মোস্তফা: স্কুলশিক্ষক থেকে নগরপিতা

লিয়াকত আলী বাদল, রংপুর
২৩ ডিসেম্বর ২০১৭, ২৩:৫৩আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০১৭, ১০:১৭

 

রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা—পেশাগত জীবনের শুরুতে ছিলেন স্কুলশিক্ষক। কিছুদিন পরই সেই পেশা ছেড়ে শুরু করেন ঠিকাদারি। এরপর নব্বই দশকের শুরুতে কারাবন্দি এরশাদের মুক্তি  আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়ার মাধ্যমে যোগ দেন জাতীয় পার্টিতে (জাপা)। রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘপথ পরিক্রমায় হয়ে ওঠেন গণমানুষের প্রিয় নেতা। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি সদ্য অনুষ্ঠিত রংপুর সিটি করপোরেশন (রসিক) নির্বাচনে অংশ নেন। আর এই নির্বাচনে রংপুরকে বদলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সরফুদ্দিন আহম্মেদ ঝন্টুকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে নগরপিতা নির্বাচিত হন। 

শিক্ষক থেকে ঠিকাদার

মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফার বাবার নাম আলহাজ মামদুহুর রহমান। তিনি ছিলেন স্কুল শিক্ষক।  মোস্তফার জন্ম ১৯৫৯ সালে। তিনি কমরগঞ্জ হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাসের পর রংপুরে চলে আসেন। ভর্তি হন কারমাইকেল কলেজে। এই কলেজ থেকে ১৯৭৯ সালে বিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক পাস করেন। এরপর ফিরে যান নিজ গ্রাম কমরগঞ্জে। ১৯৮৩ সালে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন কমরগঞ্জ দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে।  দুই বছর শিক্ষকতা করার পর সেই চাকরি ছেড়ে আবারও রংপুর নগরীতে ফিরে আসেন। শুরু করেন ঠিকাদারি। অল্প দিনের মধ্যেই বিদ্যুৎ বিভাগের প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

যেভাবে জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে এলেন

১৯৯০ সালে ৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগের পর কারাবন্দি হন জাপা চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ। ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় এরশাদ কারাবন্দি থাকাবস্থায় তিনি রংপুরের ছয় আসনের মধ্যে পাঁচটি আসনে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। কিন্তু তার মনোনয়নপত্র বাতিল  হয়ে যায়।  এ সময় কারাবন্দি এরশাদের মুক্তি আন্দোলনে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে যোগ দেন মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা। তিনি রংপুর জাপার নেতাকর্মীদের সঙ্গে এরশাদের মুক্তি ও মনোনয়নপত্র গ্রহণের দাবিতে জেলা প্রশাসকের বাসভবন ও অফিস ঘেরাও কর্মসূচিতে যোগ দেন। বিশাল আকৃতির লাঙল বানিয়ে এরশাদমুক্তি আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এই আন্দোলনের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে ব্যাপকভাবে আলোচিত হন তিনি। এরপর প্রথমে ১৯৯৪ সালে জাতীয় পার্টির জেলা কমিটির সদস্য,  পরে পৌর কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সবশেষে ২০০৯ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ৮ বছর রংপুর সদর উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালে তিনি রংপুর সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিপুল ভোটে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।  

রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিজয়ের পর মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা

২০১২ সালে প্রথম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইলে দলের চেয়ারম্যান এরশাদ তাকে সমর্থন দেননি। তখন জাপার আরেক প্রার্থী আব্দুর রউফ মানিক ওই নির্বাচনে অংশ নিলে মোস্তফা জাপার বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে হাঁস মার্কা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে ৭৬ হাজার ভোট পেয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ওই নির্বাচনে সরফুদ্দিন ঝন্টু ১ লাখ ৬ হাজার ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হন।

তবে, ২০১২ সালের নির্বাচনে দলের অসহযোগিতার কারণে মেয়র নির্বাচিত হতে না পারলেও সদ্য অনুষ্ঠিত রসিক নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হন মোস্তাফা।  রসিকের নগরপিতা নির্বাচিত হওয়ার পর  বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় মোস্তফা বলেন, ‘আমি ২০১২ সালের নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পরের দিন থেকে রংপুর নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ শুরু করি। ভোটারদের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে আমাকে ভোট দেওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।  গত ৫ বছরে রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় যাই। এলাকার সমস্যাসহ বিভিন্ন জনহিতকর কাজে অংশ নেওয়া শুরু করি।’ ফলে রংপুর সিটি করপোরেশনে ২০৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় দিনের পর দিন  ঘুরে-ঘুরে মানুষের মনে নিজের স্থান করে সক্ষম হন তিনি।  নগরীর প্রতিটি পাড়া-মহল্লার নাম থেকে শুরু করে এলাকার বেশিরভাগ মানুষের নামও তার মুখস্থ। তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনটি ২৪ ঘণ্টাই খোলা থাকে। কোনও এলাকায় কোনও ধরনের সমস্যা হলে তিনি খবর পাওয়া মাত্রই ছুটে যান। 

এদিকে, ২০১২ সালের নির্বাচনে মোস্তফার ভোটের বাক্সে বিপুল পরিমাণ ভোট জমা হওয়ায় দলের চেয়ারম্যান এরশাদের টনক নড়ে। ফলে তিনি এবারের নির্বাচনের একবছর আগেই মেয়রপ্রার্থী হিসেবে মোস্তফার নাম ঘোষণা করেন।  

জানতে চাইলে মোস্তফা জানান, নির্বাচনের ৬ মাস আগেই ১৯৩টি ভোট কেন্দ্রের প্রত্যেকটিতে দলের পক্ষ থেকে ১০১ সদস্যবিশিষ্ট নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়। এছাড়া প্রত্যেক ওয়ার্ডে গঠন করা হয় মনিটরিং কমিটিও। নির্বাচনে মোস্তফা ৯৮ হাজার ৮৯ ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ঝন্টুকে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হন।

এ প্রসঙ্গে মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার জীবনে আর চাওয়া-পাওয়া থাকতে পারে? নগরবাসী যে ভালোবাসা আমাকে দিয়েছে, তার মূল্য জীবনের বিনিময়ে হলেও দেব। রংপুরকে দলের প্রভাবমুক্ত রেখে দুর্নীতিমুক্ত সিটি করপোরেশন উপহার দিয়ে জনসেবা করে যাব।’ 

 

/এমএনএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
পুলিশের নজরবন্দি আইভী
পুলিশের নজরবন্দি আইভী
পদোন্নতি না পাওয়ায় পদত্যাগ করলেন সিআইডির ভারপ্রাপ্ত প্রধান 
পদোন্নতি না পাওয়ায় পদত্যাগ করলেন সিআইডির ভারপ্রাপ্ত প্রধান 
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি, কমেছে তাপমাত্রা 
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি, কমেছে তাপমাত্রা 
কারামুক্ত স্বামীকে জড়িয়ে কাঁদলেন স্ত্রী, আবার ধরে নিয়ে গেলো ডিবি পুলিশ
কারামুক্ত স্বামীকে জড়িয়ে কাঁদলেন স্ত্রী, আবার ধরে নিয়ে গেলো ডিবি পুলিশ
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি