‘স্কুলের বাচ্চাগুলা আর নদীডার জন্যি খুব মায়া লাগে। ৫০টা বছর তো এই মায়াতেই কাইটা গেল। এহন আর অন্য কিছু করতে পারবো না।’ আনমনে কথাগুলো বলছিলেন নুরোল মাঝি। মাগুরা শহরের নবগঙ্গা নদীতে ৫০ বছর ধরে নৌকা চালাচ্ছেন তিনি। তার পূর্বপুরুষরাও একই কাজ করতেন।
এতদিন নুরোল মাঝির মতো মানুষের খেয়ার পারাপারই ভরসা ছিল নবগঙ্গার দুই পারের লোকজনের। সময়ের পরিক্রমায় আর স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী এ নদীর ওপর তৈরি হচ্ছে সেতু। নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ ধাপে পৌঁছে যাওয়ায় তাই খেয়া পারাপারের কাজ করে আসা মাঝিরা নিজেদের পেশা ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। কিন্তু নুরোল মাঝি পণ করেছেন, বাপ-দাদার কাছ থেকে পেয়ে আসা এই পেশা তিনি ছাড়বেন না। বাকি জীবনটাও নবগঙ্গাতে নৌকা চালিয়েই কাটিয়ে দেবেন।
মাগুরা শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নবগঙ্গা নদীর এক পারে মূল শহর। অন্য পারে পারনান্দুয়লী গ্রাম।অনেক আগে থেকেই পারনান্দুয়ালী গ্রামের বাসিন্দারা নৌকা পার হয়ে শহরে য়াতায়াত করতো। নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নানা পেশা। কেউ খেয়া নৌকার মাঝি, কেউ জেলে, কেউ মাছ ব্যবসায়ী। এর মধ্যে গত বছর নবগঙ্গা সেতুর কাজ শুরু হওয়ার পরই বিপাকে পড়েছেন নৌকার মাঝিরা।
নুরোলের সঙ্গে যারা নৌকা চালাতেন, তাদের প্রায় সবাই এখন বিকল্প পেশা খুঁজতে শুরু করেছেন। কিন্তু বাবার হাত থেকে পাঁচ বছর বয়সে বৈঠা হাতে নেওয়া নুরোল মাঝি বাপ-দাদার পেশা ছাড়তে চান না।
নুরোল মাঝির নৌকায় পার হওয়া প্রতিটি যাত্রীর খবরা-খবরই তিনি জানেন। তাকে অনেকেই বিশেষ করে পছন্ত করে পারনান্দুয়ালী গ্রামের স্কুল শিক্ষার্থীরা। সকালে স্কুলে যেতে তাদের নুরোল মাঝির নৌকাই লাগবে পার হতে। তিনি নদীর অন্য পারে থাকলেও শিক্ষার্থীরা অপেক্ষা করে তার ফিরে আসার।
নুরোল মাঝি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নবগঙ্গা ছেড়ে যাওয়ার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারি না আমি। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি বৈঠা বাইতে চাই।’
সেতু উদ্বোধন হলে তো খেয়া পারাপার বন্ধ হয়ে যাবে, তখন কী করবেন-এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন বিকালে ঘাঁটে আসবো বাচ্চাদের নিয়ে নৌকায় ঘুরবো। শহরের মানুষদের নৌকায় ঘোরাবো। রাতে নদীতে মাছ ধরবো। ছেলেরা বড় হয়ে গেছে, ওদের নিয়ে চিন্তা নাই। আমার নৌকায় ঘুরে যে যা দেবে, তাতেই আমার চইলে যাবে।’
তিনি বলেন, ‘স্কুলের বাচ্চাগুলা আর নদীডার জন্যি খুব মায়া লাগে।এগের ছাইড়ে আর কনে যাবো!’
/এসএসএ /টিআর/এসটি/








