পাঠ্য-বইয়ের খবর নেই, মগজে ‘সাধারণ জ্ঞান’

সিরাজুচ ছালেকীন, রাবি
৩০ আগস্ট ২০১৬, ১৫:৩২আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০১৬, ১৬:৪৮

বিশ্ববিদ্যালয়ের শের-ই-বাংলা হল থেকে তোলা ছবি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) পাঠ্য বইয়ের প্রতি অধিকাংশ শিক্ষার্থীর আগ্রহ নেই। যে বিভাগেই পড়ুক না কেন, সবারই আগ্রহ চাকরিকেন্দ্রিক পড়াশোনায়। অর্থাৎ, বাংলা, ইংরেজি আর সাধারণ জ্ঞানে। ফলে নিজ-নিজ বিষয়ে যৎসামান্য জ্ঞান নিয়ে ‘ক্যাম্পাস-লাইফ’ শেষ করছেন শিক্ষার্থীরা। এ জন্য অবশ্য শিক্ষার্থীদের দোষারোপ না করে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষাবিদরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অ্যাপলাইড ফিজিক্স অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং’ বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী রাকিব। বিজ্ঞান শাখায় পড়াশোনা করলেও প্রথম বর্ষ থেকেই চাকরিকেন্দ্রিক সাধারণ জ্ঞান ও অন্যান্য বই কেনা শুরু করেন তিনি। অ্যাকাডেমিক পড়াশোনা বলতে বিভাগের বড় ভাই-বোন ও ফটোকপির দোকান থেকে পাওয়া গৎবাঁধা নোট-পত্র। তাও পড়া হয় কেবল পরীক্ষা আসলে। বাকি সময় চাকরিকেন্দ্রিক পড়াশোনা নিয়েই ব্যস্ত থাকেন রাকিব।

রাকিবের পড়াশোনার টেবিলে চাকরিকেন্দ্রীক বইপত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও অনেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে বাংলা ট্রিবিউনের এই প্রতিবেদক কথা বলেছেন। প্রায় সবারই লেখাপড়ার ধরন রাকিবের মতো।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে নজর দিলেও শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার হালচাল বোঝা যায়। গ্রন্থাগারে পড়াশোনার সবরকম সুযোগ-সুবিধা থাকলেও মাত্র ২০-২৫ জন শিক্ষার্থীকে সেখানে দেখা যায়। অথচ ‘ডিসকাশন রুম’ নামে পরিচিত গ্রন্থাগারের একটি কক্ষে বসার জন্য রীতিমতো প্রতিযোগিতায় নামতে হয় শিক্ষার্থীদের। সেখানে তারা বাংলা, ইংরেজি আর সাধারণ জ্ঞান নিয়ে ‘গ্রুপ-স্টাডি’ করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে ক্যারিয়ার গঠনের নামে চালু আছে অনেক কোচিং সেন্টার। সেখানেও পড়ানো হয় বাংলা, ইংরেজি আর সাধারণ জ্ঞান। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব জায়গায় দিনের পর দিন চলছে এসব কোচিং বাণিজ্য।

বাংলা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নতুন-নতুন গবেষণার ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। যে গবেষণাগুলো হচ্ছে, তাও আবার বড় ভাই-বোনদের কাছ থেকে পাওয়া গবেষণাপত্রের কপি। একই গবেষণাপত্র চক্রকারে ঘুরছে। শুধু নাম পরিবর্তন করে পার পেয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ফটোকপির দোকানে টাকার বিনিময়েও মেলে গবেষণাপত্র।

শিক্ষার্থীদের মতে, চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে পাঠ্যবই কাজে দেয় না। এ ক্ষেত্রে সাধারণ জ্ঞান, বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের বিকল্প নেই। একজন শিক্ষার্থী যে বিভাগ থেকেই পাস করুক না কেন, সে চাকরির জন্য এসব পড়তে বাধ্য।

