জনসাধারণ ও নেতাকর্মীদের বাড়িতে হামলা ও প্রশাসনকে অপব্যবহার করে মিথ্যা মামলা ও গ্রেফতারের মাধ্যমে হয়রানির মাধ্যমে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ করা হয়।
অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেছেন, আমি মিজানুর রহমান জিয়া পরিবারের আদর্শের একজন পরিক্ষীত সৈনিক। দীর্ঘদিন ভালুকা উপজেলা যুবদলের একজন কর্মী হিসেবে দলীর কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে আসছি। বিগত স্বৈরাচার হাসিনা পতন আন্দোলনে ও সম্মুখ সারিতে নেতৃত্ব দিয়েছি। অত্যন্ত দুঃক্ষের সঙ্গে জানাচ্ছি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ময়মনসিংহ-১১ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন সময় তার নেতৃত্বাধীন নেতাকর্মীরা ভালুকার জনসাধারণ ও দলীয় নেতৃবৃন্দের বাড়িতে হামলা-লুটপাট চালাচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে গত ১ মার্চ আমার বাসায় এমপি বাচ্চু সাহেবের একনিষ্ঠ কর্মী ভালুকা উপজেলা বিএনপির সদস্য ১০ নম্বর হবিরবাড়ী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মোহাম্মদ খোকা মিয়ার নেতৃত্বে ২৫-৩০জন ভালুকা মডেল থানা পুলিশ সদস্যদের পাহারায় দা, লাঠি, রড, দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আমার বাসায় হামলা করে। প্রথমে বাসার প্রধান দরজা ভেঙে ফেলে, পরবর্তীতে দ্বিতীয় দরজা ভাঙা অবস্থায় আমি প্রাণ বাঁচাতে ঘরের টিনের চাল কেটে পালিয়ে যাই। কিন্তু তারা ঘরের ভতরে প্রবেশ করে আমার পরিবারের সদস্যদের অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে ও তাদের ওপর হামলা চালায়। আমার আলমিরাতে থাকা স্বর্ণালঙ্কার লুট করে ও আমার ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। পরিবারের সদস্যরা প্রাণ বাঁচাতে চিৎকার করলে এলাকাবাসী একত্রিত হলে তারা পালিয়ে যায়। এ বিষয়ে ভালুকা মডেল থানায় অভিযোগ করলে বাচ্চু সাহেবের রেফারেন্স দিয়ে অভিযোগ বা মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানায় পুলিশ। বর্তমানে আমি ও আমার পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় আছি। তাই আপনার সহযোগিতা চাই।
সরকারি জমি এখন প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের পকেটে
এ ছাড়া ভালুকা রেঞ্জ বন বিভাগের শত কোটি টাকার সরকারি জমি এখন প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের পকেটে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এমপি বাচ্চুর প্রভাবে চলছে বনভূমি দখল, ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর নৃশংস হামলার ঘটনা। সরকারি হাট-বাজারের ইজারা থেকে শুরু করে প্রতিটি ব্যবসা কেন্দ্রেই এই প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয়। সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
বিএনপির শোকজ
সবশেষ শনিবার ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ ও বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠায় তার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরে এই নোটিশ পাঠানো হয়। এতে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ ও বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগের বিষয়ে ফখর উদ্দিন আহমেদের কাছে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।
একই অভিযোগে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরে তাকে একটি আনুষ্ঠানিক কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছে। নোটিশে তাকে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকার নয়াপল্টনস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে লিখিত জবাব দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জবাব সন্তোষজনক না হলে দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
২০২৪ সাল পরবর্তী সময়ে ময়মনসিংহের ভালুকায় বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছিল ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর বিরুদ্ধে। তখন তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।
এবারের চিঠিতে সেই প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলা হয়, ৫ আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী সময়ে দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলের সকল পর্যায়ের পদ থেকে আপনাকে গত ১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে বহিষ্কার করা হয়েছিল। কৃত অপরাধের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে আবেদন করার পরিপ্রেক্ষিতে দলীয় সিদ্ধান্ত মোতাবেক উক্ত বহিষ্কারাদেশ গত ২৪ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে প্রত্যাহার করে আপনার প্রাথমিক সদস্যপদ ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু আপনি ও আপনার ঘনিষ্ঠ লোকজন আবারও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে নানা ধরনের অনৈতিক অপতৎপরতায় লিপ্ত থাকার অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। আপনার বিরুদ্ধে এ ধরনের অনৈতিক কার্যকলাপের জন্য কেন সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, তার যথাযথ কারণ দর্শিয়ে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে একটি লিখিত জবাব দলের নয়াপল্টনস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জমা দেওয়ার জন্য আপনাকে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
যা বললেন এমপি
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু দাবি করেছেন, তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ। তিনি বা তার পরিবারের কেউ ঝুট অথবা পাটের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নন। কোনও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাছে চাঁদা দাবি করেননি। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।








