দিনাজপুরে ধানকাটা, মাড়াই মৌসুম শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে কৃষকদের মনে। উৎপাদন মৌসুমের শুরুতেই ধানের যে মূল্য তাতে আর কিছুদিন পরে ধানের মূল্য কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। ফলে প্রতিবারের মতো এবারও লোকসানের আশঙ্কায় হতাশ কৃষকরা।
এদিকে, প্রতি বছরই সরকার কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনা হবে বলে ঘোষণা দিলেও কোনও কৃষকই জানেন না কোন কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা হয়। জেলা খাদ্য গুদাম কিংবা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে এসব কৃষকের তালিকা থাকার কথা থাকলেও পাওয়া যায়নি কোনও তালিকা।
দিনাজপুরের কাউগাঁ, পাঁচবাড়ী, গোপালগঞ্জসহ অন্যান্য বাজারে নতুন বোরো ধান বিক্রি হচ্ছে সাড়ে চারশ’ থেকে পাঁচশ’ টাকা মন দরে। আর একই জাতের পুরাতন ধান বিক্রি হচ্ছে সাড়ে পাঁচশ’ থেকে ছয়শ’ টাকা মন দরে। এছাড়াও বিরামপুর, পার্বতীপুর, ঘোড়াঘাটসহ উত্তরের এলাকাগুলোতে এসব ধান বিক্রি হচ্ছে ৪২০ থেকে ৪৮০ টাকা মন দরে।
বাজারে ধান বিক্রি করতে আসা কৃষকরা জানান, নতুন ধান বাজারে উঠতে না উঠতেই ধানের বাজার পড়তে শুরু করেছে। মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে মনপ্রতি ধানের মূল্য কমেছে ৫০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত। পুরোপুরিভাবে ধান উঠলে বাজার আরও পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
কৃষকরা জানান, এক বিঘা (৪৮ শতাংশ) জমিতে বোরো ধান উৎপাদন করতে প্রায় ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা খরচ হয়। হিসেব মতে, চলতি বাজারে আমন ধান সর্বোচ্চ পাঁচশ’ টাকা মন দরে বিক্রি হলে ৩৫ মন ধানের দাম দাঁড়ায় সাড়ে ১৭ হাজার টাকা। যাতে করে কৃষকের লোকসান দাঁড়ায় বিঘা প্রতি আড়াই হাজার টাকা। আর ধানের উৎপাদন কম হলে বাড়বে লোকসানের বোঝা। তবে যেসব কৃষক বর্গায় নয়, নিজের জমিতে বোরো আবাদ করেছেন তাদেরকে লোকসান গুনতে হবে না।
দিনাজপুর সদর উপজেলার মাধবপুর গ্রামের আজিজার রহমান জানান, চলতি মৌসুমে এখনও ধান উঠা শুরু হয়নি। এরই মধ্যে ধানের মূল্য কমতে শুরু করেছে। সরকার ধানের মূল্য নির্ধারণ করলেও এর বাস্তবায়ন হয় না। কোন কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা হয় তা এখনও তারা জানেন না। ফলে প্রতি বছরই লোকসান গুনতে হয় তাদের আর মাঝখানে লাভবান হন মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা।
শেখপুরা এলাকার কৃষক নুর ইসলাম নয়ন জানান, এক বিঘা জমিতে যে পরিমাণ খরচ হয় তাতে নিন্মবিত্ত কিংবা নিন্ম মধ্যবিত্ত কৃষকদের লোকসান গুনতে হয়। তাছাড়া সবেমাত্র নতুন ধান উঠতে শুরু করেছে। এখনই ধানের যে বাজার মাঠ থেকে পুরোদমে ধান উঠলে বাজার আরও পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনা হবে, এমন কথায় প্রথম প্রথম আনন্দিত হলেও এখন সেই আশা আর করেন না সাধারণ কৃষকরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর দিনাজপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক জুলফিকার হায়দার জানান, চলতি মৌসুমে দিনাজপুর অঞ্চলের তিন জেলায় (দিনাজপুর, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও) মোট ২ লাখ ৬৯ হাজার ৭৫১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে দিনাজপুর জেলায় ১ লাখ ৭৩ হাজার ৩৭৬ হেক্টর, পঞ্চগড় জেলায় ৩০ হাজার ৬৫০ হেক্টর ও ঠাকুরগাঁও জেলায় ৫৫ হাজার ৭২৫ হেক্টর জমি। আর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ লাখ ৬৮ হাজার ৮৬৫ মেট্রিকটন চাল।
তিনি বলেন, চলতি মৌসুমে ধানের ফলন ভাল হয়েছে। ফলন হলেও কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না স্বীকার করে তিনি বলেন, কৃষক পর্যায় থেকে যাতে করে ধান ক্রয় করা হয় এজন্য কৃষকদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনা হবে এবং তাদেরকে ব্যাংক চেকের মাধ্যমে মূল পরিশোধ করা হবে। ফলে এ বছর কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ধান ন্যায্য মূল্যে সরকারকে দিতে পারবে। তবে যেহেতু ধানের উৎপাদন আগের তুলনায় বহুলাংশে বেড়েছে তাই বাজারে ধানের মূল্য একটু কম থাকে।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত চার বছর ধরে ধান ঘরে তোলার আগে ভাগেই ধান-চালের ক্রয়মূল্য নির্ধারণ ও সংগ্রহ অভিযান করছে সরকার। গত বছরও এক লাখ মেট্রিকটন ধান সংগ্রহ করা হয়েছিল। যার মধ্যে দিনাজপুর থেকে নেওয়া হয়েছিল প্রায় ছয় হাজার মেট্রিকটন। তবে যাদের কাছ থেকে এসব ধান সংগ্রহ করা হয়েছিল সেই কৃষকদের তালিকা দিতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আব্দুল কাদির বলেন, এবার যেন কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনা হয় সেজন্য কৃষকদের নিজ নামে কার্ড ও তাদের নিজস্ব একাউন্টের (একাউন্ট পে চেকের) মাধ্যমে ধানের মূল্য পরিশোধ করা হবে। এতে করে কৃষকের নাম করে অন্য কেউ ফায়দা নিতে পারবে না। আর সত্যিকার অর্থে কৃষক যারা, ইতিমধ্যেই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে তাদের নাম দিতে বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, ১৪ শতাংশ ময়েশ্চারে কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনা হবে। কিন্তু কৃষক পর্যায় থেকে এই মানের ধান পাওয়া যায় না। তাই সব ক্রয় কেন্দ্রে যদি ড্রায়ার মেশিন স্থাপন করা হয় তাহলে কৃষকদের কাছ থেকে ধান ক্রয়ে সুবিধা হবে।
আগের চেয়ে বর্তমানে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, গত বছর যেসব কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা হয়েছিল সেই তালিকা খাদ্য গুদাম ব্যবস্থাপকের কার্যালয়ে রয়েছে। সেখান থেকে তালিকা পাওয়া যেতে পারে বলে জানান তিনি।
কৃষকদের তালিকার বিষয়ে জানতে চাইলে খাদ্য গুদামের উপ-খাদ্য পরিদর্শক শরিফুল আহমেদ বলেন, ‘বর্তমানে গুদামের ব্যবস্থাপক ছুটিতে আছেন। তিনি আসার পর যোগাযোগ করলে তালিকা পাবেন।’
আরও পড়ুন:
‘রাগ করে’ নিজ গায়ে আগুন দিলেন স্বামী, দগ্ধ স্ত্রীও
/বিটি/








