বগুড়ায় যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। বুধবার বিকালে যমুনার পানি বেড়ে বিপদসীমার ৫৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে সারিয়াকান্দিতে নতুন করে বন্যা কবলিত হয়েছে আরও ৭টি এবং সোনাতলায় ১০টি গ্রাম। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সারিয়াকান্দি। প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার কারণে দুর্গতরা ঘরবাড়ি ভেঙে ও ছেড়ে বাঁধে বা নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছেন।
বন্যার অবনতির সঙ্গে সঙ্গে বন্যার্তদের দুর্ভোগও বেড়েছে। বাড়িঘর ছেড়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলো গবাদি পশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। নিজেদের পাশাপাশি গবাদি পশুর খাবার সঙ্কট দেখা দিয়েছে। অনেক এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানির সঙ্কটও দেখা দিয়েছে।
বুধবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকা ঘুরে বন্যার্তদের দুর্ভোগ দেখা যায়। অন্তত এক হাজার পরিবার বিভিন্ন বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে। কুতুবপুরের রওশন বেগম এক সপ্তাহ আগে ৯ সদস্যের পরিবার ও গবাদি পশু নিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন। পাটখড়ি দিয়ে তৈরি ঘরে পশুর সঙ্গে গাদাগাদি করে থাকছেন। তারা একবার মাত্র ২০ কেজি চাল পেয়েছিলেন।সবদিকে পানি থাকায় তারা নিজেদের চেয়ে গবাদি পশুর খাবার নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।
ধলিরকান্দি এলাকার আশাদুল ইসলাম সাত সদস্যের পরিবার নিয়ে একই বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন। বাঁধের পূর্ব পাশে তাদের বাড়ি। বাড়ি প্রায় ডুবে গেছে। গত ৮ দিন আগে তারা বাঁধে এসেছেন। খুলে আনা টিন দিয়ে বাঁধের ওপর ঘর করেছেন। তারাও একবার ২০ কেজি চাল পেয়েছেন।
চন্দনবাইশা ইউনিয়নের ঘুঘুমারী বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন, নিঃসন্তান বৃদ্ধা মিছি বেওয়া (৯৫)। সঙ্গে তার ভাই দিনমজুর বুলু মিয়াসহ সাত সদস্যের পরিবার। মিছি বেওয়া জানান, তিনি ২০ বছর আগে বিধবা হয়েছেন। শুধু এ বন্যায় নয়, আগেও কোনও সরকারি সহায়তা পাননি। ভাই বুলু মিয়া জানান, তিনি অনেক কষ্টে ২০ কেজি চাল পেয়েছেন। সে চালও শেষের পথে। দিনমজুরি করে কোনভাবে খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছেন।
কুতুবপুর ইউনিয়নের পুরাতন পরিত্যাক্ত বাঁধে পরিবারের সাত সদস্য নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন, দিনমজুর আসাদুল আকন্দ। তিনি জানান, ২০ কেজি চাল পেয়েছেন। অর্ধাহার-অনাহারে দিন কাটছে। একই বাঁধে আশ্রয় নেওয়া ধলিরকান্দির দিনমজুর ইসমাইল হোসেনের (৬৫) বাড়িঘর ডুবে গেছে। পরিবারের সদস্য সাত জন। সকালে পান্তা ও রাতে শাক, আলু ভর্তা দিয়ে ভাত খাচ্ছেন। শুধু একবার ২০ কেজি চাল পেয়েছেন। এরপর আর কেউ খোঁজ নেয়নি। একই অবস্থা সব বাঁধে।
বগুড়া জেলা ত্রাণ অফিস জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ৩ উপজেলার ৯২টি গ্রাম বন্যা কবলিত হয়ে প্রায় ৭২ হাজার মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার পরিবার।
নতুন করে প্লাবিত হয়েছে সারিয়াকান্দি ও সোনাতলার ১৭টি গ্রাম। সারিয়াকান্দির ১১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৯টি ইউনিয়নে ১১ হাজার ২১০ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
জেলা প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী এ পর্যন্ত ১৯০ মেট্রিক টন চাল ও নগদ আড়াই লাখ টাকা বন্যার্তদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জানান, বুধবার চকরতিনাথ ও কামারপাড়ায় ১ হাজার পরিবারের মাঝে শুকনো খাবারও বিতরণ করা হয়েছে। এ সময় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবদুস সামাদ উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে সোনাতলা উপজেলার পাকুল্যা, মধুপুর ও তেকানী চুকাইনগর ইউনিয়নের প্রায় দুই হাজার পরিবারের মাঝে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আশরাফুজ্জামান ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেন।
এসময় উপস্থিত ছিলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মির্জা শাকিলা দিল হাছিন, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান, তেকানী চুকাইনগর ইউপি চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ শামছুল হক, পাকুল্যা ইউপির চেয়ারম্যান জুলফিকার রহমান শান্ত, মধুপুর ইউপি চেয়ারম্যান অসীম কুমার জৈন নতুন প্রমুখ।
/জেবি/
আরও পড়তে পারেন: জামালপুরে দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি, পানি বিপদসীমার ৭৬ সে.মি. ওপরে








