‘বানের পানিতে আমাগোর ঘরবাড়ি ডুইব্যা গেল। গরু-বাছুর, হাঁস-মুরগি, ছাগল-বকরি নিয়া বাঁধে উঠি। ঝুপড়ি তুলে নতুন ঘর-সংসার পাতি। সরকার থ্যাইকা ১০ সের চাইল ইলিপও (রিলিফ) পাই। আমাগোর হাতেও কিছু ছিল। খাওয়ান-দায়োনের সমস্যা ছিল না। ঘরে চাল ছিল, হরকার থ্যাইকাও কিছু ইলিপ, সব মিইলা আমরা ভালই ছিলাম। এহুন চিন্তা একটাই, কবে বাড়ি ফিরমু। নদীর পানি কমতে ল্যাগছে। বাঁধে থাকবার আর ভাল লাগে না। পায়হানা-পিশাব (প্রাকৃতিক কাজ) করা মুশকিল। তিন মাইয়া ছিল, বিয়ে-সাধি দিইয়া দিছি। ছাওয়াল ছিল একটাই। কত সাদ কইরা বিয়ে দিলাম। বিয়ের পর হে বৌ নিইয়া আমাক ফ্যালাইয়া থুইয়া চইল্যা গেছে। হেও আমার খোঁজ-খবর লয় না। মানষের বাড়িত কাম কইরা খাই। পানি কমলেই বাড়িত ফিরমু। এহুন এইটাই স্বপন। বছর বছর বান হয়। আমাগো সব সইয়া গেছে।’ কথাগুলো বলছিলেন সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ছোনগাছা ইউনিয়নের পাঁচঠাকুড়ী বাঁধে আশ্রয় নেওয়া বিধবা শহরবানু। গত প্রায় এক মাস পাউবোর বাঁধে থেকে হাফিয়ে উঠেছেন তিনি। গত বছরও বন্যায় তিনি এ বাঁধে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
শুধু শহরবানু নন, সদর উপজেলার এ বাঁধে বানভাসিরা যারা বানের কারণে নিজেদের বসতভিটা ও ঘরবাড়ি ছেড়ে ঘর-সংসার বেঁধেছিলেন, যমুনার পানি কমতে শুরু করায় তারা এখন নিজ নিজ বসতভিটায় ফেরার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। জেলার সদর, কাজিপুর, শাহজাদপুর, চৌহালী ও বেলকুচি উপজেলার পাউবোর অন্যান্য বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধে যারা আশ্রয় নেন, তারাও এক ধরনের প্রহর গুনছেন বলে মঙ্গলবার সরেজমিনে ও স্থানীয়ভাবে জানা যায়। কিন্তু, এ মাসের মাঝামাঝিতে আবারও বন্যার সম্ভবনা রয়েছে। পাউবো এমন আশঙ্কা করলেও বাঁধে আশ্রিত বানভাসিরা ঘরে ফেরার প্রহর গুনছেন।
মঙ্গলবার জেলার কাজিপুর উপজেলার মাইজবাড়ি ইউনিয়নের বিলচতল গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বেলাল হোসেন ও তার স্ত্রী আনোয়ারা বেগম ছেলেমেয়ে নিয়ে ঢেঁকুরিয়া তীর রক্ষা বাঁধের পাশে নিজ বাড়িতে ফিরে ঘরবাড়ি পরিপাটি করছেন। ঘর থেকে পানি নেমে গেছে, কিন্তু উঠানে এখনও পানি রয়েছে। ঘরের চৌকি যমুনার পানিতে নিয়ে কাঁদামাটি পরিষ্কার করতে দেখা গেছে ওই দম্পতিকে। এমনকি, ঘরের ডোয়া লেপতেও দেখা গেছে আনোয়ারা বেগমকে। বিলচতল ও ঢেকুরিয়া গ্রামের অনেকেই এ ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তারা জানেন না ফের আগাম বন্যার কথা।
বুধবার সকালে পাউবোর পানি পরিমাপক (গেজ রিডার) আবু বকর সিদ্দিক জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় সিরাজগঞ্জে জেলা পয়েন্টে যমুনার পানি ফের ২০ সে.মি. কমেছে। তারপরেও যমুনার পানি এখানে বিপদসীমার ৩২ সে.মি. ওপরে রয়েছে। পানি কমতে শুরু করায় বানভাসিরা নিজেদের ঘরবাড়ি ও বসতভিটায় ফেরার স্বপ্ন দেখলেও এ মাসের মাঝামাঝি সময়ে ফের বন্যার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ হাসান ইমাম। বন্যার পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী ১৫ আগস্টের পর আরও একটি বন্যা উঁকি দিচ্ছে। তাই এ মুহূর্তে বানভাসিদের ঘরবাড়িতে ফেরা ঠিক হবে না। আরও দুসপ্তাহ অপেক্ষা করা উচিত।
আরও পড়ুন:
কল্যাণপুরে নিহত জঙ্গি অর্কসহ তিনজনের আইএস স্টাইলে ধারণ করা অডিওবার্তা
/বিটি/








