‘চোখের সামনে স্বামীরে চুবাইয়া মারলো, ক্যারে আমি প্রতিবাদ করলাম’

তানভীর হোসেন, নারায়ণগঞ্জ
০৪ আগস্ট ২০১৬, ১৬:২১আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০১৬, ১৬:২৪

‘চোখের সামনে স্বামীরে চুবাইয়া মারলো, ক্যারে আমি প্রতিবাদ করলাম’ ‘মাদক ব্যবসায় কখনও জড়িত ছিল না। সিগারেট খাইতো মাঝে মধ্যে। বিকালে যখন দোকান যাইবার লাগছিল তহন আমি তারে কই আমাকে কিছু খের (খড়) আইন্না দাও। তহন আমার সাথে ব্যাগারে কইরা খের আনতে গিয়ে রাস্তা পারাপারের সময় মোটরসাইকেল ধাক্কা দেয়। আমি গিয়া প্রতিবাদ করতে গিছিলাম আর তহনই এক জানোয়ার আমার স্বামীরে চোখের সামনে পানিতে চুবাইয়া মারছে, আমি কেমনে নিজেরে সান্ত্বনা দিমু’।
বৃহস্পতিবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও পৌরসভার রাইজদিয়া গ্রামে দিয়ে আবদুল মতিনের বাড়ির উঠানে বিলাপ করে এসব কথা বলতে থাকেন স্ত্রী নূরতাজ বেগম।
বেশ কিছুক্ষণ পর কান্না থামিয়ে জানান বুধবারের সেই ঘটনা যার প্রধান প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন তিনি।
বাংলা ট্রিবিউনকে নূরতাজ বেগম বলেন, ‘আমি বাড়িতে গরু পালি।  আগে মুরগি পালতাম এখন সেটা বন্ধ। বুধবার আমার স্বামী দোকানে যাওয়ার সময়ে আমিও তার সঙ্গে বের হই। আমাকে কিছু খড় দেওয়ার জন্য বলি তাকে। দুইজন একসঙ্গে খড় বের করে একটি ব্যাগে ভরি। তখন দুইজন লোক সাদা পোশাকে (একজন ছিলেন এএসআই  ফখরুল ইসলাম ও অপরজন কনস্টেবল আরিফুর) মোটরসাইকেলে যাচ্ছিল। রাস্তার মধ্যে আমার স্বামীকে মোটরসাইকেল দিয়ে ধাক্কা দিলে সে রাস্তার পাশে খাদে পড়ে যায়। সেখানে জলাশয় আছে। পুকুরের মত অবস্থা জলাশয়টির। তখন আমি গিয়েই প্রথম প্রতিবাদ করি। বলি আপনারা চোখ খোলা রেখে মোটরসাইকেল চালাতে পারেন না। আমার ওই কথার পরে মোটরসাইকেলে থাকা দুইজন আমাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে। তখন পানিতে পড়ে যাওয়া আমার স্বামীর হাতে ব্যাগ দেখে বলে ‘ও মাদক বিক্রেতা ওরে ধর’। তখন আমি আবারও প্রতিবাদ করি। আমার স্বামীও প্রতিবাদ করে বলে, না জেনে মিথ্যে কথা বলবেন না। পরে ধীরে ধীরে মোটরসাইকেলে থাকা দুইজন বলে আমরা আইনের লোক, আমরা পুলিশ, আমাদের সঙ্গে তর্ক করিস! কত বড় সাহস, ধর ওকে। তখন আবদুল মতিন ভয়ে পানি থেকে ওঠার চেষ্টা করলে মোটরসাইকেলে থাকা একজন (কনস্টেবল আরিফ) পানিতে নেমে মতিনকে চুবাতে থাকে।

নূরতাজ বেগম আরও বলেন, আমি দ্রুত তখন বাড়িতে গিয়ে আশেপাশের লোকজনদের বিষয়টি জানাই। ততক্ষণে গিয়ে দেখি নৌকায় করে ওই লোক ঘোরাঘুরি করছে। পরে লোকজন এসে আমার স্বামীকে খুঁজতে পানিতে নামে। শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। আধাঘণ্টা পর উদ্ধার করে আবদুল মতিনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে ডাক্তাররা মৃত ঘোষণা করেন। আমরাতো আর জানি না ওই ব্যক্তি ছিল পুলিশ। কারণ তাদের একজন শার্ট আর অপরজন ছিল গেঞ্জি পড়া। আর তাদেরতো আমরা চিনি না।

অন্যদিকে, বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী কনস্টেবল আরিফকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। তীরে উঠতে চেষ্টা করলে তাকে মারধর ও পিটুনি দেয় গ্রামের লোকজন। অবস্থা বেগতিক দেখে মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যান এএসআই  ফখরুল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নারী ও পুরুষ জানান, মতিন পানিতে পড়ে যাওয়ার পরেই আরিফ পানিতে নেমে মতিনকে মারধর করতে থাকেন। তখন দুইপক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়।  একপর্যায়ে মতিন পানিতে তলিয়ে যান। পরে যারা আরিফুরকে ইটপাটকেল ও পিটুনি দিয়েছে তাদের বেশিরভাগ লোকজনই আবদুল মতিনের পরিবারের লোকজন। তাদের সঙ্গে আরও কয়েকজন আত্মীয়-স্বজনও উপস্থিত ছিলেন।

বুধবার বিকালের ওই ঘটনার পর আবদুল মতিনের লাশ আনা হয় বাড়িতে। রাতে পুলিশ এসে লাশ নিয়ে যায় জানান নূরতাজ বেগম। পরে বৃহস্পতিবার সকালে পুলিশ লাশ ময়নাতদন্তের জন্য নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।

তবে নিহতের স্ত্রীর ওই বর্ণনার সঙ্গে একমত পোষণ করতে পারেনি সোনারগাঁও থানা পুলিশ। ওই এএসআই ফখরুল ইসলাম জানান, তিনি কনস্টেবল আরিফকে নিয়ে কয়েকটি মামলার তদন্ত করতে বের হন। পথিমধ্যে রাইজদিয়া সরকারি প্রাথমিক স্কুলের সামনে আবদুল মতিন তাদের দেখে পালানোর চেষ্টা করে। তার হাতে ব্যাগ ছিল। আমাদের ধারণা সে কোনও মামলার আসামি কিংবা মাদক বিক্রেতা। পরে অবশ্য জানতে পারি সে স্থানীয় মাদক কারবারির একজন। আমাদের দেখে মতিন পানিতে ঝাপ দেয়। তখন তাকে খুঁজতে যায় আরিফুর। কিন্তু ওই সময়ে উত্তেজিত এলাকার লোকজন আমাদের উপর হামলা চালালে আমি চলে আসি।

সোনারগাঁও থানার ওসি মঞ্জুর কাদের বলেন, আমরা খোঁজ-খবর নিয়ে জানতে পেরেছি মতিন মাদক বিকিকিনি করতো। তার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ আছে। যদিও তার বিরুদ্ধে থানায় কোনও মামলা নেই। আর যদি মতিন মাদক ব্যবসা না করতো তাহলে সে পুলিশ দেখে পালাবে কেন? পুলিশ দেখে পালানোর কারণেই তাকে ধরতে যায় পুলিশ। তাছাড়া আমাদের পুলিশ তো সাদা পোশাকে ছিল তাহলে সাদা পোশাকের লোক দেখে কেন মতিন পালাতে গেল। তার কাছে তখন মাদক ছিল। পরে তাকে বাঁচাতে মাদক বিক্রেতা সহযোগিরা চলে আসে।

তবে স্থানীয় একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আবদুল মতিন মাদক বিক্রির সঙ্গে সম্পৃক্ত না। তবে সে প্রায়ই গাঁজা সেবন করতো। বিষয়টি এলাকার সবাই জানে।

আবদুল মতিন মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত পুলিশ এমন বক্তব্য দিলেও সেটা একেবারেই মানতে নারাজ তার পরিবার। নিহতের স্ত্রী নূরতাজ বেগম জানান, তার স্বামীকে তিনি সিগারেট পান করতে ছাড়া আর কিছুই করতে দেখেননি। মাদক বিক্রির অভিযোগ একেবারেই সত্য না।

নূরতাজ বেগম বলেন, আমার স্বামীকে মেরে ফেলা হয়েছে। আমি স্বামী হত্যার বিচার চাই। আমরা মামলা করবো। কিন্তু উল্টো আগেইতো আমাদের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিছে। আর আমরা গরীব মানুষ। আমাদের মামলা কী আর পুলিশ নিবে?

মতিনের পানাম পুল সংলগ্ন আদমপুর বাজারে পানের দোকান ছিল। আদমপুর বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি কামাল হোসেন জানান, মতিনের বিরুদ্ধে মাদক বিক্রির কোনও অভিযোগ আমরা আগে পাইনি।

এদিকে, আদমপুর বাজারে মতিনের পাশের দোকানদার সজীব জানান, তিনিও কখনও মতিনের বিরুদ্ধে মাদক বিকিকিনির অভিযোগ পাননি।

সোনারগাঁও পৌরসভার সংরক্ষিত নারী (৪, ৫ ও ৬ নং ওয়ার্ড) কাউন্সিলর জায়েদা আক্তার মনি বলেন, আমি যতটুকু জানি মতিন পানের দোকানদারি করতো। আমার জানা মতে সে খুব ভাল লোক ছিল। কখনও তার বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ শুনিনি।

আরও পড়ুন:
নারায়ণগঞ্জে কনস্টেবল নিহতের ঘটনায় পুলিশের মামলা

/বিটি/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম