গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাঁওতাল পল্লিতে হামলা-ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনার এক বছর পূর্ণ হবে আগামী ৬ নভেম্বর (সোমবার) । এখনও সেদিনের কথা মনে করে ভয়ে আঁতকে ওঠেন সাঁওতাল পরিবারের লোকজন। ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব এসব সাঁওতালরা আশ্রয় নেন খোলা আকাশের নিচে। এক বছর ধরে ঝুপড়ি আর তাবুর নিচে খেয়ে না খেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন দুই শতাধিক সাঁওতাল ও বাঙালি পরিবার। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুনর্বাসনে তিন শতাধিক পরিবারের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাপ-দাদার ভিটে ছেড়ে সেখানে যেতে রাজি নন সাঁওতালরা। হামলার সুষ্ঠু বিচারসহ পৈত্রিক সম্পত্তি ফেরত চান তারা। নিজ জমিতেই তারা বসতি গড়ে তুলতে চান।
গত বছরের ৬ নভেম্বর সকালে রংপুর চিনিকলের আওতাধীন গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জ চিনিকলের (সাহেবগঞ্জ-বাগদা) এলাকার জমিতে বসতি গড়ে তোলা দুই শতাধিক সাঁওতাল ও বাঙালি পরিবারের ওপর হামলা ও লুটপাট চালায় পুলিশ ও মিলের শ্রমিক-কর্মচারীরা। এসময় সংঘর্ষ বাধলে সাঁওতালদের ছোড়া তীরের আঘাতে ৯ পুলিশ সদস্য আহত হন। এ ঘটনার পর পুলিশের ছোড়া গুলিতে তিন সাঁওতাল নিহত ও অন্তত ৩০ জন আহত হন। পরে আগুন দিয়ে সাঁওতাল ও বাঙালিদের দুই শতাধিক বসতি পুড়িয়ে দেয় পুলিশ। লুটপাট করা হয় তাদের ধান, গম, ডালসহ ঘরের মালামাল। প্রাণ ভয়ে ছোটাছুটি করতে থাকে শিশুসহ নারী-পুরুষরা। এরপর পরিবার-পরিজন নিয়ে মাদারপুর এবং জয়পুরপাড়ার খোলা আকাশের নিচে ঝুপড়ি ঘর তৈরি করে আশ্রয় নেয় সাঁওতাল ও বাঙালি পরিবারের লোকজন।
সরেজমিনে শনিবার সকালে মাদারপুর ও জয়পুরপাড়ার সাঁওতাল পল্লিতে গিয়ে দেখা যায়, আশ্রয় নেওয়া মানুষগুলো আজও ছোট ছোট ঝুপড়ি ঘর আর ত্রিপলের তাবুতে বসবাস করছেন। বসবাস করা সাঁওতালদের অভিযোগ, খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নেওয়ার পর প্রথম দুই-তিন মাস সরকারি-বেসরকারি ও এনজিও থেকে তাদের সহযোগিতা করা হয়। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত তাদের খোঁজ আর কেউ রাখেনি। হামলা-মামলার এক বছর হলেও ভয়-আতঙ্ক আর অব্যাহত হুমকিতে অনেকে বাইরে গিয়ে কাজকর্ম করতে পারছেন না।
সাহেবগঞ্জ-বাগদা ভূমি উদ্ধার কমিটির সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান মিয়া অভিযোগ করে বলেন, ‘হামলা, ভাঙচুর, আগুন ও লুটপাট এবং গুলি করে তিন সাঁওতাল হত্যার ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। এরপর থেকে জড়িতদের গ্রেফতারসহ তাদের পুনর্বাসনে নানা আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ফলে বিচার নিয়েও শঙ্কায় রয়েছেন তারা।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রশাসনের পক্ষ থেকে বোগদহ এলাকায় সাঁওতাল-বাঙালি তিন শতাধিক পরিবারকে আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় নিয়ে পুনর্বাসনের জন্য যে ব্যারাক নির্মাণ করা হচ্ছে সেখানে যেতে রাজি নন সাঁওতাল-বাঙালিরা। তারা তাদের বাপ-দাদার জমি ফেরত চান। জমি ফেরত পেলে তারা সেখানেই বসতি গড়ে তুলবেন।’
পুলিশের গুলিতে আহত হোপনা মুরমু বলেন, ‘বুকে গুলির ক্ষত আজও ঠিকভাবে শুকায়নি। এখনও বুকে ব্যাথা আছে। তাছাড়া হামলার ঘটনার কথা মনে হলে ভয়ে বুক কেঁপে ওঠে। বাইরে বের হয়ে ঠিকভাবে কাজকর্ম করতে পারি না। সেই ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করায় রোদ-বৃষ্টি আর ঝড়ে নানা দুর্ভোগে পড়তে হয়। এছাড়া তিন বেলায় ঠিকমতো খাবার না খেয়ে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে অনেক কষ্টে আছি।’
পলুস মাস্টার বলেন, ‘হামলার এক বছর হলেও আমাদের কোনও উন্নতি হয়নি। হামলার আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও তারা গ্রেফতার হয়নি। এছাড়া নিহত ও আহত পরিবারের মানুষসহ অনেকে মানবেতর দিনাতিপাত করছেন।’
গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শিলাব্রত কর্মকার বলেন, ‘তিন শতাধিক পরিবারের পুনর্বাসনে আবাসন প্রকল্প নির্মাণ কাজ হাতে নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে সেখানে মাটি ভরাটের কাজ শেষ হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে সেনাবাহিনীর সদস্যরা আশ্রয়ণ প্রকল্পে অবকাঠামো নির্মাণ কাজ শুরু করবে।’
জেলা প্রশাসক গৌতম চন্দ্র পাল বলেন, ‘সুন্দর ও মনোরম পরিবেশে আশ্রয়ণ প্রকল্পে তিন শতাধিক পরিবার বসবাসের সুযোগ পাবে। আশ্রয়ণ প্রকল্পে সাঁওতালদের পুনর্বাসনসহ সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।’
তবে আশ্রয়ণ প্রকল্পে সাঁওতালদের না যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সাঁওতালদের আশ্রয়ণ প্রকল্পে নিয়ে যেতে তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আশা করা হচ্ছে তাদের বুঝিয়ে আশ্রয়ণ কেন্দ্রে পুনর্বাসন করা সম্ভব হবে।’
সাঁওতাল পল্লিতে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় দায়ের হওয়া পৃথক দুটি মামলা তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পিবিআইয়ের গাইবান্ধা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আনোয়ার হোসেন মিয়া বলেন, ‘মামলা দুটি তদন্ত কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে লুটপাট হওয়া কিছু মালামাল উদ্ধার ও জড়িত বেশ কিছু আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্ত সম্পন্ন হলে মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হবে।’
এদিকে, এক বছর পূর্তিতে আগামী ৬ নভেম্বর সমাবেশের ডাক দিয়েছে সাঁওতালরা। সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্ম-ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি, আদিবাসী বাঙালি সংহতি পরিষদ, বাংলাদেশ আদিবাসী ইউনিয়ন, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ ও জনউদ্যোগ সাপমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে সকাল ১০টায় এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।







