রোহিঙ্গা শিশু রোজিনা আক্তারের বয়স এখনও ১০ বছর পেরোয়নি। বাড়ি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপের দক্ষিণে চিতলক্ষ্যা গ্রামে। বাবা আব্দুস সালাম ছিলেন একজন দিনমজুর, মা গৃহিনী। মিয়ানমারের সেনারা তাদের ধরে নিয়ে যায়। প্রাণের ভয়ে ছয় বছরের বোন ও তিন বছরের ভাইকে সঙ্গে নিয়ে এক সপ্তাহ আগে নাইক্ষ্যংদিয়া সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে সে। উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঠাঁই হয়েছে তার। তবে এখন খাবারের জন্য, একটু মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের জন্য কোথায় যেতে হবে, কার কাছে বলতে হবে তার কিছুই বুঝতে পারছে না অভিভাবকহারা এই তিন শিশু। খাদ্যের জন্যই হন্যে হয়ে ঘুরতে হচ্ছে তাদের।
বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদককে রোজিনা জানায়, ছোট ভাই ইউনুস (৩) ও ছয় বছরের বোন জান্নাত আরা রয়েছে তার সঙ্গে। উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে ঠাঁই হলেও পেঠের ক্ষুধায় চলে এসেছে বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। খাবারের আশায় ছুটছে ক্যাম্পের এদিক-ওদিক। বুধবার বিকালে বালুখালী মাদ্রাসার গেটের সামনে তাদের দেখা মেলে।
রোজিনা জানায়, সেদিন আনুমানিক দুপুর ১টার দিকে বাবা জঙ্গল থেকে গাছ কেটে সবে মাত্র বাড়িতে এসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। এমন সময় হঠাৎ কিছু বুঝে ওঠার আগেই মিয়ানমারের সেনাবাহিনী বাড়ির চারদিক ঘিরে ফেলে। বাড়ি থেকে বাবা-মাকে ধরে নিয়ে যায় সেনাবাহিনী ও মগরা। নিয়ে যাওয়ার সময় তাদের ব্যাপক নির্যাতন চালায়। পরে সেনাবাহিনী ও মগদের গ্রামে প্রবেশের খবরে প্রতিবেশীরাও এদিক ওদিক পালাতে থাকে। কোন সময় যে ছোট দুই ভাইবোনকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ছে তার খেয়ালও নেই। একপর্যায়ে জল-জঙ্গল পেরিয়ে দুই দিন পর বাংলাদেশ সীমানায় চলে আসে অন্যদের সঙ্গে।
বাবা-মা হারানো রোজিনা বলে, ‘নিশ্চিত বাবা-মাকে হত্যা করেছে সেনাবাহিনী। ধরে নিয়ে যাওয়ার সময়ই তাদের নির্যাতন করা হচ্ছিলো। সেনাবাহিনী যখন বাবা-মাকে নিয়ে যাচ্ছিল তখন মায়ের চিৎকার শুনেছি।’
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর রোজিনা আবার বলতে শুরু করে। সে জানায়, বাংলাদেশে প্রবেশের পর না খেয়ে দিন কাটে তাদের। কুতুপালং এর রাস্তায় তারা কাঁদতে থাকে ক্ষিদার জ্বালায়। একপর্যায়ে বিজিবির এক সদস্য তার হাতে ৫০ টাকা দিয়ে কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় দেয়। এখন প্রতিদিন রাস্তায় ভিক্ষা করে যা পায় তা কোনও রকম তিন জনে খায়। একদিন খেতে পারলেও অন্যদিন না খেয়ে থাকে।
রোজিনার ছোট বোনটি হাতে একটি পানির বোতল। এই পানির বোতলই তাদের সেদিনের সম্বল। সেই কুতুপালং থেকে বালুখালী পর্যন্ত দীর্ঘপথ হেঁটে এসেও কিছু পায়নি তারা। যে ত্রাণগুলো গাড়ি থেকে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে তাও তারা পাচ্ছে না। কারণ কোলে ছোট ভাই, আরেক হাতে ধরা ছোট বোন। ‘ত্রাণ পেতে গেলে তো প্রতিযোগিতায় ঠিকে থাকতে হবে’ বলে রোজিনা।
অনাথ এই তিন শিশুর গতিবিধি দীর্ঘ সময় পর্যবেক্ষণ করেন এ প্রতিবেদক। দেখা গেছে, ত্রাণের গাড়ি থেকে বিতরণ করা ত্রাণ তো দূরের কথা, রাস্তায় মানুষের কাছ থেকে ভিক্ষাও পাচ্ছে না তারা। কারণ রোহিঙ্গাদের লাখো সত্য মিথ্যা গল্পের মাঝে এই শিশুদের কষ্টের কাহিনী কেউ শুনতে চায় না। করতে চায় না বিশ্বাসও। ভিক্ষা চাইতেই হাজারো মানুষের ধমক। তাই অসহায় এই তিন শিশুর জীবন অনেকটাই বিপন্ন।








