একসময় রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীদের ভেতর হীনমন্যতা কাজ করতো, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারলাম না! বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বড় ক্যাম্পাসে পড়ালেখার পাশাপাশি কতরকম সুযোগ-সুবিধা, তা আর রাজশাহী কলেজের ছোট ক্যাম্পাসে কোথায়? কিন্তু কয়েক বছরে কলেজ প্রশাসনের আন্তরিকতায় এই ভ্রান্ত ধারণা দূর হয়ে গেছে শিক্ষার্থীদের। এই ছোট ক্যাম্পাসেই গড়ে তোলা হয়েছে অরাজনৈতিক ২৮টি সংগঠন। যার মধ্য দিয়ে পরবর্তীতে ক্যারিয়ারে প্রবেশের সময় যোগ্যতা অনুযায়ী ঠাঁই করে নিচ্ছে ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী কলেজ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সারাদেশে দ্বিতীয়বারের মতো এবারও সেরার মুকুট ধরে রেখেছে পদ্মাপাড়ের এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি।
মঙ্গলবার বিকালে রাজশাহী কলেজ ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা যায়, একাডেমি শিক্ষা শেষে সংগঠনগুলোর ছেলেমেয়েরা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্র নিয়ে কাজ করছেন। তেমনি একজন হলেন, কলেজের অর্থনীতি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী হাবিবা খাতুন ওরফে মৌ। তিনি বিজ্ঞান বিভাগের নিচতলায় সংবাদপত্র কিভাবে পেস্টিং করা হয় তা অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিখছিলেন। এমন সময় তার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, ‘এই কলেজের শিক্ষার্থী হিসেবে গর্ববোধ করছি যে, দ্বিতীয়বারের মতো সারাদেশের মধ্যে আমরা আবারও শীর্ষস্থান ধরে রাখতে পেরেছি। শিক্ষকদের নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করার ফলে আমরা ভালো রেজাল্ট করতে পারি।’
তিনি আরও বলেন, ‘শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকরা রুটিনমাফিক হাজির হন। এছাড়া কলেজের অধ্যক্ষ সকালে ক্যাম্পাসে এসে একবার ঘুরে দেখেন সবকিছু। প্রয়োজনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞাসা করেন, এখন কোনও ক্লাস আছে কিনা। আগে কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটা হীনমন্যতা ছিল। কিন্তু এখন সেটা নেই। কলেজের সুন্দর পরিবেশের কারণেই এটা দূর হয়েছে।’
কলেজের মার্কেটিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র রাশেদুল হাসান ওরফে পরাগ বলেন, ‘বরাবরের ন্যায় এবারও আমাদের কলেজ প্রথম হওয়ায় আমরা গর্বিত। রাজশাহী কলেজের শিক্ষাদান পদ্ধতি আধুনিক। আর শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও মনোযোগের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখেন শিক্ষকরা।’
সাফল্যের ধারাবাহিকতা প্রসঙ্গে রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ মহাম্মদ হবিবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পেরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটা মনোবেদনা ছিল। তাদের মনে হতো রাজশাহী কলেজে ভর্তি হয়ে জীবনটা শেষ হয়ে গেল। এই মনমানসিকতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে থেকে দূর করা গেছে। আমরা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনেও এবার প্রথম হয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এবার কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক সেকশন থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের ৩০ জন ছেলেমেয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। এরমধ্যে দু’জন শিক্ষার্থী ভর্তি হতে আর্থিক অসুবিধার মুখে পড়েছিল। তাদেরকে আমরা অর্থ দিয়ে সহায়তা করেছি। যাতে করে কলেজ ক্যাম্পাস শেষ হলেও আমাদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের একটা আন্তরিক সম্পূর্ক থাকে।’
জানা যায়, রাজশাহী নগরীতে গড়ে ওঠা আইটি ভিলেজে কলেজ শিক্ষার্থীদের প্রবেশ করানোর জন্য কলেজ প্রশাসন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এ ব্যাপারে অধ্যক্ষ বলেন, ‘প্রত্যেক দিন বিকাল ৪ থেকে ৫টা ও ৫টা থেকে ৬টা পর্যন্ত আইসিটি সেন্টারে ১১০ জন ছেলে-মেয়েদের নিয়ে ব্যাচ করে কম্পিউটার বিষয়ে দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বর্তমানে দশম ব্যাচ চলছে।’
একসময় রাজশাহী কলেজে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মারামারি লেগে থাকতো। কিন্তু বর্তমানে কলেজ প্রশাসনের উপর রাজনৈতিক তেমন প্রভাব বিস্তার নেই। এজন্য স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বড় ভূমিকা রয়েছে। তারা কলেজের পরিবেশ সুষ্ঠ রাখার জন্য কলেজ প্রশাসনকে সবরকম সহযোগিতা করে থাকেন, বলে জানালেন কলেজ অধ্যক্ষ।
তিনি বলেন, ‘নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও রাজশাহী কলেজ তার গৌরবের উত্তরাধিকার বহন করে চলছে। মেধাবী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সমাহারে কলেজ পর্যায়ে এখনও দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান। গৌরবময় ঐতিহ্যের ধারায় শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে কলেজটি নিরলসভাবে কাজ করে চলছে।’
কলেজের সমস্যার ব্যাপারে অধ্যক্ষ হবিবুর রহমান বলেন, ‘নতুন করে কলেজ ক্যাম্পাসে ১০তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হবে। তখন আমাদের শ্রেণিকক্ষের সমস্যা তেমন থাকবে না। এছাড়া শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য আরও পরিবহন ব্যবস্থা বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। ধীরে ধীরে কলেজটাকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’
এক নজরে রাজশাহী কলেজ
১৮৭৩ সালে ৩৫ একর এলাকা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে এখানে ২৪টি বিভাগে প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষার্থী আর শিক্ষক রয়েছেন ২৪৮ জন।








