‘ভাইরে খালি ফটো তুইলেন না। আমাগোর কিছু সাহায্যও কইরা যান। খালি খালি ফটো তুইলা আপনারা কী করবান। সাংবাদিক ভাইরা, না হয় আমাগোর নাম লিস্টি কইরা নিইয়া যান। নাম লিস্ট কইরা নিইয়া গ্যাইলে, আমরা কিছু পাইবার পারমু। আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে এ কথাগুলো বলছিলেন আনোয়ারা বেগম, তিনি সিরাজগঞ্জ জেলার বন্যা উপদ্রুত কাজিপুর উপজেলার মাইজবাড়ি ইউনিয়নের বিলবতর গ্রামের দিনমজুর বেলাল হোসেনের স্ত্রী। সোমবার দুপুরে ওই এলাকায় বানভাসি মানুষজনের হালচাল সরেজমিনে দেখতে গিয়ে ছবি তোলার সময় সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।
শুধু আনোয়রা বেগম নন, দিন মজুর মোহাম্মদ আলীর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী মর্জিনা বেগম,সন্তোষ শেখের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী তাহেরা খাতুন,প্রতিবন্ধী সুফিয়া খাতুনসহ বিলচতল এলাকায় পাউবোর বাঁধে আশ্রিত শতাধিক বানভাসি নারী-পুরুষের সবারই একই আকুতি। সাংবাদিকরা যতক্ষণ ওই এলাকায় ছিলেন, নামের তালিকা করানোর জন্য পেছনে পেছনে হন্যে হয়ে ঘুরেছেন এসব বন্যার্তদের অনেকেই।
জেলা সদর, শাহাজাদপুর, চৌহালী ও বেলকুচি উপজেলায় যমুনা পাড়ের ৩০টি ইউনিয়নের মতো কাজিপুর উপজেলার ৯টি ইউনিয়নও প্লাবিত হয়েছে। যমুনাপাড়ের অন্যান্য উপজেলার দুই লাখ মানুষের সঙ্গে কাজিপুরের এসব ইউনিয়নের ৮০টি গ্রামের প্রায় অর্ধলক্ষাধিক মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। যমুনার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গত ২০/২৫ দিন হলো কাজিপুরে পাউবোর বাঁধসংলগ্ন এবং আশেপাশের এসব গ্রাম প্লাবিত হয়। ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে যাওয়ায় এসব এলাকার বন্যাদুর্গতরা বাঁধে, উঁচু স্থানে ও স্কুল-কলেজে আশ্রয় নেন। বিশুদ্ধ খাবার পানি ও পয়-নিষ্কাশনের সংকট দেখা দিয়েছে। সরকারিভাবে ত্রাণ সরবরাহ করা হলেও তা একেবারে অপ্রতুল। বছর বছর এসব এলাকায় বন্যা হওয়ায় এ অঞ্চলের লোকজন অনেকটেই সহনশীল হয়ে গেছেন। নিজেরাও সংগ্রাম করতে শিখেছেন।
এদিকে, যমুনার নদীর পানি গত ২৪ ঘন্টায় ১৯ সে. মি কমায় সোমবার জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ডুবে যাওয়া ঘরবাড়ি থেকেও পানি নামতে শুরু করায় বন্যার্তদের মাঝে কিছুটা স্বস্তি দেখা গেছে। বাঁধের পাশে বসবাসরত দুর্গতরা এরই মধ্যে যে যার বাড়ি ফেরার স্বপ্নও দেখতে শুরু করেছেন। জেলায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও দুর্ভোগ কমেনি বানভাসি মানুষের। এখনও প্রায় আড়াই লাখ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় জীবনযাপন করছেন। এসব মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে বিভিন্ন রোগব্যাধি।
স্থানীয় পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ হাসান ইমাম জানান, যমুনার পানি সিরাজগঞ্জ শহর রক্ষা বাঁধ পয়েন্টে এখন ১৩.৯৭ মিটার রয়েছে (স্বাভাবকি ১৩.৫৩ মিটার)। গত ২৪ ঘণ্টায় ১৯ সে.মি পানি কমলেও নদী তীরবর্তী অঞ্চলগুলোতে ভাঙনের সম্ভাবনা দেখা রয়েছে। আমরা সার্বক্ষণিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো পর্যবেক্ষণ করছি।
জেলা প্রশাসক মো. বিল্লাল হোসেন জানান, সরকার দুর্গতদের পাশে আছে। যথেষ্ট পরিমাণ ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। বন্যা পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনেরও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এদিকে, ত্রানমন্ত্রী মোফাজ্জেল হোসেন মায়া সোমবার বিকেলে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কাওয়াখোলা চরে পাচঁশ’ জন বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেন। টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, জামালপুর হয়ে স্পিডবোটে করে সিরাজগঞ্জ এসে তিনি যমুনা চরে ত্রাণ বিতরণে অংশ নেন,জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা ওয়ালী উদ্দিন জানান এ তথ্য জানিয়েছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য ডা. হাবিবে মিল্লাত মুন্না, সাবেক মন্ত্রী ও জেলা পরিষদের প্রশাসক আব্দুল লতিফ বিশ্বাস, জেলা প্রশাসক মো. বিল্লাল হোসেন, পুলিশ সুপার মিরাজ উদ্দিন আহম্মেদসহ স্থানীয় জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ এ সময়ে উপস্থিত ছিলেন।
এপিএইচ/








