‘আমার বড় ছেলে আশরাফুলকে আমি কিছুই দিতে পারিনি। সে অন্যত্র বাড়ি করেছে। আমার বাড়িতেই ছোট ছেলে আইজুল ইসলাম তার বউ-বাচ্চা নিয়ে আলাদা খায়। তাদের সুখের জন্য অনেক কষ্ট করে আড়াই বিঘা জমি কিনে দিয়েছি। তারপরও সে আমার তিন শতক জমির মধ্যে দুই শতকের পর্চা কেটে নিয়েছে। এর আগেও সে আমাকে তিন বার মেরেছে। কোনও সন্তান কি তার মাকে এভাবে মারতে পারে?’ বৃদ্ধা মা শরিফন (৭০) তার ছোট ছেলে আইজুল ইসলামের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ করেন।
মায়ের ভিটে-বাড়ির শেষ সম্বল তিন শতক জমি নিজের করে নিতে না পেরে বৃদ্ধা মাকে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত করেছে আইজুল। বৃহস্পতিবার (১২ অক্টোবর) দুপুরে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার বোদা সদর ইউনিয়নের সুতার পাড়া গ্রামে এই ঘটনা ঘটেছে।
শুক্রবার (১৩ অক্টোবর) গণমাধ্যমকর্মীদের কাছ থেকে খবর পেয়ে পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক অমল কৃষ্ণ মন্ডল তাৎক্ষণিক হাসপাতালে ওই বৃদ্ধা মাকে দেখতে যান এবং আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুলিশ সুপারকে অবহিত করেন। পরে বোদা থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, বোদা উপজেলার বোদা সদর ইউনিয়নের সুতারপাড়া এলাকার শরিফন তার বৃদ্ধ স্বামী আব্দুর রাজ্জাকসহ অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করেন। দুই ছেলে ও দুই মেয়ে সবারই বিয়ে দিয়েছেন শরিফন। স্বামী সহজ-সরল প্রকৃতির হওয়ায় মেয়ে জামাইদের সহযোগীতায় ও অন্যের বাড়িতে কাজ-কর্ম করে নিজেই সংসার চালান ওই বৃদ্ধা। বড় ছেলে আশরাফুল বিয়ে করে অন্যত্র বাড়ি করেছেন। নিজের তিন শতক ভিটে-মাটিতে ছোট ছেলে আইজুলসহ একসঙ্গে বাস করলেও স্বামীকে নিয়ে আলাদা খেতেন ওই বৃদ্ধা। অনেক কষ্টে ছোট ছেলের সুখের জন্য আড়াই বিঘা জমিও দিয়েছেন ছোট ছেলে আইজুলকে। তারপরও ছোট ছেলের কাছে ভাল হতে পারেননি বৃদ্ধা মা। অবশেষে মায়ের নামে থাকা তিন শতক জমির মধ্যে দুই শতক নিজের করে নিতে পর্চা কেটে নিয়েছেন। এ নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে মাঝেমধ্যেই ঝগড়া হচ্ছিল মা-ছেলে এবং বউমা ইতির সঙ্গে। বৃহস্পতিবার (১২ অক্টোবর) দুপুরে মায়ের সঙ্গে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে বৃদ্ধা মাকে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে অটোভ্যান চালক আইজুল ইসলাম।
প্রতিবেশী দোকানদার মহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমি দোকানেই বসে ছিলাম। এসময় বুড়িটা হাঁপাতে হাঁপাতে আমার দোকানের সামনে এসে মাটিতে বসে পড়ে। আমি তখন একটা চেয়ারে বসতে দেই। তার পর দেখি তার হাত থেকে রক্ত ঝরছে। পরে আমি তাকে একটা বিস্কুট খেতে দেই। কিন্তু তিনি আমার কাছে পানি চান। পরে কয়েকজন মিলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই।’
বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিক্যাল অফিসার ডা. জাকিয়া আক্তার বলেন, ‘বৃস্পতিবার (১২ অক্টোবর) দুপুরে ওই বৃদ্ধা মাকে তার মেয়ে গুরুতর আহতাবস্থায় হাসপাতলে নিয়ে আসেন। তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং হাতে রক্ত ঝরছিল। এখন আশঙ্কামুক্ত রয়েছেন।’
বোদা সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মশিউর রহমান মানিক বলেন, ‘আমি ঘটনাটি শুনে হাসপাতলে ওই মাকে দেখতে যাই এবং চিকিৎসার খোঁজখবর নিই। বিষয়টি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এ ধরনের পাষন্ড ছেলেকে বিচারের আওতায় আনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’
পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক অমল কৃষ্ণ মন্ডল বলেন, ‘আমি খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক পুলিশ প্রশাসনকে অবহিত করি। আমি নিজেও হাসপাতলে গিয়ে বৃদ্ধা মায়ের খোঁজ-খবর নিয়ে আসি। এছাড়া তার চিকিৎসার যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসারকে নির্দেশ দিয়েছি।’
বাড়িতে গিয়ে অভিযুক্ত ছোট ছেলে আইজুলকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।