গণিত বিভাগের তৃতীয় বর্ষের রুম্মান শিকদার বলেন, ‘গণিত বিভাগে পড়ি। কিন্তু চাকরি পেতে হলে সাধারণ জ্ঞান, বাংলা, ইংরেজির বিকল্প নেই। আর দেশে চাকরির বাজারে যে প্রতিযোগিতা, তাতে তো সাধারণ জ্ঞান না পড়ে উপায় নেই।’

ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী গোলাম মোর্শেদ বলেন, ‘আমাদের একটা কালচার দাঁড়িয়ে গেছে যে, বিসিএস ক্যাডারকে আমরা সফল শিক্ষার্থী বলি। তাই সবাই সেদিকে দৌঁড়াচ্ছেন।’

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের আলামিন শাহ বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন। সাধারণ জ্ঞান না পড়লে তো সম্ভব নয়! তাই বিভাগের পড়াশোনায় গুরুত্ব দেওয়া হয় না।’

এ বিষয়ে শিক্ষাবিদ ও ইমেরিটাস অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সমস্যা আছে। দিন-দিন মুখস্থ বিদ্যার দিকে ঝুঁকছে শিক্ষার্থীরা। আগের বছরের দু-এক সেট প্রশ্নপত্র সমাধান করলেই তারা ভালো ফল করতে পারছে। ফলে বছরের পর বছর তারা একই বিষয় পড়ছে। নতুন কোনও বিষয় নিয়ে তাদের মাথা ঘামাতে হচ্ছে না। তাহলে শিক্ষার্থীরা কেন অ্যাকাডেমিক পড়াশোনা করবে?’

কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের বেশির ভাগ আসন ফাঁকা শিক্ষকদের গাফিলতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের শিক্ষকরা নতুন কোনও বিষয় পড়াতে চান না। কেননা তারা নিজেরাই পড়াশোনা করেন না। ঘুরেফিরে একই বিষয় শিক্ষার্থীদের পড়ান।’

অরুণ কুমার বসাকের মতে, ‘এ সমস্যা দূর করতে হলে এক পরীক্ষা থেকে আরেক পরীক্ষার মধ্যবর্তী ব্যবধান কমিয়ে শূন্যের কাছাকাছি নিয়ে আসতে হবে। তাহলে মুখস্থ নির্ভর হয়ে ভালো ফল করা সম্ভব হবে না। এ পদ্ধতিতে বিষয়গত ধারণা থাকা পরীক্ষার্থীরাই ভালো ফল করবে। শিক্ষার্থীদের কনসেপ্ট ও যুক্তিবুদ্ধি জাগ্রত হতে বাধ্য হবে। আর তখন শিক্ষার্থীরা অ্যাকাডেমিক পড়াশোনায় বেশি-বেশি সময় দেবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও শিক্ষা পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক মুহম্মদ মিজানউদ্দন শিক্ষাক্ষেত্রে গুণগত মান কমে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শুধু শিক্ষার্থীদের দোষ দেব না। যিনি শিক্ষা দিচ্ছেন, তারও ত্রুটি আছে, যিনি গ্রহণ করছেন তারও ত্রুটি আছে। একটা লেকচার দিলেই শিক্ষকের দায়িত্ব শেষ হয় না, শিক্ষার্থীরা কতটুকু বুঝলো, কতটুকু অনুসরণ করলো, সেটা দেখতে হবে।’

উপাচার্য বলেন, ‘আমরা একটা সংকটে পড়েছি। শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি নিয়ে যাচ্ছে; কিন্তু যোগ্যতাসম্পন্ন হয়ে উঠছে না। আবার তারাই বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দিচ্ছেন। সেখানে তারা সেভাবেই পড়াশোনা করাচ্ছেন। এভাবে শিক্ষাক্ষেত্রে গুনগত মান কমে যাচ্ছে।’

/এআরএল/

আরও পড়ুন: 

মীর কাসেমের ফাঁসির রায় বহাল

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম