‘পাঁচ মাস পর বাড়ি এলাম। সবার সঙ্গে দেখা হচ্ছে। অনেকের সঙ্গে কথা হচ্ছে। আগে তো হাতের ক্ষতস্থানগুলোতে পোকা জমে থাকতো। দুর্গন্ধ বের হতো। তাই কেউ আমার কাছে আসাতে চাইতেন না। এখন আর তা নেই। সবাই কাছে আসছেন, কথা বলছেন। তাই খুব ভালো লাগছে।’ শনিবার (২৩ ডিসেম্বর) সকালে সাতক্ষীরা জেলার সদর উপজেলার দক্ষিণ কামার বায়েশা গ্রামে নিজ বাড়ির বিছানায় শুয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে এসব কথা বলছিল মুক্তামনি।
প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে মুক্তামনি বলে, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমার চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তিনি নিয়মিত আমার খোঁজখবর নিতেন।’
এখন কেমন আছে, জানতে চাইলে মুক্তামনি বলে, ‘ভালো আছি। তবে এখনও মাঝে মাঝে হাতটা যন্ত্রণা করে। আগে হাত নাড়াতে পারতাম। হেঁটে বেড়াতে পারতাম। এখন হাত নাড়াতে পারি না। হাঁটতেও পারি না। তবে হাতের পোকা আর দুর্গন্ধটা নেই। ডাক্তার আংকেলরা অনেক চেষ্টা করেছেন।’
ছোট বেলার খেলার সঙ্গীরা তাকে দেখতে এসেছিল জানিয়ে মুক্তমনি বলে, ‘ওরা আমার কাছে থেকে মেডিক্যালের গল্প, ক্রিকেটার মুশুফিকের কথা শুনতে চেয়েছে। আমার হাতের অবস্থা জানতে চেয়েছে। আমি ওদের সঙ্গে অনেক গল্প করেছি। ওরা বলেছে, সময় পেলেই আমাকে দেখতে আসবে। অনেকদিন পর ওদের সঙ্গে দেখা হওয়ায় আমার খুব ভালো লাগছে।’
শুক্রবার (২২ ডিসেম্বর) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় অ্যাম্বুলেন্সে করে সাতক্ষীরা জেলার সদর উপজেলার দক্ষিণ কামার বায়েশা গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায় মুক্তামনি। তার সঙ্গে ছিলেন বাবা ইব্রাহীম হোসেন, মা আসমা খাতুন ও ছোট ভাই আল আমিন। শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে মুক্তামনিকে একনজর দেখার জন্য আত্মীয়স্বজনসহ অনেকে এসেছেন তাদের বাড়িতে।
মুক্তামনির বাবা বলেন, ‘গতকাল (শুক্রবার) রাতে বাড়িতে পৌঁছানোর পরপরই মুক্তামনি ঘরে ভেতরে যেতে চাইলো। আজ ঘর থেকে বের করতে চাইলাম। কিন্তু সে রাজি হলো না। চিকিৎসারা আমার মেয়ের হাতের অতিরিক্ত মাংস ফেলে দিয়েছিল চামড়া লাগিয়ে ছিল। কিন্তু ওর হাত আবার ফুলে গেছে। চিকিৎসকরা অনেক চেষ্টা করেছে। এখন আল্লাহ ভরসা। মেয়ের কী হবে, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। এরপরও আমি আশাবাদী, আমার মেয়ে একদিন সুস্থ হয়ে উঠবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দায়িত্ব নিয়ে আমার মেয়ের এত বড় চিকিৎসা করিয়েছেন, এ জন্য তাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। তিনি সহযোগিতা করেছেন বলেই আমার মেয়ের এই চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়েছে। আরও ধন্যবাদ জানাই ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের পরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম স্যার ও সামন্ত লাল সেন স্যারকে।’
মুক্তামনির মা আসমা খাতুন বলেন, ‘যেখানে সিঙ্গাপুরের ডাক্তাররা চিকিৎসা করতে রাজি হলেন না, সেখানে বাংলাদেশের ডাক্তাররা মুক্তামনিকে চিকিৎসা করেছেন। এরপর সে অনেকটা সুস্থও হয়ে যায়, পরে আবার আগের মতো হয়ে গেলো। তাদের চিকিৎসায় আমরা খুশি। ডাক্তারা আমার মেয়ের জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন। শেষ পর্যন্ত আমার মেয়ের কী হবে? কিছুই বুঝতে পারছি না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমরা চির কৃতজ্ঞ। তার দীর্ঘায়ু কামনা করি।’ তিনি আরও বলেন, ‘মুক্তামনিকে ডাক্তাররা একমাসের ছুটি দিয়েছেন। সে কারণে বাড়িতে এলাম। অনেক দিন পর বাড়িতে এসেছি। অনেক কাজ জমে আছে। সেগুলো করতে হবে। মুক্তামনি বাড়ি আসায় অনেক আত্মীয়স্বজন আসছেন।’
মুক্তামনির যমজ বোন হীরামনি বলে, ‘বার্ষিক পরীক্ষার জন্য ২২ দিন আগে আমি বাড়ি এসেছিলাম। কিন্তু আমার বোনের জন্য আমার মন সব সময় কাঁদতো। বোন বাড়ি আসায় আমারা সবাই খুশি। আপু পুরোপুরি সুস্থ হলে আমরা একসঙ্গে স্কুলে যাবো। বই পড়বো, খেলবো, সে গজল গাইবে আমি শুনবো।’
‘মুক্তামনির কী অসুখ, জানেন না চিকিৎসকরাও!’ এই শিরোনামে বাংলা ট্রিবিউনে খবর প্রকাশের পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত খবর প্রকাশিত হয়। এরপর দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এমন সংবাদ প্রকাশের পর অনেকেই এগিয়ে এসেছেন, হাত বাড়িয়েছেন মুক্তামনির চিকিৎসায়। এরই ধারাবাহিকতায় স্বাস্থ্য সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ তার চিকিৎসার যাবতীয় দায়িত্ব নেন।








